আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে বুধবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় যখন মার্কিন রেফারি ইসমাইল এলফাথ বাঁশি বাজাবেন, তখন থমকে যাবে গোটা বিশ্ব।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ও শেষ সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে ফুটবল দুনিয়ার দুই আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বী দ্বিতীয় ফিফা র্যাঙ্কিংধারী ও বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং চতুর্থ র্যাঙ্কিংধারী ও সাবেক চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড। এই ম্যাচটি ঘিরে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর উন্মাদনা এখন আকাশছোঁয়া। শুধু বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল বলেই নয়, ১৯৮২ সালের বহুল আলোচিত ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’ নিয়ে দুই দেশের মধ্যকার তীব্র রাজনৈতিক আবেগ এবং সর্বকালের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারে এই প্রথম ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাঠে নামার ঘটনা উত্তেজনার পারদকে নিয়ে গেছে এক অলীক উচ্চতায়।
হেড টু হেড ও ইতিহাসের পাতা
সামগ্রিক পরিসংখ্যান ও বিশ্বকাপের ইতিহাসে জয়ের বিচারে এগিয়ে রয়েছে ইংল্যান্ড। দুই দেশের ১৫ বারের দেখায় থ্রি লায়ন্সদের ৬ জয়ের বিপরীতে লা আলবিসেলেস্তেদের জয় ৪টিতে, বাকি ৫ ম্যাচ ড্র। বিশ্বকাপে পাঁচবারের মোকাবিলায় ইংল্যান্ড জিতেছে ৩ ম্যাচে, আর্জেন্টিনা ২টিতে। এমনকি ২০০৫ সালের সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচেও ৩-২ গোলে জিতেছিল ইংল্যান্ডই।
তবে এই পরিসংখ্যানে থ্রি লায়ন্সদের স্বস্তির কিছু নেই। কারণ বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর্জেন্টিনা আজ পর্যন্ত কখনও সেমিফাইনালে হারেনি! আগের পাঁচটি সেমিফাইনালের প্রতিটিতেই জিতেছে লা আলবিসেলেস্তেরা। পাঁচটি সেমিতে তারা ১৯৩০ আসরে যুক্তরাষ্ট্রকে ৬-১, ১৯৮৬ আসরে বেলজিয়ামকে ২-০, ১৯৯০ আসরে ইতালিকে টাইব্রেকারে ৪-৩ (১-১), ২০১৪ আসরে নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে ৪-২ (০-০) এবং ২০২২ আসরে ক্রোয়েশিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়েছিল।
পক্ষান্তরে এক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের অতীত ইতিহাস তেমন সুবিধার নয়। আগের তিনটি সেমির মধ্যে তারা মাত্র একটিতে জিতেছে ১৯৬৬ আসরে পর্তুগালকে ২-১ গোলে হারিয়ে। আর হেরে যায় ১৯৯০ আসরে পশ্চিম জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে ৪-৩ (১-১) গোলে এবং ২০১৮ আসরে ক্রোয়েশিয়ার কাছে ২-১ গোলে।
১৯৬৬ বনাম ১৯৮৬Ñ শত্রুতার শেকড় যেখানে
অনেকে মনে করেন এই ফুটবলীয় শত্রুতার শুরু ১৯৮৬ সালের দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ কিংবা ফকল্যান্ড যুদ্ধের কারণে। কিন্তু এর আসল সূত্রপাত ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। ওয়েম্বলির সেই ম্যাচে জার্মান রেফারির সিদ্ধান্তে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ পান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিন। ভাষাগত সমস্যার কারণে দোভাষী চাইলেও তা মেলেনি এবং রাত্তিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে প্রায় ১০ মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ মাঠে নেমে তাকে বের করে দেয়। ম্যাচ শেষে ইংরেজ ম্যানেজার আলফ রামসে নিজ দলের জর্জ কোহেনকে আর্জেন্টিনার সঙ্গে জার্সি বদল করতে বাধা দেন এবং আর্জেন্টাইনদের ‘পশু’ বলে গালি দিয়েছিলেন!
