লিওনেল মেসি। ছবি: রয়টার্স
ফুটবল মাঠে লিওনেল মেসির ধীর পায়ে হাঁটা নিয়ে দর্শকের মনে নানা প্রশ্ন জাগে। অনেকেই একে বয়সের ছাপ ভাবলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক অতিপ্রাকৃত ক্রীড়া বুদ্ধিমত্তা।
দি অ্যাথলেটিকে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে আয়ারল্যান্ডের ক্রীড়া সাংবাদিক কনর ও’নিল সেই জাদুকরী কৌশলের ব্যবচ্ছেদ করেছেন। অনুবাদ করেছেন জাহাঙ্গীর সুর।
সেরা খেলোয়াড়রা ফুটবল খেলেন অনেকটা যেন হেসেখেলেই। লিওনেল মেসির বেলায় আক্ষরিক অর্থেই কথাটা খাটে।
এবারের বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-২ গোলের রোমাঞ্চকর প্রত্যাবর্তনের জয় সবার মনে বেশ দাগ কেটেছে।
সেদিন শেষ বাঁশি বাজার পর মেসিকে তার স্বভাববিরুদ্ধভাবে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। তবে শারীরিকভাবে তাকে সেদিন খুব একটা ঘাম ঝরাতে হয়নি।
এবারের আসরে প্রতিটি ম্যাচে বেশিরভাগ সময়ই মেসি হেঁটে কাটিয়েছেন। বিশ্বকাপজুড়ে তার মোট নড়াচড়ার ৬৩ শতাংশই ছিল হাঁটাহাঁটি।
এবারের প্রতিযোগিতায় অন্য যেকোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের তুলনায় যা অনেক বেশি। ম্যাচে ২৫ শতাংশ সময় মেসি স্রেফ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কাটিয়েছেন।
মাঝে মাঝে (৮.৬ শতাংশ) তিনি জগিং করেন। অন্যদিকে তিনি ক্ষিপ্রগতিতে দৌড়ান খুবই কম সময় (০.১ শতাংশ)।
এর কারণ কি বয়স? বয়সের ওপর এর দায় চাপানোটা বেশ স্বাভাবিক মনে হতে পারে। একজন ৩৯ বছর বয়সী খেলোয়াড় সতর্কতার সঙ্গে নিজের শরীরকে সামলাচ্ছেন; ম্যাচের নির্ণায়ক মুহূর্তগুলোর জন্য শক্তি সঞ্চয় করে রাখছেন।
কিন্তু স্বল্প দূরত্বে আগের সেই প্রবল ক্ষিপ্রতা আর না থাকলেও, ধীরগতিতে হাঁটাহাঁটি বা পায়চারি করা সব সময়ই মেসির খেলার অনবদ্য অংশ।
২০২৪ সালে তিনি ক্লাংক মিডিয়াকে বলেছিলেন, তার ছেলেবেলার আর্জেন্টাইন ক্লাব নিওয়েল’স ওল্ড বয়েজের হয়ে দৌড়ানোর অনুশীলন করতে বলা হলে তিনি ‘গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকতেন’।
এ কি নিছকই অলসতা? না, এর পেছনে লুকিয়ে আছে বড় কার্যকারণ। আক্রমণভাগের থার্ডে (অ্যাটাকিং থার্ড) বল ছোঁয়ার দিক থেকে মেসি তৃতীয় স্থানে রয়েছেন, ১৫টি বড় সুযোগ তৈরি করে তিনি তৃতীয় অবস্থানে আছেন এবং আটটি গোল নিয়ে কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে গোল্ডেন বুট জেতার দৌড়েও এগিয়ে আছেন।
মেসির এই পায়চারি আরও বেশি যৌক্তিক মনে হতে শুরু করে, যখন আপনি খেয়াল করবেন, তিনি ঠিক কোথায় কোথায় হাঁটছেন।
যদিও তাকে মাঠের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে টহল দিতে দেখা যায়, তবে ফিফার ট্র্যাকিং ডেটা ব্যবহার করে তৈরি করা হিটম্যাপ থেকে দেখা যাচ্ছে, তার হাঁটাচলা মূলত সেন্টার সার্কেল ও পেনাল্টি এরিয়ার মাঝখানে সেই পরিচিত ইনসাইড-রাইট পকেটেই সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রীভূত থাকে।
