প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৩ ১২:৫৩ পিএম
আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৩ ১২:৫৬ পিএম
এই ম্যাচে ইংল্যান্ডের ৯ জন ব্যাট করলো। কিন্তু ম্যাচ জেতালো তো মাত্র ঐ একজন-দাভিদ মালান। জয়ের জন্য ২১০ রান তাড়া করতে নেমে মালান একাই করলেন অপরাজিত ১১৪ রান। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এটাই তার প্রথম ওয়ানডে। আর সেই ‘অভিষেকই’ রাঙালেন তিনি ম্যাচজয়ী ইনিংসে। ইংল্যান্ড জিতলো ৩ উইকেটে। তিন ম্যাচের সিরিজে এগিয়ে গেল ১-০ তে।
মিরপুরের এই মাঠ এবং বাংলাদেশের কন্ডিশনের সঙ্গে তার আগের চেনাজানার অভিজ্ঞতা দারুণভাবে কাজে দিলো সিরিজের প্রথম ম্যাচে। পুরোটা সময় ব্যাটিংয়ে যে ধৈর্য্য, পরিকল্পনা এবং টেকনিক দেখালেন সেটাই এই ম্যাচে দু’দলের জয়-পরাজয়ের পার্থক্য গড়ে দিল। এবারের বিপিএলে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের সদস্য ছিলেন মালান। ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের নিয়মিত মুখ ইংল্যান্ডের এই বাঁহাতি মিডলঅর্ডার ব্যাটার।
প্রতিরক্ষা-প্রতিরোধ ও আক্রমণের মিশেলে সাজানো মালানের সেঞ্চুরির ইনিংসটা মিরপুরের উইকেটে ব্যাটিং ক্লাশের জন্য দারুণ এক উদাহরণ হয়ে রইলো। ২০৯ রানের মামুলি পুঁজি নিয়েও বাংলাদেশ লড়াই জমিয়ে তুলেছিল। প্রথম ওভারেই সাকিব ফিরিয়ে দেন জ্যাসন রয়কে। তারপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে ইংল্যান্ড। প্রথম পাওয়ার প্লেতে ২ উইকেট হারিয়ে তাদের জমা মাত্র ৩৯ রান। নিজেদের ব্যাটিংয়ের ঠিক এই সময়ে বাংলাদেশের সঞ্চয় ছিল ২ উইকেটে ৫৪। কিন্তু এই এগিয়ে থাকাও বাংলাদেশকে ম্যাচ জেতাতে পারেনি। কারণ একপ্রান্ত আঁকড়ে রেখে কিভাবে নিরাপদ ব্যাটিং করে দলকে জেতাতে হয়-সিরিজের প্রথম ম্যাচে সেটাই করে দেখালেন দাভিদ মালান। ১৪৫ বলে ১১৪ রানের অপরাজিত ইনিংসে একবারও আউটের ন্যূনতম সুযোগ দেননি তিনি। একপ্রান্ত থেকে দলের শীর্ষ ব্যাটারদের যাওয়া আসা দেখেন। কিন্তু এই উইকেটে ম্যাচ জেতানোর জন্য ঠিক যে কায়দায় ব্যাট করার প্রয়োজন সেটাই করে দেখালেন মালান।
মিরপুরের এই ম্যাচের স্কোরকার্ডে কোথাও একটা শব্দ অনায়াসেই জুড়ে দেয়া যায়-মালানময় ম্যাচ!
এই উইকেটে প্রায় সবকিছুই মিলল! বাউন্স হলো। টার্ন মিলল। কিছু বল নিচু হয়েও গেল। উইকেটের এমন অযাচিত আচরণ নিয়ে দু দলের ব্যাটসম্যানরা সমস্যায় পড়লেন। শেষ পর্যন্ত সেই সমস্যার সমাধান খুঁজে পেল ইংল্যান্ড। সেই সমীকরণেই ম্যাচটা জিতলও তারাই।
ওয়ানডে ক্রিকেটে ২০৯ রানকে তেমন স্বস্তিকর কোনো স্কোর বলা যায় না। স্বাস্থ্যকর তো নয় বটেই! কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুরের উইকেটে ওয়ানডেতে ২০০ ছাড়ানো ম্যাচ মানেই আগে ব্যাটিং করা দলের জন্য উইনিং স্কোর। এই মাঠের ওয়ানডে পরিসংখ্যান তাই জানাচ্ছে। পেছনের ১৯ ম্যাচে এই মাঠে আগে ব্যাট করে দুশোর স্কোর ছাড়ানো দল ম্যাচ জিতেছে ১৭ টিতে। সেই পরিসংখ্যান কাল বদলে দিলো ইংল্যান্ড।
৩ উইকেটে ম্যাচ হেরে বাংলাদেশ অধিনায়ক তামিম ইকবাল আফসোস করছিলেন-স্কোরে যদি আরো ৩০/৩৫ রান জুড়ে দেওয়া যেত! ব্যাটিংয়ে যে অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ তাতে স্কোরটা নিশ্চিত ২৫০ রানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু মাঝে দ্রুতগতিতে কয়েকটা উইকেট হারিয়ে ফেলায় স্কোরটা ম্যাচ জয়ের মতো হলো না।
বাংলাদেশের ২০৯ রানের সঞ্চয়ে বড় সংগ্রহ নাজমুল হোসেন শান্তর ব্যাটে মিলল। নিজের ১৬ নম্বর ওয়ানডেতে এসে প্রথম হাফসেঞ্চুরি পেলেন শান্ত। ৮৬ বলে ৫৮ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। তাকে উপরের দিকে ব্যাটিংয়ে সুযোগ দিতে সাকিব আল হাসান তার পূর্বনির্ধারিত ও প্রিয় ব্যাটিং পজিশন তিন নম্বর স্লটটা ছেড়ে দিলেন। ব্যাটিংয়ে সিঙ্গেল ডিজিটে ফিরলেন সাকিব। মঈন আলীর বলে যে শট খেলে আউট হলেন সেটাকে বলে ‘নাথিং শট’! দলের ব্যাটিংয়ে আরো তিন স্তম্ভ তামিম, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ উইকেটে সেট হয়ে আউট হলেন। মুলত ওতেই বাংলাদেশের স্কোরের স্বাস্থ্য সবল হওয়ার সম্ভাবনার মৃত্যু। কঠিন এই উইকেটে ব্যাটিংয়ের কাজটা আরো কঠিন করে ফেলে বাংলাদেশ অতিরিক্ত রক্ষনাত্মক মেজাজের কারণে। ইনিংসের প্রথম ১১ ওভারের মধ্যে বাংলাদেশ ডটবল খেলে ৪৭টি। আর পুরো ইনিংসে বাংলাদেশের খেলা ডট বলের সংখ্যা ১৭৫। হিসেব জানাচ্ছে ৪৭.২ ওভারের মধ্যে বাংলাদেশ ২৯ ওভার থেকে কোনো রানই করতে পারেনি!
মিরপুরের এই উইকেট স্পিনের জন্য স্বর্গ ছিল, সন্দেহ নেই। তাই বলে এখানে লম্বা ইনিংস খেলা যাবে না-এমনকিছু নয়।
উদাহরণ চান?
দাভিদ মালান তো পারলেন। এবং তাকে দারুণ সঙ্গও দিলেন আদিল রাশিদ। ১৬১ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে ইংল্যান্ড ধুঁকছিল। আদিল রাশিদ যখন ব্যাট করতে নামলেন ম্যাচ জিততে তখনো ইংল্যান্ডের প্রয়োজন ৪৯ রান। মালানের সঙ্গে জুটি গড়ে আদিল রাশিদ সেই কঠিন সময়টা কি অনায়াসেই না পার করে দিলেন।
৩ উইকেটে ম্যাচ হারলেও এই ম্যাচ থেকে বাংলাদেশ একেবারে খালি হাতে ফিরেছে এমনকিছু নয়। মাঝারি পুঁজি নিয়েও যে এই উইকেটে ইংল্যান্ডকে চ্যালেঞ্জ জানানো যায়-অন্তত সেই ধারণা তো মিলল। তামিম ইকবাল তার পুরো বোলিং ইউনিটকে দুর্দান্ত কায়দায় ব্যবহার করলেন। তিন স্পিনার এবং পেসার তাসকিন ম্যাচ জেতানোর জন্য ঠিকই ঝাঁপালেন। তবে দলের ‘দ্বিতীয়’ পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের কাছ থেকে যে কোনো সহায়তা মিলল না।
আগের দিনের অনুশীলনের মতো এই ম্যাচেও সাকিব-তামিমকে এক ফ্রেমে রেখে ছবি নেওয়ার জন্য অনেক কসরত করেন ফটোসাংবাদিকরা। উপলক্ষ্যটা মিলল ইংল্যান্ডের ইনিংসের প্রথম ওভারেই। সাকিবের বলে অনেক উচুঁতে উঠা জেসন রয়ের ক্যাচ ধরলেন তামিম। পুরো গ্যালারি জুড়ে উল্লাস। আনন্দময় সেই দৃশ্য আরো সুন্দর হয়ে উঠলো সাকিব-তামিমের হাইফাইভে।
দ্বন্দ্ব ঘোঁচানো নিয়ে আর কোনো সন্দেহ?
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ: ২০৯/১৯ (৪৭.২ ওভারে)।
ইংল্যান্ড: ২১২/৭ (৪৭.২ ওভারে)।
ফল: ইংল্যান্ড ৩ উইকেটে জয়ী।
ম্যাচসেরা: দাভিদ মালান।