তবে বিশ্বমিডিয়া এখন বেশি মাতামাতি করছে ১৯৮৬ সালের সেই মহাকাব্যিক ম্যাচ নিয়ে। যেখানে ম্যারাডোনার সেই বিতর্কিত ‘ঈশ্বরের হাতের গোল’ এবং ৬ ইংলিশ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করা ‘শতাব্দীর সেরা গোল’-এর ওপর ভর করে ২-১ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। এবার সেমিফাইনালের মঞ্চে নামার আগে আর্জেন্টিনা দল যখন ফিফার কাছে তাদের প্রথাগত আকাশি-সাদার বদলে ‘নীল জার্সি’ (অ্যাওয়ে জার্সি) পরে খেলার জন্য বিশেষ আবেদন জানায়, তখন আর বুঝতে বাকি থাকে নাÑ তারা ছিয়াশির সেই ম্যারাডোনার স্মৃতির মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্রই ব্যবহার করতে চাচ্ছে।
মেসির সামনে চক্রপূরণের সুযোগ
আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০৫ ম্যাচে ১২৫ গোল (বিশ্বকাপে ২১ গোল) করা লিওনেল মেসি তার ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ও শেষ বিশ্বকাপে খেলছেন। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে কখনও খেলা হয়নি এই জাদুকরের! কাল গোল করতে পারলে বড় টুর্নামেন্টে ইউরোপীয় জায়ান্টদের বিরুদ্ধে তার গোলসংখ্যা যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি উরুগুয়ে, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেনের পর ষষ্ঠ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশ হিসেবে ইংল্যান্ডের জালে বল জড়িয়ে ‘বিশ্বকাপজয়ী’ দেশগুলোর বিপক্ষে গোল করার চক্রপূরণের খুব কাছে পৌঁছে যাবেন তিনি (বাকি থাকবে শুধু ইতালি)।
বেলিংহাম-কেইন, লাউতারো-হুলিয়ান, মার্তিনেজ-পিকফোর্ড লড়াই
ইংল্যান্ডের জয়ের প্রধান নায়ক হতে পারেন ২৩ বছর বয়সী জুড বেলিংহাম। অধিনায়ক হ্যারি কেইনের মতো চলতি বিশ্বকাপে তিনিও করেছেন ৬ গোল, যা মেসির (৮ গোল) সঙ্গে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে তাকে বেশ ভালোভাবেই টিকিয়ে রেখেছে। দরকারের সময় গোল করে বেলিংহাম হয়ে উঠেছেন টমাস টুখেলের মূল অস্ত্র। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা শুধু মেসির ওপর নির্ভরশীল নয়, তা প্রমাণ করেছেন লাউতারো মার্তিনেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ।
ম্যাচটি হতে পারে দুই গোলরক্ষকেরও। খেলা টাইব্রেকারে গড়ালে আর্জেন্টিনার ‘বাজপাখি’ খ্যাত এমিলিয়ানো মার্তিনেজ এবং ইংল্যান্ডের জর্ডান পিকফোর্ডের ওপর থাকবে মূল ভরসা। তবে আন্তর্জাতিক টাইব্রেকারে কখনও না হারা এমি মার্তিনেজ মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে অনেকটাই এগিয়ে থাকবেন।
ম্যাচ-পূর্ব মন্তব্যÑ কী বলছেন কোচ ও অধিনায়করা
আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি ম্যাচটিকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে দূরে রেখে বলেন, “এটি মাঠের বাইরের কোনো যুদ্ধ নয়, এটি শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ। ইংল্যান্ড অত্যন্ত শক্তিশালী দল এবং আমরা আমাদের স্বাভাবিক পরিকল্পনা নিয়েই মাঠে নামব”।
অধিনায়ক লিওনেল মেসি তার শেষ বিশ্বকাপ নিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমার শেষ বিশ্বকাপে আরেকটি ফাইনাল খেলার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাই না। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলাটা সব সময়ই স্পেশাল, আমি আমার সেরাটা দিতে প্রস্তুত”।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের জার্মান কোচ টমাস টুখেল রণকৌশল নিয়ে বলেন, “আর্জেন্টিনা বর্তমান চ্যাম্পিয়ন এবং তাদের মেসি আছে, যাকে আটকানো প্রায় অসম্ভব। তবে আমাদের বেলিংহাম এবং কেন ফর্মে আছে। আমরা ৬০ বছর পর ইংল্যান্ডকে ফাইনালে তুলতে বদ্ধপরিকর”।
ইনসাইড ফিফা ও বেইন স্পোর্টসের রিপোর্ট অনুযায়ী, জুড বেলিংহাম মেসির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ম্যাচ শুরুর আগে বলেছেন, ‘মেসি মাঠে এমন কিছু জিনিস করে, যা দেখলে মনে হয় সে মানুষই নন। তার বিরুদ্ধে খেলাটা আমার জন্য গর্বের, তবে মাঠে আমরা জয়ের জন্যই লড়ব।’ ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন বলেন, ‘আমাদের এই দলটির বিশ্বজয়ের সব সামর্থ্য আছে। আর্জেন্টিনার কঠিন রক্ষণ ভেঙে ফাইনালে যাওয়াই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।’
বুধবারের এই মহাসংগ্রামে জিতে আর্জেন্টিনা কি পারবে বিশ্বকাপে হেড টু হেডের ব্যবধান ৩-৩-এ নামিয়ে এনে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠতে? নাকি থ্রি লায়ন্স ভাইকিংদের পর এবার লাতিন সূর্যকে ডুবিয়ে দীর্ঘ ৬০ বছর পর পা রাখবে বিশ্বমঞ্চের ফাইনালে? উত্তর দেবে মার্সিডিজ-বেঞ্জের সবুজ গালিচা।