ঠিক ওই জায়গাতেই মেসি সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর, যেখানে তিনি ঘুরে গিয়ে বল রিসিভ করে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের দিকে ছুটে যেতে পারেন। কোয়ার্টার ফাইনালের আগে, তিনি প্রতিপক্ষের মিডফিল্ড ও রক্ষণভাগের মাঝখানে ৯৭ বার বল রিসিভ করেছিলেন, যা প্রতিযোগিতায় ষষ্ঠ সর্বোচ্চ।
দৃষ্টি আকর্ষণ করতে না চেয়ে বা নিজের পছন্দের জায়গার বাইরে যেতে না চেয়ে, মেসি এখানে ক্ষিপ্রগতির দৌড়ের পরিবর্তে সূক্ষ্ম সমন্বয়ের মাধ্যমে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করে নেন।
নিজে দৌড়ানোর বদলে, তিনি তার সতীর্থদের দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে নিজের সুবিধার জন্য সরিয়ে নেন।
মেসির বিশেষত্ব হলো, তিনি এমন সব জায়গায় হাঁটাহাঁটি করেন, যেখানে তাকে ডিফেন্ড করার জন্য প্রতিপক্ষশিবির কোনো ছক কষতে সহজে পারে না।
মেসি কি মিডফিল্ডার? ফুল-ব্যাক? নাকি সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার?’ বুঝে উঠতেই প্রতিপক্ষের সময় ঝরে যায়।
ডিফেন্ডারদের মনোযোগ কখন অন্যদিকে সরে গেছেÑ তা বুঝতে পারা, বিশেষত আর্জেন্টিনা যখন দ্রুতগতিতে আক্রমণ করে, তখন এই তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি বেশ কাজে দেয়।
যখন রানাররা তাকে ছাড়িয়ে দ্রুত সামনে এগিয়ে যায় এবং ডিফেন্ডাররা পেছনে ছুটতে বাধ্য হয়, তখন মেসি পেছনেই থেকে যান, বক্সের প্রান্তে শূন্যতা বা ফাঁকা জায়গা তৈরি হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার ২-০ গোলের জয়ে তার প্রথম গোলটি মেসি এভাবেই করেছিলেন।
পেছনের রানারদের আটকাতে যখন ডিফেন্ডাররা হিমশিম খাচ্ছিলেন, তখন সবার অলক্ষ্যে ডি-বক্সের প্রান্তে গিয়ে তার ট্রেডমার্ক ফিনিশিংয়ের মাধ্যমে তিনি গোলটি করেন।
হাঁটার গতিতে কারও নজরে না পড়ার এই ক্ষমতা মেসিকে অফসাইড ফাঁদ এড়াতেও সাহায্য করে। ডিফেন্সিভ লাইন যখন ওপরের দিকে উঠে যায়, তখন অনসাইডে ফেরার জন্য তার কোনো তাড়া থাকে না; বরং তিনি দৃষ্টিসীমার বাইরে থেকে ধীরে ধীরে নিজের হিসাবি অবস্থানে ফিরে আসেন।
ডিফেন্ডাররা একবার তাকে চোখের আড়াল করলেই, অনসাইডে ফেরার জন্য মেসিকে ক্ষিপ্র হতে দেখা যায়; তিনি পেছন দিকে ছুটে যান। যেমনটা তিনি কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলের সময় করেছিলেন।
লিসান্দ্রো মার্তিনেজের ভাসানো পাস রিসিভ করার আগে তিনি সেন্টার-ব্যাক দিনেইয়ের চোখের আড়াল দিয়ে দৌড় শুরু করেছিলেন।
মেসির হাঁটাহাঁটি কেন এত বিপজ্জনক, ওই দৌড়টি তার মূল ব্যাখ্যাটি দিতে পারে।
তার পায়চারি প্রতিপক্ষকে নিরাপত্তার এক মিথ্যা অনুভূতিতে আচ্ছন্ন করে রাখে এবং তিনি যখন আচমকা সামনের দিকে ছুটে যান, তখন ডিফেন্ডারদের হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।
২০১৬ সালে বার্সেলোনার বিপক্ষে ম্যানচেস্টার সিটির ম্যাচের আগে, মেসির প্রাক্তন কোচ পেপ গার্দিওলা এই গতিশীলতার রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, “দেখে মনে হতে পারে, মেসি কেবল উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছে। স্প্যানিশ লিগে সম্ভবত মেসিই সবচেয়ে কম দৌড়ানো খেলোয়াড়। কিন্তু যখনই বল তার কাছে পৌঁছায়, কে কোথায় আছে তার সম্পূর্ণ এক্স-রে ছবি যেন তার জানা থাকে। এরপর? বাকিটা ইতিহাস!”
এই বেছে বেছে হঠাৎ ক্ষিপ্রতার প্রকাশ মেসি সেই মুহূর্তগুলোর জন্যই তুলে রাখেন, যখন প্রতিপক্ষকে তিনি সবচেয়ে বেশি ধসিয়ে দিতে পারেন।
তথ্য-উপাত্ত বলছে, মেসি যখন দৌড়ান, তখন তিনি প্রায় সব সময়ই সামনের দিকে এগোতে থাকেন। আর্জেন্টিনার বল দখলে থাকার সময় তার দৌড়গুলোর ৭১ শতাংশ শেষ হয়েছে ফাইনাল থার্ডে এবং ২১ শতাংশ শেষ হয়েছে বক্সের ভেতর।
পায়চারি করতে করতেই মেসি কতটা বিপজ্জনক হতে পারেন, তা বিরোধী শিবিরের ডিফেন্ডারদের বিবেচনায় থাকেই।
বিপদের কথা মাথায় রেখে তারা মেসিকে একেবারে গা-ঘেঁষে আটকে রাখতে প্রলুব্ধও হন। তবে কাজটা অতটা সহজও নয়।
যেমনটা ব্যাখ্যা করেছেন মেসির বিপক্ষে খেলা আর্সেনালের প্রাক্তন ডিফেন্ডার উইলিয়াম গালাস।
তিনি দি অ্যাথলেটিককে বলেন, “এমনকি মেসি যখন হাঁটেন, তখনও একজন ডিফেন্ডার হিসেবে আপনি চাইবেন না যে তিনি বলটি পাক। তাই আপনি তার কাছাকাছি যাওয়ার কথা ভাববেন। কিন্তু আপনি যদি তার কাছাকাছি যান, তবে তিনি আগেই সেই লড়াইয়ে জিতে যান। কারণ তিনি যদি বল না-ও পান, আপনি নিজের পেছনে ফাঁকা জায়গা তৈরি হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। আর ঠিক এটাই মেসি চান।”
সবকিছুর ঊর্ধ্বে, মেসির এই স্থিরতা তার অতিপ্রাকৃত ক্রীড়া বুদ্ধিমত্তা বা খেলা বোঝার অসামান্য ক্ষমতার পরিচয় বহন করে।
এই অনন্য গুণ তাকে মাঠের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি শান্তভাবে বুঝতে ও আক্রমণের জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।
কীভাবে মেসি শুরুর ১০ মিনিট হেঁটে বেড়ানোর কাজে ব্যবহার করেন, যা তার সামনে চলতে থাকা ম্যাচের একটি মানসিক চিত্র তৈরি করতে সাহায্য করে, এ নিয়ে গার্দিওলা মূল্যায়ন করেছেন।
তবুও মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-২ গোলের জয়ে মেসি দেখিয়েছেন, তিনি ম্যাচজুড়েই ক্রমাগত সেই মানসিক মানচিত্রটি বারবার সাজাতে থাকেন।
খেলার বাকি আর ১৫ মিনিট, দেশ দুই গোলে পিছিয়ে, এমন সময়ে মেসি তার স্বভাবসুলভ বিচ্ছিন্ন কিন্তু সুবিধাজনক অবস্থান থেকে মিসরের রক্ষণভাগ ভেদ করার এক নতুন পথের ছক কষেন, যা তার খেলোয়াড়ি জীবনের শুরুর দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
যেকোনো সাধারণ দর্শকের কাছে, মেসির এই হাঁটাচলা প্রান্তিক পর্যায়ের একজন আগ্রহহীন খেলোয়াড়ের উদাসীনতা বলে মনে হতে পারে।
তবে তিনি ঠিক এটাই চান, যে বাকি তা-ই ভাবুক। কারণ তার নিষ্ক্রিয়তার সেই দীর্ঘ সময়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আগের মতোই এক প্রখর ক্ষিপ্র মস্তিষ্ক, যা যেকোনো মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত।