মুখোমুখি আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড
লিওনেল মেসি ও হ্যারি কেন। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ মানেই একটা যুদ্ধ যুদ্ধ আবহ। ফুটবলের কিছু দ্বৈরথ থাকেÑ যা শুধু কেবল একটি ম্যাচের মধ্যেই আটকে থাক না।
যুদ্ধ রাজনীতি সর্বোপরি সাধারণ মানুষের আবেগÑ সবকিছু ভর করে এই ম্যাচের ওপর। ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা স্নায়ুযুদ্ধ হয়ে উঠেছে বিশ্বকাপ ফুটবলের এক চিরন্তন শত্রুতার সিম্বল। আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় আটলান্টায় শুরু হবে বহুল কাঙ্ক্ষিত ম্যাচটি।
আজকের ম্যাচে জয় মানেই শিরোপার দিকে এগিয়ে যাওয়া। শিরোপা লড়াইয়ের শেষ ধাপে পা রাখা। কাঙ্খিত সেই লক্ষ্য অর্জনে আর্জেন্টিনা তাকিয়ে অধিনায়ক লিওনেল মেসির দিকে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বটা কাঁধে নিয়েছেন হ্যারি কেইন। উভয়ে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা। এ পর্যন্ত আট গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে লিওনেল মেসি। কেইন ছয় গোল নিয়ে মেসিকে অনুসরণ করে চলেছেন। মেসির সমান সংখ্যক গোল রয়েছে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপের। আর কেইন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তারই দলের জুডে বেলিংহামের সঙ্গে।
চির বৈরিতার শুরু ও লাল-হলুদ কার্ডের উৎপত্তি
১৯৬৬ সালের ২৩ জুলাই। ইংল্যান্ডের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে লড়াইয়ে নামে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। ম্যাচের শুরু থেকেই যুদ্ধংদেহী হয়ে ওঠে দুই দলই। মাঠের খেলার চেয়ে ম্লেজিং ও শক্তির প্রয়োগকেই বেশি প্রাধান্য দেয় দু দলের ফুটবলাররা। এই ম্যাচের ৩৫ মিনিটে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাটিনকে মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন রেফারি।
মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান রাটিন। হট্টগোল নেয় চরম আকার। তৎকালীন সময়ে হলুদ বা লাল কার্ডের প্রচলন ছিল না। প্রায় আট মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। একপর্যায়ে মাঠের নিরাপত্তার জন্য পুলিশকে প্রবেশ করতে হয়। শেষ পর্যন্ত রাটিন মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। ১০ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা। বিতর্কিত ম্যাচটিতে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে ওঠে যায়। তবে এই ম্যাচের অভিজ্ঞতা ফুটবলে নিয়ে আসে যুগান্তকারী পরিবর্তন। ফুটবলে কার্ড ব্যবহার পরিণত হয় সময়ের দাবিতে।
হলুদ ও লাল কার্ডের উৎপত্তির ধারণা সর্বজন গ্রহীত হয়। প্রথমে তৎকালীন ফিফা রেফারি কমিটির সদস্য কেন অ্যাস্টন ট্রাফিকের নিয়মের (সবুজ, হলুদ ও লাল বাতি) আদলে কার্ড প্রবর্তন করার চিন্তা করেন, যাতে খেলোয়াড় ও দর্শকরা খুব সহজেই সতর্কবার্তা বা বহিষ্কারাদেশ বুঝতে পারে। অনেক আলোচনা শেষে ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফুটবলে শুরু হয় কার্ডের ব্যবহার।
লাল-হলুদ কার্ডের পাশাপাশি, ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার শত্রুতারও শুরু ওই ম্যাচ থেকেই।
ফকল্যান্ড যুদ্ধ : ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’
১৯৮২ সালে দক্ষিণ আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপ ফকল্যান্ড নিয়ে তুলকালাম বাঁধিয়ে দেয় আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধে আর্জেন্টিনার প্রায় সাড়ে ছয়শ সৈন্য নিহত হয়। যাদের বেশির ভাগের বয়স ছিল ১৮ বছর কিংবা তারও নিচে।আর্জেন্টিনার হয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া এই তরুণদের একটা বড় অংশই এসেছিল বুয়েনস আইরেসের হতদরিদ্র বস্তিগুলো থেকে। সেই হতদরিদ্র মানুষগুলোর হয়ে প্রতিশোধ নিতে বোধ করি খোদ ঈশ্বরই পাঠিয়েছিলেন ফুটবলের প্রবাদ পুরুষ দিয়াগো ম্যারাডোনাকে। ১৯৮৬-র মেক্সিকো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালটিকে প্রতিশোধের মঞ্চ বানিয়ে নেন ম্যারাডোনা।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ (‘ঈশ্বরের হাত’) ও ‘সর্বকালের সেরা ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র এক বাস্তবতার জাদু দেখেছিল ফুটবল বিশ্ব।
