শামীম হাসান
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬ ১২:৪৪ পিএম
আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬ ১৩:০০ পিএম
লিওনেল মেসি ও নেইমার জুনিয়র।
বিশ্বকাপের মঞ্চ কখনও আনন্দের মহাকাব্য রচনা করে, কখনও আবার বেদনার দীর্ঘ উপাখ্যান তৈরি হয়। এক দলের চোখের জলেই অন্য দলের স্বপ্ন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ২০২৬ বিশ্বকাপও যেন সেই চিরচেনা গল্পই নতুন করে লিখছে। একদিকে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিদায়ের বিষাদ, অন্যদিকে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সামনে আরেকটি কঠিন পরীক্ষার অপেক্ষা। আজ রাত ১০টায় কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আটলান্টায় মিসরের মুখোমুখি মেসিবাহিনী।
নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে শেষ ষোলোর গণ্ডিতেই থেমে গেছে ব্রাজিলের যাত্রা।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে সফল দলটির জন্য এটি কেবল একটি হার নয়, বরং দীর্ঘদিনের অপূর্ণতার আরও একটি অধ্যায়। টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপেও শিরোপার স্বপ্ন পূরণ হলো না সেলেসাওদের। ২০০২ সালের পর থেকে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে বারবার প্রত্যাশার পাহাড় গড়ে তুললেও শেষ হাসি আর হাসতে পারেনি ব্রাজিল।
একসময় বিশ্বকাপ মানেই ছিল ব্রাজিলের জাদু, শিল্প আর শৈল্পিক ফুটবলের উৎসব। কিন্তু সময় বদলেছে। নতুন নতুন শক্তির উত্থানের ভিড়ে ব্রাজিলের সোনালি ঐতিহ্য যেন ক্রমেই স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি হয়ে যাচ্ছে। নরওয়ের বিপক্ষে লড়াইয়েও প্রতিভার ঝলক ছিল, সুযোগও ছিল। কিন্তু প্রতিপক্ষের শৃঙ্খলিত ফুটবল আর দুর্দান্ত মানসিক দৃঢ়তার সামনে শেষ পর্যন্ত মাথা নত করতেই হয়েছে তাদের।
ব্রাজিলের বিদায়ের শোক যখন এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে, তখন ফুটবলপ্রেমীদের দৃষ্টি ঘুরে গেছে আরেক লাতিন পরাশক্তির দিকে। যদিও লাতিনের অন্য দেশ কলম্বিয়া এখনও টিকে রয়েছে, তবে সবার চোখ আর্জেন্টিনার দিকে। দক্ষিণ আমেরিকার স্বপ্নের সারথি এখন আর্জেন্টিনা। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নের প্রতিপক্ষ আফ্রিকার সাহসী প্রতিনিধি মিসর।
ব্রাজিলের আগেই লাতিনের অন্যসব প্রতিনিধি উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে আর ইকুয়েডর বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে। টিকে আছে শুধু কলম্বিয়া ও আর্জেন্টিনা। যদি বিশ্বকাপ থেকে আর্জেন্টিনার বিদায় হয় তাহলে একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে ইউরোপের। তখন বিশ্বকাপটাই হয়ে যাবে ইউরোপের। এরই মধ্যে তিনটি দেশ ফ্রান্স, নরওয়ে ও ইংল্যান্ড ইউরোপের প্রতিনিধিত্ব করতে শেষ আটে পৌঁছে গেছে। স্পেন ও পর্তুগালের খেলা শেষে গত রাতেই যোগ হয়েছে আরও এক দেশ। ইউরোপের আরও দুই দেশ বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ডের যোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শেষ ষোলোর লড়াইয়ের শেষদিনে সুইজারল্যান্ড মুখোমুখি হবে কলম্বিয়ার। এছাড়া বেলজিয়াম খেলছে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে।
আর্জেন্টিনার কাছে এই ম্যাচ কেবল শেষ আটে ওঠার লড়াই নয়; এটি শিরোপা ধরে রাখার অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর একটি। শেষ বত্রিশের রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে জয় পেয়েছিল লিওনেল মেসির দল। সেই ম্যাচ দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কোনো প্রতিপক্ষকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। গ্রুপ পর্বে মেসিরা দুর্দান্ত লড়াই করলেও শেষ বত্রিশে কেপ ভার্দের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর ৩-২ গোলে জয় পায়।
অন্যদিকে মিসরও এসেছে দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে। অস্ট্রেলিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে শেষ ষোলোয় জায়গা করে নেওয়া দলটি জানে, ইতিহাস গড়ার সুযোগ বারবার আসে না। তাই আর্জেন্টিনাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে তারা নিজেদের সেরাটাই উজাড় করে দেবে।
তবে মিসরের জন্য এই চ্যালেঞ্জে উতরানো একটু কঠিন হবে। গ্রুপ পর্বে তাদের খুব একটা পরীক্ষায় পড়তে হয়নি। গ্রুপে অপরাজিত ছিল ঠিকই তারা। তবে জয় মাত্র এক ম্যাচে। শুধু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয় তাদের। অন্য দুই ম্যাচের একটিতে ইরানের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছিল, আর গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া বেলজিয়ামের সঙ্গে একই ব্যবধানে পয়েন্ট ভাগাভাগি। শেষ বত্রিশের লড়াইয়েও নিজেদের শক্তিমত্তার পরিচয় ভালোভাবে তুলে ধরতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র, প্যারাগুয়ে আর তুরস্কের গ্রুপ থেকে রানার্সআপ হয়ে উঠে আসা অস্ট্রেলিয়াকে নির্ধারিত সময়ে হারাতে পারেনি তারা। ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচ গড়িয়েছিল টাইব্রেকারে। সেখানে সাফল্য দেখিয়ে শেষ ষোলোতে স্থান করে নেয়।
অন্যদিকে লাতিনদের স্বপ্ন কাঁধে নিয়ে চলা শেষ বত্রিশের ম্যাচ ছাড়া অন্য সব ম্যাচে ছিল দুর্দান্ত। গ্রুপ পর্বে একের পর এক প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিয়েছে মেসিবাহিনী। তিন ম্যাচের তিনটিতেই জয়। আর তিনি ম্যাচেই মেসি রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়েছেন। লাতিন ফুটবলের তো বটেই বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান একের পর এক ওলটপালট করেছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। একার কাঁধে বয়ে চলেছেন আর্জেন্টিনা তথা লাতিনদের স্বপ্ন।
এই বিশ্বকাপে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল যেন দুই ভিন্ন আবেগের গল্প লিখছে। একদিকে ব্রাজিলের নিভে যাওয়া প্রদীপ, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার হাতে এখনও জ্বলছে আশার মশাল। সাম্বার সুর থেমে গেছে, কিন্তু ট্যাঙ্গোর ছন্দ থামেনি।
ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেইÑ আজ যে দল কান্নায় ভেঙে পড়ে, কাল সেই দলই আবার নতুন স্বপ্ন দেখে। আর যে দল আজ স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে, তার সামনে অপেক্ষা করে আরও কঠিন পরীক্ষা। আর তাই ব্রাজিলের বিদায়ের পর সামনে এসেছে বিশ্বকাপ আবারও কি লিখবে নতুন কোনো বিস্ময়ের গল্প।