এম.এম. কায়সার
প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ১৩:১৮ পিএম
আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ১৩:২২ পিএম
শুরুর কথা
সানিয়ার বয়স তখন ছয়। স্কুলে ক্লাস শেষে যেটুকু সময় থাকে সেটা সাঁতারে কাটে। মায়ের হাত ধরে প্রতিদিনই সুইমিং পুলে আসা-যাওয়া। পাশেই সবুজ টেনিস কোর্ট। সেই সবুজ কোর্টের দিকে তাকিয়ে থাকা। এর মধ্যে হঠাৎ করে মেয়েকে বললেন সানিয়ার মা— ‘তুমি তো তোমার গ্রীষ্মের ছুটিটা টেনিস খেলে কাটাতে পারো।’ সানিয়ার উৎসাহেরও কমতি ছিল না। কিন্তু পিচ্চি সানিয়াকে দেখে টেনিস কোচ হতাশ— ‘এত ছোট মেয়ে কী টেনিস খেলবে?’
তবে কোচের এ মনোভাব বদলে গেল মাত্র দিনকয়েকের মধ্যেই। সানিয়ার খেলার স্টাইল দেখে সেই কোচই বললেন— ‘এত কম বয়সে কাউকে এত ভালো টেনিস খেলতে আমি আগে কখনও দেখিনি।’
সানিয়ার সাফল্যের গল্পের সেই শুরু।
পরিশ্রম এবং পরিশ্রম
টেনিস কোচিং ক্লাসে দারুণ মনোযোগী ছাত্রী ছিলেন সানিয়া মির্জা। অনেক লম্বা সময় ধরে অনুশীলন রপ্ত করার অভ্যাস সেই ছেলেবেলা থেকেই। টেনিসের সঙ্গে এ ভালোবাসার কারণে তার শিশুকালটা আর দশজনের চেয়ে একটু আলাদা। আশপাশের ছেলেমেয়েরা যখন পার্কে বেড়াতে যেত অথবা জন্মদিনের পার্টিতে আনন্দ খুঁজত; তখন সানিয়া নিবেদিত টেনিসে! শৈশবের স্মৃতির প্রায় পুরোটাই আছে তার টেনিস এবং টেনিস। অতটুকুন বয়সে অত সিরিয়াসনেস প্রসঙ্গে সানিয়া বলছিলেন— ‘আমি জানতাম, আমাকে বাকিদের চেয়ে একটু অন্যভাবে গড়ে উঠতে হবে। পারিপার্শ্বিক সুখটা বিসর্জন দিতে হবে। জানতাম এ আত্মোৎসর্গ করতে না পারলে জীবনে বড় কিছু করা সম্ভব হবে না।’
সানিয়ার সাফল্যসিঁড়ির সোপান সেদিনের সেই কঠিন পরিশ্রম।
এবং সেনসেশন
পেশাদার টেনিসে সানিয়ার অভিষেক ২০০৩ সালে। বয়স তখন সবে ১৭। চমক দিয়েই শুরু তার। সে বছর উইম্বলডনের ডাবলসের শিরোপা জেতেন। গড়েন নতুন ইতিহাস। জুনিয়র গ্র্যান্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্টে সেটাই কোনো ভারতীয় নারীর প্রথম ট্রফি। পরের বছর হায়দরাবাদ ওপেনেও ডাবলসে চ্যাম্পিয়নের ট্রফি উঠল সানিয়ার হাতেই। ২০০৫ সাল তার ক্যারিয়ারের সেরা সাফল্যের সাক্ষী। হায়দরাবাদ ওপেনে এককের শিরোপা জেতেন তিনি। ডব্লিউটিএ’র এককের শিরোপা জেতা প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে টেনিসের রেকর্ড বুকে নাম লেখা হলো। মূলত এ সাফল্যই তাকে বিশ্ব টেনিসে নতুন পরিচিতি এনে দিল। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে সেবার বেশিদূর যেতে না পারলেও তার লড়াকু টেনিস সবার প্রশংসা কুড়ায়। ভারতজুড়ে সানিয়া নামটাই তখন ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে নতুন ‘ম্যানিয়া’!
স্পন্সর ও সম্মান
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে অর্থকড়ি নিয়েও বেশ ভাবতে হয়েছিল সানিয়াকে। কিন্তু সাফল্য আসার সঙ্গে সঙ্গে সেই সংকটও মিটে গেল। ২০০৫ সাল থেকে স্পন্সররা তার পিছু পিছু। তবে মাত্র ১২ বছর বয়সে জিভিকে গ্রুপ তাকে প্রথম স্পন্সর করে। বিখ্যাত স্পোর্টস সামগ্রী প্রস্তুতকারী কোম্পানি ‘লোটো’ এখন তার মূল স্পন্সর। ২০০৩ সালে পেশাদার টেনিসে অভিষেকের পরের বছরই অর্জুনা পুরস্কার পান সানিয়া। ২০০৬ সালে পান ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ সম্মানজনক পদ্মশ্রী পদক।
যত বিতর্ক
‘আপনি হাফপ্যান্ট পরে কোর্টে খেলেন, একজন মুসলিম মেয়ে হিসেবে ব্যাপারটা কি মানানসই’— এক সাংবাদিকের এমন বেমক্কা প্রশ্নের জবাবে সানিয়ার উত্তর কী ছিল জানেন?
‘আরে ভাই, আমি তো রাস্তায় মিনি স্কার্ট পরে হাঁটি না!’
ধর্মীয় অনুশাসন মানলেও গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় দেননি সানিয়া। ধর্মের সঙ্গে জীবনের সব অনুষঙ্গকে মিলিয়ে ঘোলাটে করেননি। যুক্তির সঙ্গে বুদ্ধি—এই দুয়ের মিশেলে জীবনের সব কঠিন লড়াইয়ে জয়টা সানিয়ার।
ভারতীয় মধ্যবিত্ত মুসলমান সমাজকে একটা নতুন সংজ্ঞা এনে দেন তিনি। বিয়ে নিয়েও বড় ঝামেলায় জয়টা তারই। হায়দরাবাদের এক তরুণের সঙ্গে বাগদান হয়েছিল। কিন্তু শেষমেশ সেই বাগদান নিজেই ভেঙে দেন সানিয়া। জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক শোয়েব মালিককে। তবে সেই ‘ম্যাচও’ তাকে জিততে হয়েছে কঠিন লড়াই করে। হায়দরাবাদের আরেক তরুণী মালিকের স্ত্রী হিসেবে নিজেকে দাবি করে মামলা ঠুকে দেন। দারুণ ঝঞ্ঝাটে পড়া শোয়েব মালিক সে সময় সানিয়ার পুরো সমর্থন পান। সানিয়া ও শোয়েবের বিয়ের প্রতিটি মুহূর্তের খবর ব্রেকিং নিউজে পরিণত হয়!
এবং এখন এক ছেলে নিয়ে সুখে-শান্তিতে আছেন তারা।
ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতে মহেন্দ্র সিং ধোনি মিস্টার ইন্ডিয়া। তাহলে টেনিসে অবধারিতভাবে মিসেস ইন্ডিয়া আর কেউ নয়—সানিয়া মির্জা!