আপন তারিক
প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ১৩:১৪ পিএম
আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ১৩:২৪ পিএম
তখন তিনি অষ্টাদশী। এই রড লেভার অ্যারেনাতেই প্রজাপতির মতো উড়েছিলেন। শুরু হয়েছিল গ্র্যান্ড স্ল্যামে পথচলা। সেই সিগনেচার ফোরহ্যান্ড শটে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন সেরেনা উইলিয়ামসকে। শুরুর দিনই জানিয়ে দিয়েছিলেন—আসছে নতুন এক চ্যাম্পিয়ন। তারপর কেটে গেছে ১৮ বসন্ত। তিনিও ছোট্ট সেই সানিয়া থেকে হয়ে উঠেছেন ভারতের কিংবদন্তি! কাকতালীয়ভাবে সেই মেলবোর্নের ইয়ারা নদীর পাড়েই লেখা হয়ে গেল তার শেষ গ্র্যান্ড স্ল্যামের গল্প!
আগামী মাসেই টেনিস র্যাকেট তুলে রাখবেন সানিয়া মির্জা। চোখ ঝলসানো ফোরহ্যান্ড শটগুলো স্মৃতি করে দিয়ে বিদায় বলবেন এই গ্ল্যামার গার্ল। তার আগে গ্র্যান্ড স্ল্যামে গতকাল শুক্রবার খেলে ফেললেন নিজের শেষ ম্যাচ। বিদায় বেলায় চোখের জলে লেখা হলো সানিয়ার ‘শেষের কবিতা’!
রূপকথার মতোই শেষ হতে যাচ্ছিল শেষটা। কিন্তু একটুর জন্য হলো না। ক্যারিয়ারের শেষ গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয় দিয়ে শেষটা করতে পারলেন না সানিয়া। মিক্সড ডাবলস ফাইনালে হেরে গিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলেন, চোখের জলে ভাসলেন তিনি। রানার্সআপ হয়ে পুরস্কারটা নিতে গিয়ে কথা বলতেই পারছিলেন না সানিয়া। বারবার চোখের জল মুছেছেন। গলা বুজে আসছিল।
চোখের বারিধারা না লুকিয়ে বলছিলেন, ‘আমি আজ কাঁদছি। এটা আসলে খুশির অশ্রু। চোখের এই জল দুঃখের নয়। সত্যি বলতে কী, চাইলে আরও গোটা দুয়েক প্রতিযোগিতা খেলতেই পারতাম। ২০০৫ সালে মেলবোর্নেই টেনিসের পথচলা শুরু করেছিলাম। তখন আমার বয়স ছিল ১৮। সেরেনার সঙ্গে খেলেছিলাম। আমার জীবনে রড লেভার অ্যারেনার আলাদা জায়গা রয়েছে। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।’
যদিও তার এই শেষ ম্যাচটাতে দেখা গেল না স্বামী ক্রিকেটার শোয়েব মালিককে। তাদের দূরত্বের গুঞ্জনটা জোরালো অনেক দিন ধরেই। তবে এ যাত্রা শোয়েবও ব্যস্ত। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) খেলছেন রংপুরের হয়ে। এটা অনেকেই বলছেন দুজনার দুটি পথ এখন দুই দিকে! তবে চার বছরের পুত্র ইজহান মির্জা মালিক মায়ের খেলা দেখলেন গ্যালারিতে বসে। ম্যাচ শেষে সানিয়া বলছিলেন, ‘আমার পরিবারের সবাই এখানে রয়েছে। কখনও ভাবিনি ছেলের সামনে গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনাল খেলতে পারব। সেটাও হলো শেষ বেলায়।’
গ্র্যান্ড স্ল্যাম নিরাশ করেনি তাকে। ২০০৯ সালে সানিয়া অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে মিক্সড ডাবলস খেতাব জেতেন মহেশ ভূপতিকে নিয়ে। এবার সানিয়া সপ্তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম খেতাব জেতার পথে ছিলেন। রোহান বোপানাকে নিয়ে মিক্সড ডাবলসের ফাইনালে ওঠেন। কিন্তু গতকাল ব্রাজিলের স্টেফানি-মাতোস জুটির কাছে হারলেন ৬-৭ (২-৭), ২-৬ গেমে। সত্যিই কি হারলেন? ৪২ বছরের বোপানাকে নিয়ে ৩৬ বছরের সানিয়ার লড়াইটা ছিল দেখার মতো!
অবশ্য গোটা ক্যারিয়ারেই এভাবে আলো ছড়িয়েছেন সানিয়া। ভারতের মতো দেশ থেকে উঠে এসে জায়গা করে নেন বিশ্ব টেনিসে। ভারতীয় টেনিসকে হয়তো আরও অনেক কিছুই দিতে পারতেন। কিন্তু ইনজুরি বারবারই পথে কাঁটা বিছিয়ে দিয়েছে। হার মানেননি যদিও সানিয়া। সন্তান জন্মের পরও লড়ে গেছেন। এবার হায়দরাবাদের সেই কন্যার ক্যারিয়ারে বিদায়ের করুণ রাগিণী! নিজে যেমন কাঁদলেন, কাঁদালেন ভক্তদেরও!
তার যত অর্জন
টেনিসকে সানিয়া মির্জা বিদায় দিতে শুরু করেন সেই ২০১৩ সালে। সে বছরই এককের খেলা ছেড়ে দেন তিনি। এককে শীর্ষ ২৭ নম্বরেও ওঠেন সানিয়া। যদিও তিনি সবচেয়ে সফল ডাবলস ও মিক্সড ডাবলসে। যেখানে প্রায় ৯১ সপ্তাহ ধরে ডাবলসে এক নম্বর তারকা ছিলেন এই ভারতীয়। ২০১৫ সালে সানিয়া মির্জা-মার্টিনা হিনগিস জুটি বেঁধে টানা জিতেছিলেন ৪৪টি ম্যাচ।
ভারতের একমাত্র নারী টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতার রেকর্ডও সানিয়ার। সব মিলিয়ে ক্যারিয়ারে পেয়েছেন তিনটি ডাবলস ও তিনটি মিক্সড ডাবলস। মিক্সড ডাবলস ২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, ২০১২ সালে ফ্রেঞ্চ ওপেন আর ২০১৪ সালে ইউএস ওপেন ট্রফি ওঠে তার হাতে। ডাবলসে ২০১৫ সালে উইম্বলডন আর ইউএস ওপেন, ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের শিরোপাও নিজের করে নেন এই গ্ল্যামার গার্ল। এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমসেও পদক জিতে বনে যান কিংবদন্তি!