পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া দ্বৈরথ
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদরিচ দ্বৈরথ আরেকবার দেখতে যাচ্ছে ফুটবলপ্রেমীরা। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপের মঞ্চে নকআউট মানেই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ানো। এখানে ভুলের দ্বিতীয় সুযোগ নেই, সংশোধনের সময় নেই, ফিরে আসার নিশ্চয়তাও নেই। একটি ভুল পাস, একটি দুর্বল ক্লিয়ারেন্স কিংবা এক মুহূর্তের অসাবধানতা আর তাতেই শেষ হয়ে যেতে পারে চার বছর ধরে লালন করা স্বপ্ন।
সেই নির্মম পরীক্ষার মুখোমুখি এবার পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া। শুক্রবার ভোরে টরেন্টোর বিএমও স্টেডিয়ামে আলো ঝলমলে পরিবেশে শুরু হবে শেষ বত্রিশের বহুল প্রতীক্ষিত এই মহারণ।
এটি শুধু একটি ম্যাচ নয়। এটি দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের সংঘর্ষÑ একদিকে পর্তুগালের সৃজনশীল, ধারালো আক্রমণভাগ; অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার শৃঙ্খলাবদ্ধ, সংগঠিত ও অভিজ্ঞ ফুটবল।
পর্তুগাল এবারের বিশ্বকাপে এখনও নিজেদের সেরা রূপ দেখাতে পারেনি। গ্রুপ ‘কে’-তে রানার্সআপ হয়ে নকআউটে উঠেছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দল। শুরুটা ছিল হতাশাজনক। কঙ্গোর সঙ্গে ১-১ ড্র অনেক প্রশ্ন তুলে দেয়। তবে দ্বিতীয় ম্যাচেই জবাব দেয় রবার্তো মার্টিনেজের শিষ্যরা। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৫-০ গোলের বিধ্বংসী জয় যেন তাদের আসল সামর্থ্যের ঝলক দেখায়। সেই ম্যাচে জোড়া গোল করেন রোনালদো। শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র অবশ্য আবারও মনে করিয়ে দিয়েছেÑ পর্তুগালের আক্রমণে এখনও ঠিকমতো ছন্দে ফেরেনি।
রানার্সআপ হওয়ায় নকআউট পথও কঠিন হয়েছে। ক্রোয়েশিয়াকে পেরোলেও সামনে অপেক্ষা করতে পারে স্পেন। ফলে প্রথম নকআউট থেকেই তাদের খেলতে হবে ফাইনালের মানসিকতা নিয়ে।
পর্তুগালের জন্য ইতিহাস কিছুটা আশাব্যঞ্জক। ২০১৬ সালের ইউরোর নকআউটে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়েই শিরোপা অভিযানের ভিত গড়েছিল তারা। সেই স্মৃতি এখনও পর্তুগিজ সমর্থকদের আত্মবিশ্বাস জোগায়। সাম্প্রতিক সময়ে আট ম্যাচেও অপরাজিত পর্তুগালÑ পাঁচ জয়, তিন ড্র। আরও গুরুত্বপূর্ণ, এই সময়ে তারা মাত্র চার গোল হজম করেছে।
ক্রোয়েশিয়াকে এখন আর আন্ডারডগ বলা যায় না। গত দুই বিশ্বকাপে তাদের পারফরম্যান্সই যথেষ্ট প্রমাণ। ২০১৮ সালে রানার্সআপ। ২০২২ সালে তৃতীয়।এমন ধারাবাহিকতা কাকতালীয় নয়। তবে এবারের যাত্রা শুরু হয়েছিল বাজেভাবে। প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ৪-২ গোলের হার দলটিকে চাপে ফেলে। কিন্তু এখানেই ক্রোয়েশিয়ার চরিত্র প্রকাশ পায়। তারা ঘুরে দাঁড়ায়। পানামাকে ১-০ এবং ঘানাকে ২-১ গোলে হারিয়ে নিশ্চিত করে নকআউট।
দুই দলের সাম্প্রতিক মুখোমুখি পরিসংখ্যান পর্তুগালের পক্ষেই। শেষ ১০ দেখায় সাতবার জিতেছে পর্তুগাল। শেষ ছয় প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের পাঁচটিতেও জয় তাদের। এই পরিসংখ্যান অবশ্য নকআউটে নিশ্চয়তা দেয় না, তবে আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
এই ম্যাচের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায় নিঃসন্দেহে দুই কিংবদন্তির দ্বৈরথ। একদিকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, বিশ্বকাপ ইতিহাসে টানা ছয় আসরে গোল করা প্রথম খেলোয়াড়। বয়স তার গতি কমিয়ে দিতে পারে, কিন্তু গোলের ক্ষুধা কমাতে পারেনি। অন্যদিকে লুকা মদরিচ। মধ্যমাঠের স্থপতি, যিনি এখনও বল পায়ে সময়কে নিয়ন্ত্রণ করেন। রোনালদো ম্যাচ শেষ করতে পারেন। মদরিচ ম্যাচের গতি লিখে দিতে পারেন।
পর্তুগালের কোচ রবার্তো মার্টিনেজ বলেন, পর্তুগাল এখনও নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারেনি। তবে তার বিশ্বাস, দল ধীরে ধীরে উন্নতি করছে।
রোনালদোর কণ্ঠেও সতর্কতা স্পষ্ট। তার মতে, ক্রোয়েশিয়া বড় মঞ্চে নিজেদের বারবার প্রমাণ করেছে। তবে দল হিসেবে খেলতে পারলে পর্তুগাল যেকোনো বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম।
অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া কোচ জ্লাতকো দালিচ বলেন, রোনালদোকে সামলানো মানে শুধু একজন খেলোয়াড়কে নয়, এক মানসিক চাপকেও সামলানো। মদরিচও আত্মবিশ্বাসী। তার বার্তা পরিষ্কারÑ ক্রোয়েশিয়া বড় ম্যাচ খেলতে জানে।