× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এক ডজন রেকর্ড গড়েও দুঃখ ভুলছেন না ফয়সাল

আপন তারিক

প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৩ ১১:১৬ এএম

এক ডজন রেকর্ড গড়েও দুঃখ ভুলছেন না ফয়সাল

‘ফুটবলই সর্বনাশ করবে ওর! পড়াশোনা গোল্লায় গেছে, এই ছেলেকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না!’—চারপাশ থেকে এমন সমালোচনার স্রোতে ভেসে যেতে পারতেন তিনি! বয়সও তো তখন ২০ পেরোয়নি! চারধারের বাঁকা কথা তখন তীক্ষ্ণ তীরের মতো হৃদয়টাও এফোঁড় ওফোঁড় করে দিতে পারত। কিন্তু মাহমুদুল হাসান ফয়সাল সহজে মাথা নত করার মানুষ নন! ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়া যে কারণে এক বছরের জন্য থমকে গেল, সেই কারণটাকেই বানালেন হাতিয়ার! জয়ের মন্ত্র! ফুটবল দিয়েই বাজিমাত করলেন মাগুরার এই তরুণ। 

অবশ্য তিনি সেই প্রথাগত কোনো ফুটবলার নন, যে কোনো ক্লাবে খেলবে কিংবা জাতীয় দলের হয়ে মাঠ মাতাবে। তিনি ফুটবল নিয়ে কারিকুরিতে জন্ম দেন বিস্ময়ের। জন্ম দেন রেকর্ডের! ফুটবল ফ্রিস্টাইলে নিজের ঈর্ষণীয় দক্ষতায় ১২টা রেকর্ড এখন তার দখলে। বিশ্বের যাবতীয় রেকর্ড নথিবদ্ধ থাকে যেখানে সেই গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে জায়গা করে নিয়েছে সেই এক ডজন রেকর্ড। 

গত ২৮ জানুয়ারি সবশেষ রেকর্ডের স্বীকৃতিটা পেলেন ফয়সাল। অর্জনের সপ্তাহ পূর্তি হয়নি, তাইতো চোখেমুখে রাজ্যের তৃপ্তি ২১-বর্ষী এই তরুণের। গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে বলছিলেন, ‘ফুটবল নিয়ে কারিকুরির এই নেশাটা আমার পড়াশোনা থমকে দিয়েছিল। মাগুরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মেকাট্রনিকস বিভাগে ডিপ্লোমা প্রকৌশলে পড়তে গিয়ে এক বছরের ড্রপ! অনেকেই মনে করেছিলেন আর পড়তেই পারব না। ফুটবলের নেশায় সব হারাব। ঠিক তখন আমার দাদি-নানা-নানি পাশে দাঁড়াল। তারাই বললÑ যে কারণে তোর পড়াশোনার ক্ষতি হলো, সেটাই অবলম্বন করে তোল। পণ করেছিলাম পড়াশোনা শেষ করার আগেই কমপক্ষে এক ডজন রেকর্ড গড়ব! শেষ অবধি তাই করেছি!’

ফুটবল ফ্রিস্টাইলের এসব কীর্তি অবশ্য সাধারণ মানুষের অজানাই থাকে। এইবার যেমন তিনি রেকর্ড গড়লেন ‘দ্য মোস্ট বাস্কেটবল নেক থ্রো অ্যান্ড ক্যাচেস ইন থার্টি সেকেন্ডস’ ইভেন্টে। এই ইভেন্টে বাংলাদেশের প্রতিযোগী ফয়সাল ৩০ সেকেন্ডে ২৯ বার ঘাড়ের ওপর বাস্কেটবল নাচিয়ে রেকর্ড গড়েন। ২০২১ সালের ১১ জুন এই কীর্তি গড়েন তিনি। যার গিনেজ স্বীকৃতি মিলল গত ২৮ জানুয়ারি।

কথায় আছে—একটা অর্জন আরেকটা স্বপ্নের পথ গড়ে দেয়। ফয়সাল বলছিলেন, ‘আমি থামতে চাই না। সবশেষ রেকর্ডটি গড়তে আমার অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। পাঁচবার ব্যর্থ হয়েছি। ষষ্ঠবারে এসে সফল হলাম। এই ইভেন্টে পাঁচবার ভেঙেছি আমি। এখানেই থামতে চাই না। যদি ৬০ বছর বাঁচি তবে প্রতিবছরই চেষ্টা চালিয়ে যাব।’ তার মানে ১২ বার গিনেজ বুকে নাম তুলেও ক্ষুধা মিটছে না ফয়সালের। 