ম্যাচের ৫১তম মিনিটে শূন্যে ভাসা বল নিখুঁত এক চাতুরীতে, ইংলিশ গোলকিপার পিটার শিলটনকে বোকা বানিয়ে নিজের বাম হাতের জাদুতে জালে জড়ান ম্যারাডোনা। ম্যাচ শেষে রসিকতা করে তিনি বলেছিলেন, ‘গোলটি খানিকটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, আর বাকিটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে হয়েছে।’ বিতর্কের সেই রেশ কাটতে না কাটতেই, এর ঠিক চার মিনিট পর ম্যারাডোনা যা ঘটালেন, তা ছিল এক অলৌকিক দৃশ্য। নিজেদের অর্ধে বল পেয়ে একক নৈপুণ্যে একে একে ৬ জন ইংলিশ ডিফেন্ডার ও গোলকিপারকে ড্রিবলিংয়ের মায়াজালে বশ মানিয়ে বল জালে জড়ান ম্যারাডোনা। মুহূর্তের মধ্যে এস্তাদিও আজতেকার ১ লাখ ১৪ হাজার মানুষ ঘটনার আকস্মিকতায় হয়ে উঠেছিলেন বিস্মসয়াবিস্ট। ম্যাচটি আর্জেন্টিনা জিতেছিল ২-১ ব্যবধানে। মহাকাব্যিক সেই জয়ের পর কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ নিয়ে অনেকটা গম্ভীর হয়েই এক সাক্ষাৎকারে ‘মালভিনাস’ শব্দটি আওড়িয়েছিলেন আর্জেন্টাইন ফুটবল জাদুকর। ‘মালভিনাস’ শব্দটি ফকল্যান্ডের দ্বীপের বসবাস করা মানুষের প্রতিনিধিত্বকে বোঝায়।
বেকহ্যামের লালকার্ড ও আর্জেন্টিনার নাটকীয় জয়
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ। শেষ ষোলোর ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি আর্জেন্টিনা। ঘটনাবহুল এই ম্যাচে বিপক্ষে আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার দিয়েগো সিমিওনের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন ইংলিশ সেনসেশন ডেভিড বেকহ্যাম। একটা পর্যায়ে একটা ফাউলের পর সিমিওনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে লাথি মারেন বেকহ্যাম। তৎক্ষণাৎ বেকহ্যামকে লালকা্র্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বহিষ্কার করেন রেফারি। ১০ জনের দলে পরিণত হয় ইংল্যান্ড।
ম্যাচটি নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত থাকে ২-২ সমতা। এরপর টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালে উন্নীত হয় আর্জেন্টিনা।
বেকহ্যামের মধুর প্রতিশোধ ও আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়
বেকহ্যামের মেজাজ হারানোর কারণে কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই বিদায় ঘণ্টা বেজে গিয়েছিল ইংল্যান্ডের। এর ৪ বছর পর ২০০২ বিশ্বকাপে মধুর প্রতিশোধটাই নেন ইংলিশ অধিনায়ক বেকহ্যাম। এই আসরে একই গ্রুপে পড়েছিল ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। বেকহ্যামের করা একমাত্র পেনাল্টি গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারায় ইংল্যান্ড। আর এই হারের ধাক্কা সামলাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্ব থেকেই শেষ হয়ে যায় তাদের বিশ্বকাপ।
আবারও ‘মালভিনাস’ এবং মেসি
সম্প্রতি আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা ড্রেসিংরুমের ভেতর গান গাইছিলেন তারা ‘মালভিনাসের জন্য’ বিশ্বকাপ জিতবেন। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের নামই যে আর্জেন্টাইনদের কাছে ‘মালভিনাস’।
দুই যুগ পর আবারও বিশ্বকাপে মুখোমুখি চিরবৈরী এই দুই দেশ। এবার মঞ্চে ফুটবলের আরেক মহানায়কÑ লিওনেল মেসি। ক্যারিয়ারের এই শেষ সময়ে এসে মেসির সামনে এখন ফকল্যান্ডের সেই পুরনো ক্ষত, ম্যারাডোনার রেখে যাওয়া মহাকাব্য আর আর্জেন্টিনার কোটি মানুষের আবেগকে এক সুতোয় বাঁধার মোক্ষম সুযোগ। যে ফকল্যান্ড আজও ব্রিটেনের দখলে। আর বিশ্বমঞ্চে প্রতিপক্ষ যখন ইংল্যান্ড, আর্জেন্টাইনরা তখন নতুন করে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে। আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের কাছে এটি কেবল কোনো ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং মালভিনাস ট্র্যাজেডির এক অলিখিত প্রতিশোধের মঞ্চ। ম্যারাডোনার সুযোগ্য উত্তরসূরি মেসি কি পারবেন, ম্যাচ শেষে গুরুর মতোই ‘মালভিনাস’ আওড়াতে।