সর্বশেষ ফ্রান্স-মরক্কো মুখোমুখি হয়েছিল ২০২২ বিশ্বকাপে। ছবি: আল জাজিরা
বিশ্বকাপ ফুটবল শেষের দিকে যত এগোয়, ফুটবল তখন আর শুধু একটি খেলা থাকে না। প্রতিটি ম্যাচ তখন হয়ে ওঠে স্বপ্ন আর বেদনার সীমারেখা। ম্যাচের শেষ বাঁশি কারও উৎসবের সূচনা করে, সেই বাঁশি আবার চিরতরে ভেঙে দেয় কারও অপেক্ষার প্রহর। আজ রাতের প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালও তেমনই এক গল্পের নাম। এক পাশে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, অন্য পাশে আফ্রিকার অদম্য প্রতিনিধি মরক্কো। একদল এসেছে মুকুট উদ্ধার অভিযানে, অন্য দল এসেছে ইতিহাসের বুকের ভাঁজে নতুন অধ্যায় লিখতে। বোস্টনে বাংলাদেশে সময় রাত দুটায় শুরু হবে সেই লড়াই।
টুর্নামেন্টে ফ্রান্সের পথচলা ছিল প্রায় নিখুঁত। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে নকআউট সবখানেই দিদিয়ের দেশমের দল আত্মবিশ্বাসী, পরিণত এবং ভয়ংকর। শেষ ষোলোতে প্যারাগুয়েকে হারিয়ে শেষ আটে ওঠা ফরাসিরা যেন এখনও তাদের সেরাটা জমিয়ে রেখেছে আরও বড় মঞ্চের জন্য। আক্রমণভাগে কিলিয়ান এমবাপের বিস্ফোরক গতি, উসমান দেম্বেলের সৃজনশীলতা, মাইকেল অলিসের কৌশলী ফুটবল এবং ব্র্যাডলি বারকোলার ক্ষিপ্রতা প্রতিপক্ষের রক্ষণে অবিরাম অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
তবে ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই শুধু তারকারা সব গল্প লেখেন না। অনেক সময় ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টে দেন সেই দলগুলো, যাদের শুরুতে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। মরক্কো সেই দলের নাম। আটলাস পর্বতের মতো দৃঢ় তাদের রক্ষণ, মরুভূমির বাতাসের মতো দ্রুত তাদের পাল্টা আক্রমণ। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের বিপক্ষে অপরাজিত ছিল দলটি। তারপর টানা দুই জয়ে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে নিজেদের শক্তির জানান দেয় আফ্রিকার দেশটি। শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে শিরোপা প্রত্যাশী নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে নিজেদের উপস্থিতি ভালোভাবে জানান দেয় তারা। পরে কানাডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা মরক্কো প্রমাণ করেছে, তারা আর কেবল চমকের দল নয় তারা শিরোপার স্বপ্নও দেখতে জানে।
মরক্কোর প্রাণভোমরা আশরাফ হাকিমি। রক্ষণে যেমন নির্ভরতার প্রতীক, আক্রমণে উঠেও তেমনি ভয়ংকর। মাঝমাঠে ব্রাহিম দিয়াজের সৃজনশীলতা আর আজেদিন উনাহির ছন্দ ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে। তবে মরক্কো শিবিরে কিছুটা দুশ্চিন্তার নাম ইসমাইল সাইবারি। হ্যামস্ট্রিং চোটের কারণে তার খেলা অনিশ্চিত। একই সঙ্গে ডিফেন্ডার শাদি রিয়াদের ফিটনেস নিয়েও সংশয় রয়েছে।
অন্যদিকে ফ্রান্সও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নয়। মিডফিল্ডের অন্যতম ভরসা অরেলিয়েন চুয়ামেনির খেলা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। যদিও ফরাসি শিবিরের স্কোয়াডের গভীরতা এমন যে, একজনের অনুপস্থিতি অন্যজনের সুযোগ হয়ে ওঠে।
এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে পারে এমবাপে বনাম হাকিমির লড়াই। ক্লাব ফুটবলে একসময় একই ড্রেসিংরুম ভাগ করে নেওয়া দুই বন্ধুই এবার দাঁড়াবেন বিপরীত প্রান্তে। একজনের লক্ষ্য গতির ঝড়ে রক্ষণ ভেঙে ফেলা, অন্যজনের দায়িত্ব সেই ঝড়কে থামিয়ে দেওয়া।
মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাসে পরিষ্কার ব্যবধানে এগিয়ে ফ্রান্স। এ পর্যন্ত ছয়বার মুখোমুখি হয়েছে তারা। চারবার জয় ফ্রান্সের। সর্বশেষ তারা মুখোমুখি হয়েছিল ২০২২ বিশ্বকাপে। আসরের সেমিফাইনালের লড়াইয়ে সেদিনও জিতেছিল ফ্রান্স। ২-০ গোলের জয়ের টাটকা স্মৃতি। চার বছর পর নতুন মঞ্চে সেই স্মৃতিরই পুনর্জন্ম। তবে এবারের মরক্কো আরও পরিণত, আরও আত্মবিশ্বাসী। আর ফ্রান্সও জানে, এই প্রতিপক্ষকে এক মুহূর্তের জন্যও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
কাগজে-কলমে হয়তো ফ্রান্স এগিয়ে। অভিজ্ঞতা, তারকা এবং নকআউটের সাফল্য তাদের পক্ষেই কথা বলে। কিন্তু বিশ্বকাপ কখনও শুধু পরিসংখ্যানের গল্প নয়। এখানে হৃদয়ের সাহস, বিশ্বাসের শক্তি আর একটি মুহূর্তের জাদুই বদলে দিতে পারে পুরো ইতিহাস।
তাই বোস্টনের রাত শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়; এটি দুই মহাদেশের দুই দর্শনের মুখোমুখি দাঁড়ানো। এক পাশে শিরোপা উদ্ধারের প্রত্যয়, অন্য পাশে অসম্ভবকে সম্ভব করার দুঃসাহস। অবশ্য শেষ বত্রিশে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে ও বিশ্বকাপের শুরুতে ব্রাজিলকে রুখে দিয়ে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রথম ধাপ তারা ভালোভাবে পার হয়েছে। আজ শেষ বাঁশি বাজার আগে কেউ জানে না উল্লাসে ভাসবে নীল জার্সি, নাকি লাল-সবুজ পতাকা উড়বে নতুন ইতিহাসের আকাশে।
আজ ম্যাচে দায়িত্বে থাকা ম্যাচ অফিসিয়ালের সবাই আর্জেন্টিনার। ম্যাচে মূল রেফারির দায়িত্ব পালন করবেন আর্জেন্টিনার ফাকুন্দো তেল্লো। তার সঙ্গে সহকারী রেফারি হিসেবে থাকছেন হুয়ান পাবলো বেলাত্তি ও গ্যাব্রিয়েল চাদে। চতুর্থ অফিসিয়াল হিসেবে দারিও হেরেরা ও রিজার্ভ সহকারী রেফারি হিসেবে থাকবেন ক্রিস্টিয়ান নাভারো।