বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা সেই চিরচেনা ফুটবল-দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত এক বাস্তবতার নাম। তাদের ক্ষেত্রে প্রথম গোল যেন আশীর্বাদের চেয়ে বেশি হয়ে উঠছে অস্বস্তির সূচনা। ছবি: সংগৃহীত
ফুটবলে বহুল প্রচলিত একটি কথা আছেÑ ‘প্রথম গোলই ম্যাচের দরজা খুলে দেয়’। যে দল আগে গোল করে, তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে, খেলার নিয়ন্ত্রণও চলে আসে তাদের হাতে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা সেই চিরচেনা ফুটবল-দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত এক বাস্তবতার নাম। তাদের ক্ষেত্রে প্রথম গোল যেন আশীর্বাদের চেয়ে বেশি হয়ে উঠছে অস্বস্তির সূচনা।
প্রতিপক্ষের জালে বল জড়ানোর পর উল্লাসে ভেসে ওঠে আলবিসেলেস্তে শিবির। কিন্তু সেই আনন্দ খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। অদৃশ্য এক আত্মতুষ্টি কিংবা অকারণ চাপ ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাত থেকে কেড়ে নেয়। প্রতিপক্ষ ফিরে আসে নতুন উদ্যমে, আর আর্জেন্টিনা পড়ে যায় অস্বস্তিকর এক লড়াইয়ে।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে এবারের বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের ম্যাচটি যেন সেই পুরনো রোগেরই নতুন উপসর্গ। ৩-২ গোলের জয় নিশ্চিত করলেও ম্যাচজুড়ে দেখা গেছে, এগিয়ে যাওয়ার পরও স্বস্তিতে থাকতে পারেনি আর্জেন্টিনা। বরং কেপ ভার্দে সাহস সঞ্চয় করে বারবার চেপে ধরেছে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত অনিশ্চয়তা তাড়া করেছে লিওনেল স্কালোনির দলকে।
আসলে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এই দুর্বলতার শিকড় ছিল ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও। প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। মনে হয়েছিল, সহজ জয়ই অপেক্ষা করছে। কিন্তু বিরতির পর মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল হজম করে ২-১ ব্যবধানে হেরে বসে আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনের জন্ম হয়েছিল সেদিন।
এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৭৩ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। সেমিফাইনালের স্বপ্ন প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু শেষদিকে পরপর দুই গোল করে সমতা ফেরায় নেদারল্যান্ডস। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারের নাটক পেরিয়েই সেমিফাইনালে উঠতে হয়েছিল মেসিদের।
সবচেয়ে বড় নাটকটি অপেক্ষা করছিল ফাইনালে। ফ্রান্সের বিপক্ষে ৮০ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ ট্রফিতে তখন যেন হাত রেখেই ফেলেছিল তারা। কিন্তু কয়েক মিনিটের ব্যবধানে জোড়া গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান কিলিয়ান এমবাপে। অতিরিক্ত সময়ে আবার এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা, আবারও সমতা ফেরায় ফ্রান্স। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারের উত্তেজনা পেরিয়ে তবেই তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে মাতে আলবিসেলেস্তেরা।
মনে হতে পারে, এটি কেবল মেসির আর্জেন্টিনার সমস্যা। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। সময়কে আরও পেছনে নিয়ে গেলে দেখা যায়, দিয়াগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনাও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিল। ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। মনে হচ্ছিল শিরোপা নিশ্চিত। কিন্তু মাত্র সাত মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল করে সমতায় ফেরে জার্মানি। শেষ পর্যন্ত ৮৪ মিনিটে জর্জ বুরাচাগার অবিস্মরণীয় গোলে রক্ষা পায় আর্জেন্টিনা এবং দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।ক
ফুটবলে প্রথম গোল সাধারণত জয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়। অথচ আর্জেন্টিনার গল্প যেন অন্যরকম। তাদের জন্য প্রথম গোল অনেক সময় জয়ের নিশ্চয়তা নয়, বরং নতুন এক উৎকণ্ঠার সূচনা। আর সেই উৎকণ্ঠা যত দিন না কাটছে, তত দিন প্রতিটি লিডই আলবিসেলেস্তেদের জন্য আনন্দের পাশাপাশি অজানা আশঙ্কায় বন্দি হিসেবে আরেকটি নাম হয়ে থাকবে।