জুড বেলিংহ্যাম। ছবি: ইএসপিএন
আজতেকা স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি বাজতেই ইংল্যান্ডের সমর্থকদের বাধভাঙ্গা আনন্দের শুরু। গ্যালারিজুড়ে তখন লাল-সাদা জার্সির উল্লাস, আর মাঠে ক্লান্ত শরীর নিয়েও একে অপরকে জড়িয়ে ধরছিলেন ফুটবলাররা। কঠিন এক লড়াই জিতে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার আনন্দে কেউ হারিয়েছেন কণ্ঠস্বর, কেউ আবার খুঁজে পাচ্ছিলেন না নিজের অনুভূতি প্রকাশের ভাষা।
মেক্সিকোকে ৩-২ গোলে হারিয়ে ইংল্যান্ডের এই স্মরণীয় জয়ের নায়ক দুজন-জুড বেলিংহ্যাম ও অধিনায়ক হ্যারি কেন। প্রথমার্ধে মাত্র ৯৮ সেকেন্ডের ব্যবধানে জোড়া গোল করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন বেলিংহ্যাম। পরে দ্বিতীয়ার্ধে পেনাল্টি থেকে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করেন কেন।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে ভাঙ্গা কণ্ঠস্বর নিয়ে হাজির হন ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেন। উচ্ছ্বাস, চিৎকার আর সতীর্থদের সঙ্গে গান গাইতে গাইতে তাঁর গলা বসে গেছে।
সাক্ষাতকারে কেন বলেন, “আমার গলা দিয়ে আর আওয়াজ বের হচ্ছে না। মাঠে যেন পুরো পাগলামো হয়েছে। আমাদের প্রতিটি মুহূর্তে লড়তে হয়েছে, নিজেদের পথ নিজেরাই তৈরি করতে হয়েছে। ম্যাচের পর এতক্ষণ গান গেয়েছি যে এখন আর কথা বলাই কঠিন”।
পরে আরেক সাক্ষাৎকারে ক্লান্তির চিত্র আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক। তিনি বলেন, ‘আমি যেন ভাষাই হারিয়ে ফেলেছি। ঠিকমতো কথা বলতে পারছি না। শরীরে আর একটুও শক্তি নেই। আমি ভীষণ ক্লান্ত।
একই রকম আবেগ ধরা পড়ে ম্যাচসেরা বেলিংহ্যামের কণ্ঠেও। ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে তিনি বড় করে দেখেছেন দলীয় ঐক্য আর সংগ্রামকে। বেলিংহ্যাম বলেন, “আমি ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। এই জয় শুধু আমার নয়, পুরো দলের। আমরা যেভাবে রক্ষণ সামলেছি, কঠিন মুহূর্তে গোল করেছি এবং শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত একসঙ্গে লড়েছি-এটাই একটি সত্যিকারের দলের পরিচয়”।
ইংল্যান্ডের জন্য এই জয় সহজ ছিল না। বিশ্বকাপ ইতিহাসে আজতেকা স্টেডিয়ামে এর আগে কখনও হারেনি মেক্সিকো। স্বাগতিকদের উচ্ছ্বসিত সমর্থন আর পরিচিত পরিবেশে শুরু থেকেই ইংল্যান্ডকে চাপে রাখার চেষ্টা করেন মেক্সিকানরা।
বিশেষ করে হ্যারি কেনকে ঘিরে রেখেছিলেন মেক্সিকোর ডিফেন্ডারেরা। ফলে আক্রমণের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন বেলিংহ্যাম। প্রথমার্ধেই দুর্দান্ত দুটি গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন তিনি। যদিও বিরতির আগে একটি গোল শোধ করে ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দেয় মেক্সিকো। দ্বিতীয়ার্ধে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে ইংল্যান্ডের জন্য। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পরও আত্মসমর্পণ করেনি তারা। বরং চাপের মধ্যেই পেনাল্টি থেকে গোল করে ব্যবধান বাড়ান কেন। পরে মেক্সিকোও স্পট কিক থেকে আরেকটি গোল শোধ করলেও শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের দৃঢ় প্রতিরোধ ভাঙতে পারেনি।
রুদ্ধশ্বাস এই ৩-২ জয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের শেষ আটে জায়গা নিশ্চিত করেছে ইংল্যান্ড। কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ নরওয়ে।
আজতেকার অজেয় দুর্গ ভেঙে যে জয় ইংল্যান্ড তুলে নিয়েছে, তার গল্প শুধু স্কোরলাইনে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এক দলের অদম্য মানসিকতার গল্প, ক্লান্ত শরীরের ভেতর লুকিয়ে থাকা অপরাজেয় ইচ্ছাশক্তির গল্প। তাই হয়তো জয়ের পর হ্যারি কেনের কণ্ঠে শব্দ ছিল না, আর জুড বেলিংহ্যামের কাছে ছিল না অনুভূতি প্রকাশের ভাষা। কখনও কখনও ফুটবল এমনই- যেখানে ইতিহাস লেখা হয় গোলে, আর সেই ইতিহাসের গভীরতা বোঝা যায় নীরবতার মধ্যেই।