ফয়সালের এই রেকর্ড গড়ার নেশাটা পেয়ে বসে বছর ছয়েক আগে। অবশ্য তার আগে সেই শিশুকাল থেকেই হতে চেয়েছিলেন ক্রিকেটার। কিন্তু পরিবারের সবাই চেয়েছিল তাদের সন্তান যেন পড়াশোনা করে চাকরি বেছে নেন। প্রায় প্রতিটি পরিবারই তো এভাবেই ভাবে। আর তাতেই ফয়সালের মতো অনেকের স্বপ্ন অঙ্কুরে বিনাশ হয়ে যায়! ফয়সাল সেই সময়ের কথা মনে করলেন, ‘একজন ক্রিকেটার হতে চেয়েছিলাম আমি। বলতে পারেন সাকিব আল হাসানের মতো অলরাউন্ডার হওয়ার স্বপ্ন পুষেছিলাম মনে। কিন্তু পরিবারের সবাই চাইলেন আমি খেলার মাঠে না গিয়ে যেন বই নিয়ে পড়ে থাকি। ব্যস, আর পারলাম না।’

একটা স্বপ্ন ভাঙলেও হাল ছাড়েননি ফয়সাল। এরপর শুরু করেছেন ফুটবল ফ্রিস্টাইল অনুশীলন, ‘ক্রিকেট খেলাটা থমকে যাওয়ার পরই ফ্রিস্টাইল শুরু করি। যদিও লড়াইটা যে কত কঠিন ছিল সেটা আমার আশপাশের মানুষরাই জানেন। শুরুতে দৈনিক গড়ে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা অনুশীলন করেছি। এখন তো আরও বেশি করি।’

সেই অনুশীলনের সুফলও পেয়েছেন ফয়সাল। প্রথম রেকর্ড গড়েন ২০১৮ সালে। দ্য মোস্ট ফুটবল আর্ম রোলস ইন ওয়ান মিনিট ক্যাটাগরিতে বাজিমাত করে। এক মিনিটে ১৩৪ বার বাহুর ওপর ফুটবল ঘুরিয়ে গিনেজ বুকে তুলে নেন নিজের নাম। তখনই বাবা-মার প্রশংসা পান। বাবা সোহেল রানা অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য আর মা মঞ্জুয়ারা খানম এরপর আর সন্তানকে আটকাননি। 

অবশ্য বাংলাদেশে ফ্রিস্টাইল জনপ্রিয় কিছু নয়। কারণ ফুটবল খেললে টাকা পাওয়া যায়। আর এই রেকর্ড গড়লে শুধুই গিনেজের স্বীকৃতি, নিজের সন্তুষ্টি। এখানে পৃষ্ঠপোষকতা নেই বললেই চলে। তবে মাগুরার এই তরুণ এখন অবশ্য বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানেরই টুকটাক সহযোগিতা পাচ্ছেন। 

তার পথ ধরে গড়েছেন দ্য মোস্ট ফুটবল আর্ম রোলস ইন ওয়ান মিনিট (১৩৪ বার), দ্য মোস্ট বাস্কেটবল আর্ম রোলস ইন ওয়ান মিনিট (১৪৪ বার), দ্য মোস্ট বাস্কেটবল নেক ক্যাচেচ ইন ওয়ান মিনিট (৩৪ বার), দ্য মোস্ট ফুটবল নেক থ্রো অ্যান্ড ক্যাচেচ ইন ওয়ান মিনিট (৬৬ বার), দ্য মোস্ট রোলস এক্রোস দ্য ফোরহেড ইন থার্টি সেকেন্ডস (৪৬ বার) আর দ্য মোস্ট ফুটবল (সকার বল) নেক থ্রো অ্যান্ড ক্যাচেচ ইন থার্টি সেকেন্ডসে (৩৬ বার) বাজিমাত করেন। গিনেজ বুকে জায়গা করে নিজেকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়!

এমন রেকর্ডে অবশ্য অর্থকড়ির বাণিজ্যে একটুও এগিয়ে যাওয়া হয়নি। সেই সুযোগটাও নেই। তবে এটা নিয়ে এখন আর আক্ষেপ নেই ফয়সালের। কারণ বাবা-মা এখন তাকে নিয়ে গর্বিত, ‘দেখুন আমার বাবা আর মা চেয়েছিলেন আমি যেন প্রকৌশলী হই। সেটি শেষ করার পথে। সঙ্গে ফ্রিস্টাইলে রেকর্ড তো গড়েই যাচ্ছি। আমি থামতে চাই না।’

তবে একটা আক্ষেপও তাড়িয়ে বেড়ায় ফয়সালকে। দুধের স্বাদ কী আর ঘোলে মেটে। তিনি হতে চেয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। সাকিবের মতো তার নামটাও তো ফয়সাল। কিন্তু তিনি পথ হারিয়ে এখন অন্য কিছুতে ব্যস্ত, ‘বিশ্বাস করুন এক ডজন রেকর্ড গড়েও দুঃখ ভুলতে পারছি না। আমি তো আজ ক্রিকেট মাঠেই থাকতে পারতাম, জীবনটা ভিন্ন হতে পারত! আমার নামটা ছড়িয়ে পড়তে পারত গোটা বাংলাদেশে! অথচ ১২টা রেকর্ড গড়ার পরও কয়জনইবা আমাকে চেনে!’

ঠিক তাই—দিন শেষে শুধু কাগজে কলমের প্রশংসাই নয়, বিজয়ীরা হাততালিটাও চায়। ওটুকু স্বীকৃতি নিশ্চয়ই দাবি করতেই পারেন ফয়সাল!

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা