আপন তারিক
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১২:৩৬ পিএম
রাজিন সালেহ হেড কোচ। তুষার ইমরান ব্যাটিং কোচ। সৈয়দ রাসেল বোলিং কোচ। আরও আছেন। নাজমুল হোসেন সহকারী কোচ। স্পিন বোলিং কোচ হিসেবে আছেন মুরাদ খান। নামগুলো শুনেই বুঝতে পারছেন পুরোটাই দেশি কোচ। এই দেশি কোচেই ধন্য সিলেট স্ট্রাইকার্স। এবারের বিপিএলে এখন পর্যন্ত ব্যাটে-বলে পারফরম্যান্সে সেরা দলের মর্যাদা পাচ্ছে সিলেট স্ট্রাইকার্স।
ঢাকার প্রথম পর্ব ও দ্বিতীয় পর্ব, চট্টগ্রাম এবং সিলেট পর্ব—সব ভেন্যুতেই সিলেট স্ট্রাইকার্স দুর্দান্ত। সবার আগে তারা কোয়ালিফায়ারে নাম লিখিয়েছে। টুর্নামেন্ট শুরুর দিন থেকে এখন শেষ পর্বের খেলা মাঠে গড়ানোর আগ পর্যন্ত সিলেটই হট ফেভারিট। মাঠের লড়াইয়ে সিংহভাগ ম্যাচ জিতছে সিলেট দেশি ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সে। সেরা রান সংগ্রাহকের তালিকায় আছেন সিলেটের ওপেনার নাজমুল হোসেন শান্ত। মিডল অর্ডারে দারুণ ফর্মে রান ঝরাচ্ছে তৌহিদ হৃদয়ের ব্যাট। বোলিংয়ে কৃতিত্ব আরও উজ্জ্বল। শীর্ষ পাঁচ বোলারের তালিকায় তিনজনই সিলেটের! আর অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার উপস্থিতি পুরো দলকে অনুপ্রাণিত করছে। প্রতি ম্যাচেই সাফল্য পেতে মরিয়া একটা চেষ্টাই এগিয়ে রাখছে সিলেটকে।
সিলেটের দেশি কোচদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সাফল্যের রসায়ন খোঁজার চেষ্টা করেছেন আপন তারিক।
তুষার ইমরান
‘মাশরাফি দল গড়েছে, ক্রেডিটটা ওরই বেশি’
ঘরোয়া ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বকালের সেরাদের অন্যতম তিনি। তারপরও জাতীয় দলে নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচকরা সব সময় তাকে অবজ্ঞাই করে এসেছেন। মৌসুমের পর মৌসুম রান ফোয়ারা ছোটালেও জাতীয় দলে ফেরা আর হয়নি। সেই আক্ষেপ নিয়ে ব্যাট তুলে রাখলেও তুষার ইমরান ক্রিকেট ছাড়েননি। এখন আরেক ভূমিকায় মহা ব্যস্ত। সিলেট স্ট্রাইকার্সের ব্যাটিং কোচ। তার দলের দুই ব্যাটার নাজমুল হোসেন শান্ত ও তৌহিদ হৃদয় দাপটে খেলে যাচ্ছেন শুরু থেকেই। শান্ত ৩৫৬ রান নিয়ে তালিকার শীর্ষে। চার হাফসেঞ্চুরিতে তৌহিদ হৃদয়ের ব্যাট হাসছে ২৮৮ রানে। চোটে না পড়লে তিনিও থাকতে পারতেন শীর্ষে। তাদের সাফল্যের ভাগীদার বনে গেলেন তুষারও!
এই দলটার ব্যাটিং নিয়ে কাজ করাটা বেশ উপভোগ করছেন তুষার ইমরান। বলছিলেন, আমাদের একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। নতুন একটা কোচিং সেটআপ যারা মডার্ন ক্রিকেটটা খেলেছি। সেটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি। ব্যাটসম্যানরা অনেক দিন ধরে খেলছে, ওরা জানে ওদের অ্যাবিলিটি। কার কী রোল সেটা বলে দেওয়া হয়। এর বাইরে আর কিছুই না। কোনো দিন কেউ সফল হয়, আবার কেউ ব্যর্থ। আমরা এসব নিয়ে বাড়তি কোনো চাপ নেই না।’
তুষার নিজে ঘরোয়া ক্রিকেটে বছরের পর বছর পারফর্ম করেছেন। এ কারণেই স্থানীয় ক্রিকেটাররা ভালো খেললে বাড়তি স্বস্তি পান। তৌহিদ হৃদয় দারুণ লড়ছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি দলে তাকে দেখতে চান তুষার— ‘দেখুন, এবার লোকাল ক্রিকেটাররা পারফর্ম করছে এটাই বড় কথা। তৌহিদ হৃদয়ের আমার মনে হয় জাতীয় দলেও সুযোগ আসবে। বিশেষ করে ওকে টি-টোয়েন্টিতে সুযোগ দেওয়া উচিত। পরবর্তীতে তাকে বড় পরিসরে চিন্তা করা যাবে। আপাতত আমি বলব ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে তৌহিদকে খেলানো উচিত।’
তৌহিদ হৃদয়কে নিয়ে যেমন ভাবেন তেমনি কোচ হিসেবেও ক্যারিয়ার গড়ার ভাবনাটা পোক্ত হয়েছে তুষারের। ৩৯ পেরোনো এই সাবেক ক্রিকেটার বলছিলেন, কোচ হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার একটা পরিকল্পনা তো আছেই, এইজন্য তো কোচিংয়ে আসা। এটা আমার জন্য অনেকটাই সহজ বলতে পারেন। ২০ থেকে ২২ বছর ক্রিকেট খেলেছি। ক্যারিয়ারে ক্যাপ্টেন্সি করেছি ১৬-১৭ বছর। তখন দেখেছি মাঠের বাইরে কোচ আর মাঠের ক্যাপ্টেনের মধ্যে একটা সমন্বয় থাকে। তখন কাজ সহজ হয়। অভিজ্ঞতাই কোচিং সহজ করে দিচ্ছে। সামনে অবশ্যই চেষ্টা করব বড় পর্যায়ে কাজ করার।’
তার আগে আপাতত ভাবনায় শুধুই সিলেট স্ট্রাইকার্স। যেখানে দলটির সাফল্যের রূপকার হিসেবে অধিনায়ক মাশরাফির নামটাও নিয়েছেন তুষার। বলছিলেন মাশরাফির কথা আলাদা করেই বলব, ও যদি ফিট থাকে আর নির্বাচকরা যদি ভাবে ও কিন্তু জাতীয় দলে আবার আসতেই পারে। এবার দেখুন ১২ উইকেট নিয়েছে। আর এটা সবাই জানে মাশরাফি দেশের ওয়ান অব দ্য বেস্ট ক্যাপ্টেন। সিলেট যে জায়গায় ছিল আগেও ৫/৭ বছর ভালো খেলতে পারেনি। মাশরাফি যদি না থাকত এবার এই দলটাই হতো না। ও দলটা গড়েছে। ওর ক্রেডিটটা অনেক বেশি।’
ভুল বলেননি তুষার। মাশরাফি দলের নেতৃত্বে থাকা মানেই বাড়তি অনুপ্রেরণা আর দলের অধিনায়ক যখন এভাবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন তখন সাফল্য তো আসবেই।
রাজিন সালেহ
‘পুরো একটা দল হিসেবে খেলছি আমরা’
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারটা তেমন আহামরি নয় রাজিন সালেহর। ২৪ টেস্টে ১১৪২, ৪৩ ওয়ানডেতে ১০০৫ রান। ব্যস এটুকুই। তবে সেই রাজিন এখন ভিন্ন ভূমিকায় আলোচিতদের একজন। খেলোয়াড় থেকে কোচে হয়ে আশার আলো দেখাচ্ছেন জাতীয় দলের সাবেক এই ক্রিকেটার। এবার তার হাত ধরেই সিলেট স্ট্রাইকার্স অপ্রতিরোধ্য!
চলতি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) শুরুতে আলোচনাতেই ছিল না সিলেট, সেই দলটাকেই সবার আগে প্লে অফে নিয়ে গেলেন রাজিন। দলটির হেড কোচ অবশ্য এই কৃতিত্ব একা নিতে রাজি নন। এমনকি ১০ ম্যাচের ৮টিতে জেতা দলের কোচ এখনই শিরোপায় চোখ রাখতেও নারাজ।
সিলেট পর্ব শেষে ঢাকায় বিপিএল ফেরার আগে প্রতিদিনের বাংলাদেশের মুখোমুখি হলেন রাজিন। জানিয়ে দিলেন, সিলেটের এই সাফল্যের রহস্য আর কিছু নয়, পুরোটা সময় জুড়ে আমরা একটা দল হিসেবে খেলছি। এখানে এককভাবে কোনো ক্রিকেটারের ব্যাপার স্যাপার নেই। আর আমাদের দলে যারা আছেন তাদের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। তারা তাদের মতো করে খেলতে পারবে—এটা স্পষ্ট বলা আছে। আপনি যখন প্লেয়ারদের খেলার মধ্যে স্বাধীনতা দেবেন তখন তারা নিজের খেলাটা প্রস্ফুটিত করতে পারবে। আমার মনে হয় এ জন্যই হয়তো ছেলেরা ভালো খেলছে।’
ক্রিকেটে হেড কোচ বললেই অনেক সময় কড়া শিক্ষকের চেহারা ভেসে ওঠে। কিন্তু ৩৯ বছর বয়সি রাজিনের কোচিং দর্শন তেমনটা নয়। সিলেটের এই কোচ যিনি এর আগে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ফিল্ডিং কোচ হিসেবেও ছিলেন সেই রাজিন বলছিলেন, আমরা একটা প্রতি ম্যাচের আগেই সবাইকে একটা প্ল্যান দেই—যে প্ল্যানটা দেই সেটাতে কোনো প্রেশার থাকে না। আর তাদের নরমাল ক্রিকেট খেলতে বলি।’
তবে শুধু নিজের কৌশলই নয়, অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার ম্যাজিকও সিলেটের সাফল্যের নেপথ্য হিসেবে কাজ করেছে। রাজিনও সেটি একবাক্যে মেনে নিলেন, এখানে মাশরাফি তাদের লিডার ও সব সময়ই দলটাকে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখে। দেখুন, দুটো জিনিস হয়—এক. আপনি টিচারের মতো কথা বলবেন। আরেকটা ব্যাপার আপনি লিডারের মতো কথা বলবেন। ক্যাপ্টেন মাশরাফি কাজ করেন অ্যাজ এ লিডার হিসেবে। লিডারের মতো কথা বলেন। টিমকে বুস্টআপ করার যোগ্যতা ওর আছে।’
সিলেটের আরেক তারকা ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিমের কথাও আলাদা করে বললেন রাজিন। এই তারকার অভিজ্ঞতাটাও বেশ কাজে লাগছে, দলে মুশফিক তো আছেই। মাঠে কী করতে হয়, না করতে হয়—এসব বিষয়ে মুশফিক সব সময়ই দক্ষ। সবাই মিলে যার যার জায়গায় কাজ করি। আমি কোচ হিসেবে বা হেড কোচ হিসেবে আমার কাজ করছি। আমার সঙ্গে যারা আছেন প্রত্যেককে তাদের কাজ দেওয়া হয়েছে। অন্যের কাজে কেউ নাক গলান না, সবাই সবার কাজটা করে যাচ্ছেন। প্লেয়ারদের যে কাজটা দেওয়া হচ্ছে ওরা তাদের কাজটা করছে।’
যদিও এখনই শিরোপা নিয়ে বাড়তি ভাবনার ছবি আঁকতে রাজি নন রাজিন। ম্যাচ বাই ম্যাচ পরিকল্পনা করছে সিলেট। রাজিন জানিয়ে দিলেন, আমাদের টার্গেট একটা একটা করে ম্যাচে এগিয়ে যাওয়া। সেটা করতে পারলে সাফল্য পাওয়া সম্ভব। আপাতত আমাদের একটাই ভাবনা প্লে অফের বাধা টপকানো।’
সৈয়দ রাসেল
‘পুরো দলটাই এখন একটা পরিবার’
পেস বোলারদের আজন্ম শত্রু ইনজুরি। এই শত্রুর কাছে হার মেনে কতশত ক্রিকেটার যে একটু আগেভাগেই শেষ করেছেন ক্যারিয়ার! সৈয়দ রাসেলও সেই দুর্ভাগাদের একজন। ৬ টেস্ট, ৫২ ওয়ানডে আর ৮ টি-টোয়েন্টির ক্যারিয়ার পেছনে ফেলে এখন কোচের ভূমিকায় এই পেসার। এবারের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) আছেন সিলেট স্ট্রাইকার্সের সঙ্গে। দলটির পেস বোলিং কোচ তার শিষ্যদের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত হতেই পারেন। দল ১০ ম্যাচের ৮টিতে জিতে ১৬ পয়েন্ট নিয়ে প্লে অফে। দুর্দান্ত ছন্দে পেসাররাও!
দলটির পেস বোলার রেজাউর রহমান রাজা আলাদা করেই নজর কাড়লেন। যিনি এখন অবধি ৭ ম্যাচে ১২ উইকেট শিকার করেছেন। এই পেসারকে নিয়ে কথা উঠতেই সৈয়দ রাসেল বলছিলেন, এবার বিপিএলে খেলে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে, ওটা বেশ কাজে দেবে ওর। আশা করা যায় ও অনেকদূর যাবে। যখন কোনো পেসার সাফল্যের মধ্যে থাকে তখন তার জন্য জাতীয় দলে ঢোকা সহজ হয়ে যায়।’
একই সঙ্গে বল হাতে দাপট দেখাচ্ছেন সৈয়দ রাসেলের বন্ধু মাশরাফি বিন মর্তুজাও। ১০ ম্যাচে ৩২.১ ওভারে ২৪৩ রান দিয়ে তুলেছেন ১২ উইকেট। অনেকে তো বলছেন ঘরোয়া ক্রিকেট যদি জাতীয় দলে পা রাখার মঞ্চ হয়, তবে মাশরাফিরও আরেকটা সুযোগ পাওয়া উচিত। সৈয়দ রাসেলও সেই কথাটাও মনে করিয়ে দিলেন। সিলেটে তিনি মাশরাফির কোচ হলেও দুজন দীর্ঘদিনের বন্ধু।
গোটা ক্যারিয়ারে মাশরাফির সংগ্রামের গল্পটা রাসেলের চেয়ে আর কে ভালো জানেন। দুজনই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে উঠে আসা। এবার কোচের ভূমিকায় থেকে অপ্রতিরোধ্য মাশরাফিকে দেখে দারুণ খুশি রাসেল, ও ক্রিকেট খেলছে ২২-২৩ বছরের বেশি সময় ধরে। একটা খেলা যখন আপনি এতদিন ধরে খেলবেন তখন অনেক কিছুই সহজ হয়ে যায়। ওর যে অবস্থা কোনো কিছুই আর নতুন নয়। ওর চোখ বেঁধে দিলেও দেখবেন ঠিক জায়গায় বল ফেলতে পারবে। ও এখন যেটা করা শুধু ফিটনেসটা ধরে রাখা।’
এখন মাঠের বাইরেও ব্যস্ততা বেড়েছে মাশরাফির। জনপ্রতিনিধি হিসেবেও সময় দিতে হয় এলাকার মানুষদের। তারপরও অনুশীলনে সিরিয়াসনেসের কমতি নেই। কাছ থেকে দেখা অভিজ্ঞতা থেকেই রাসেল বলছিলেন, ও কিন্তু নিয়মিত জিম করে। নিজের ফিট রাখার লড়াইটা চালিয়ে যায়। মাশরাফি ফিট থাকলে এখন কেন আরও দশ বছর পরও খেলতে পারবে। বোলিং নিয়ে ওর আর কোনো কাজ করার নেই।’
শুধু মাশরাফি নয়, এবার বিপিএলে পুরো সিলেট স্ট্রাইকার্স দলটাও জয়টাকে অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছে। অন্যরা পথ হারালেও সিলেট অপ্রতিরোধ্য। অথচ শুরুতে তাদের নিয়ে তেমন কথা হয়নি। রাসেল পুরো ব্যাপারটাই জানেনÑ দেখুন, শুরুতে আমাদের নিয়ে কেউ কথা বলেনি। তবে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম—শুরুতেই কিছু একটা করব। অন্যরা প্রস্তুত হওয়ার আগেই আমরা জয়ের ছন্দে চলে যাব। তাছাড়া আমাদের মধ্যে বোঝাপড়াটাও ভালো ছিল। আমাদের কোচিং স্টাফের সবাই বন্ধু। একটা পরিবারের মতো আমরা।’
শুধু কোচিং স্টাফ নয়, পুরো দলের সবাই এখন একটা পরিবার। রাসেল বলছিলেন, আমাদের এখানে কে টিমের মালিক, কে কোচিং স্টাফ, আবার কে জুনিয়র প্লেয়ার—এসব হিসাব নেই। আমাদের বন্ধনটা শুরু থেকেই বেশ ভালো।’
একটা দলের সাফল্যের পেছনের গল্পটা তো এমনই। যেখানে একই সুতোয় গাঁথা থাকবে পুরো দল। যেমনটা সিলেট স্ট্রাইকার্স!