যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স এবং বর্তমান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিশ্বকাপের শেষ চারে জায়গা করে নেওয়ার পর আর কোনো হিসাব থাকে না। সেখানে থাকে শুধু সাহস, সামর্থ্য আর ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন নিয়েই মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই পরাশক্তি দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স এবং বর্তমান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। বাংলাদেশ সময় রাত একটায় শুরু হবে ম্যাচটি। জয়ী দল সরাসরি ওঠে যাবে ২০২৬ বিশ্বকাপের মহারণে, যেখানে অপেক্ষায় থাকবে ইংল্যান্ড কিংবা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
ফ্রান্সের সামনে এবার ইতিহাস স্পর্শ করার বিরল সুযোগ। টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলছে লে ব্লুরা। জয় পেলে তারা বিশ্বকাপের টানা তৃতীয় ফাইনালে ওঠা মাত্র তৃতীয় দল হবে। এর আগে এই কীর্তি গড়েছিল শুধু ব্রাজিল ও জার্মানি।
এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের যাত্রা ছিল প্রায় নিখুঁত। গ্রুপপর্বে টানা ছয় জয় তুলে নেওয়ার পর তারা নকআউটে সুইডেন, প্যারাগুয়ে ও মরক্কোকে বিদায় করেছে। এখন পর্যন্ত ১৬ গোল করা ফরাসিরা আক্রমণভাগে ছিল দুর্দান্ত ছন্দে।
কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে গোলের একাধিক সুযোগ নষ্ট করেছিল ফ্রান্স। অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে প্রথমার্ধে পেনাল্টিও মিস করেন। তবে সেই হতাশা ভুলিয়ে দারুণ এক গোলে দলকে এগিয়ে দেন তিনি। পরে উসমান দেম্বেলেকে দিয়ে আরেকটি গোল করিয়ে জয় নিশ্চিত করেন ফরাসি অধিনায়ক।
এমবাপে, দেম্বেলে, মাইকেল অলিসে এবং তরুণ দেজিরে দুয়ে কিংবা ব্র্যাডলি বারকোলাকে নিয়ে গড়া ফ্রান্সের আক্রমণভাগ এবারের বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বারবার ভেঙে দিয়েছে। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে থাকা এমবাপে ইতোমধ্যেই করেছেন আট গোল। অন্যদিকে ব্যালন ডি’অরজয়ী দেম্বেলের সঙ্গে তার বোঝাপড়াও অসাধারণ। দুজন মিলে একে অপরের জন্য সৃষ্টি করেছেন ১৯টি গোলের সুযোগ।
এই বিশ্বকাপই ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশমের শেষ টুর্নামেন্ট। দীর্ঘ ১৪ বছরের দায়িত্ব পালনের পর বিশ্বকাপ শেষেই বিদায় জানাবেন তিনি। ১৯৯৮ সালে অধিনায়ক হিসেবে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতানো দেশম এবার কোচ হিসেবে খেলাতে যাচ্ছেন নিজের ২৬তম বিশ্বকাপ ম্যাচ, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো কোচের সর্বোচ্চ।
ইতিহাসও ফরাসিদের পক্ষেই কথা বলছে। বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ চারটি সেমিফাইনালেই জয় পেয়েছে ফ্রান্স। সর্বশেষ তিনটি সেমিফাইনালে তারা একটি গোলও হজম করেনি। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে একমাত্র দেখায়ও জয় ছিল ফরাসিদের।
তবে অতীতের অন্য এক হিসাব স্পেনকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে। সর্বশেষ ১০ দেখায় সাতবার জিতেছে লা রোজারা। ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনালে ২-১ এবং গত বছরের উয়েফা নেশনস লিগের রোমাঞ্চকর ৫-৪ গোলের ম্যাচেও হারিয়েছিল তারা ফ্রান্সকে।
স্পেনও এবারের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। গ্রুপ পর্বের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করার পর তারা নকআউটে অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামকে বিদায় জানিয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের ঠিক আগে বদলি নেমে জয়সূচক গোল করেন মিকেল মেরিনো। এর আগে পর্তুগালের বিপক্ষেও বদলি হিসেবে নেমে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন তিনি। ফলে বিশ্বকাপ ইতিহাসে নকআউট পর্বের দুটি ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে জয়সূচক গোল করা প্রথম ফুটবলার হয়ে গেছেন স্প্যানিশ এই মিডফিল্ডার।
বর্তমান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এবারই প্রথম আবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছে। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে তাদের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও ঈর্ষণীয়। ২০১৮ বিশ্বকাপের পর বড় টুর্নামেন্টে ২৭ ম্যাচে তাদের হার মাত্র একটি। শেষ ১৪ ম্যাচে অপরাজিত থেকে নয়টি ক্লিন শিটও রেখেছে স্পেন।
দুই দলের লড়াইয়ে ব্যক্তিগত দ্বৈরথও থাকবে আলোচনায়। একদিকে আট গোল করা এমবাপে, অন্যদিকে ইউরোর নায়ক লামিন ইয়ামাল। যদিও এবারের বিশ্বকাপে এখনও নিজের সেরা ছন্দে দেখা যায়নি তরুণ স্প্যানিশ উইঙ্গারকে, তবুও বড় ম্যাচে তার সামর্থ্য নিয়ে কোনো সংশয় নেই।
ফ্রান্স শিবিরে স্বস্তির খবর, মরক্কো ম্যাচে গোড়ালিতে চোট পাওয়া এমবাপে সেমিফাইনালের আগেই সুস্থ হয়ে উঠছেন। হাঁটুর সমস্যায় বদলি হওয়া মানু কোনেও অনুশীলনে ফিরেছেন। অন্যদিকে উরুর চোট কাটিয়ে অরেলিয়েন চুয়ামেনিও দলে ফেরার লড়াইয়ে রয়েছেন।
স্পেন শিবিরে আক্রমণভাগে রয়েছে সুখকর প্রতিযোগিতা। চার গোল করা মিকেল ওইয়ারসাবাল এগিয়ে থাকলেও ফেরান তোরেস, নিকো উইলিয়ামস ও ইয়েরেমি পিনো শুরুর একাদশে জায়গা পাওয়ার অপেক্ষায়। মাঝমাঠে পেদ্রি ও মেরিনোর উপস্থিতি কোচ দে লা ফুয়েন্তেকে দিয়েছে বাড়তি বিকল্প।
একদিকে বিশ্বকাপ ফাইনালে টানা তৃতীয়বার ওঠার স্বপ্নে বিভোর ফ্রান্স। অন্যদিকে ১৬ বছর পর আবার বিশ্বকাপের সিংহাসন পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখছে স্পেন। ইতিহাস, প্রতিশোধ, তারকার লড়াই আর ফুটবলীয় সৌন্দর্য সব মিলিয়ে ডালাসের রাত হতে চলেছে ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায়গুলোর একটি।