জর্ডানের বিপক্ষে গোল করে উদযাপন করেন লিওনেল মেসি। ছবি: ফক্স স্পোর্টস
ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষ হয়েছে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মতোই আর্জেন্টিনা শেষ করেছে গ্রুপ পর্ব। রবিবার জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে জে গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা। অবশ্য এই ম্যাচের আগেই শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছিল লিওনেল স্কালোনির দল। তবে শেষ ম্যাচেও তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে তারা কতটা প্রস্তুত। আর সেই জয়ের রাতে আলো ছড়ালেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
বদলি হিসেবে মাঠে নেমেই দুর্দান্ত এক সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে গোল করে আরও একবার নিজের নাম লেখালেন বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে। এক গোলেই গড়েছেন চার-চারটি রেকর্ড। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে বিশ্বকাপের ইতিহাসে টানা ৭ ম্যাচে গোল করার বিশ্বরেকর্ড গড়া। আর মেসির এই কীর্তিকে সামাজিক মাধ্যমে আর্জেন্টিনার ভক্ত-সমর্থক-অনুরাগীরা অভিহিত করছেন ‘স্বপ্তম স্বর্গে মেসি’ হিসেবে।
১ গোলেই ৪ রেকর্ড
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে যখন বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মেসি মাঠে নামেন, তখন পুরো স্টেডিয়ামে (টেক্সাসের এটি অ্যান্ড টি স্টেডিয়াম) করতালির রোল পড়ে। আর মাঠে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই বক্সের বাইরে থেকে এক দর্শনীয় ও নিখুঁত ফ্রি-কিক থেকে গোল করে তিনি একই সঙ্গে ৪টি অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড নিজের নামে করে নেন। এগুলোর দুটি একক এবং দুটি যৌথ রেকর্ড। সেগুলো হলোÑ ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম এবং একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে টানা ৭ ম্যাচে গোল করা, বিশ্বকাপে বক্সের বাইরে থেকে সর্বোচ্চ ৬টি গোল করা, বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ব্যক্তিগত ৬টি গোল করার রেকর্ডে ভাগ বসানো এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসে দুটি সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে গোল করা ষষ্ঠ খেলোয়াড়।
আর্জেন্টিনার আরও কিছু রেকর্ড ও মাইলফলক
মেসির এই অতিমানবীয় রেকর্ডের রাতে আর্জেন্টিনা দলগতভাবেও বেশ কিছু মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এই জয়ের মাধ্যমে ২০২২ বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে বিশ্বমঞ্চে টানা ৯ ম্যাচে অপরাজিত থাকার দুর্দান্ত ধারা বজায় রাখল আলবিসেলেস্তেরা। গত ৬০ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে চতুর্থ দল হিসেবে একটি একক ম্যাচে একাধিক সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে গোল করার গৌরব অর্জন করল আর্জেন্টিনা। এ ছাড়া ফুটবল ইতিহাসে পঞ্চমবারের মতো ফিফা বিশ্বকাপের শুরুর টানা তিনটি ম্যাচেই জয়লাভ করার অনন্য কীর্তি গড়ল তারা। এই ম্যাচে লাউতারো মার্তিনেজ আর্জেন্টিনার হয়ে তার প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি পূর্ণ করেন এবং লিওনার্দো পারেদেস মধ্যমাঠে একাই ১৫৪টি নিখুঁত পাস দিয়ে গত ৬০ বছরে কোনো আর্জেন্টাইন হিসেবে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ পাসের রেকর্ড গড়েন।
শেষ ৩২-এ প্রতিপক্ষ কে?
আগামী ৩ জুলাই শেষ ৩২-এ আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ আফ্রিকান ও নবাগত দেশ কেপ ভার্দে। দেশটির জনসংখ্যা মাত্র ৬ লাখের কাছাকাছি, যা বিশ্বকাপে খেলা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম কম। গত এক দশকে কেপ ভার্দে আফ্রিকার অন্যতম দ্রুত উন্নতি করা দল। তারা একাধিকবার আফ্রিকা নেশনস কাপের মূল পর্বে খেলেছে এবং শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে চমক দেখিয়েছে। দলটির বড় শক্তি শারীরিক সামর্থ্য, দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ। ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলা ফুটবলারদের নিয়ে গড়া তাদের স্কোয়াড বেশ অভিজ্ঞ।
মেসি ও আর্জেন্টিনা বন্দনা
মেসি কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি ফুটবলের এক জীবন্ত কবিতা। ৩৯ বছর বয়সে এসেও বেঞ্চ থেকে মাঠে নেমে যেভাবে তিনি ফ্রি-কিকের জাদুতে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বোকা বানান, তা প্রমাণ করে তার পায়ের জাদু চিরন্তন ও অমর। তিনি মাঠে থাকা মানেই গ্যালারিতে কোটি ভক্তের হৃদস্পন্দন সচল থাকা, তিনি মাঠে থাকা মানেই ফুটবলের সৌন্দর্য পূর্ণতা পাওয়া। মেসির বয়স দেখে বোঝার উপায় নেই যে, তিনি ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে। বল পায়ে তার জাদু, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত পাস কিংবা ফ্রি-কিকÑ সবকিছুই যেন আগের মতোই মুগ্ধতা ছড়ায়। মনে হয়, সময়কে হার মানানোর আরেক নাম মেসি।
আর এই আর্জেন্টিনা দল এখন এক অপরাজেয় শক্তি। স্কালোনির অধীনে আলবিসেলেস্তেরা কেবল আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছে না, তারা মাঠে দেখাচ্ছে এক ইস্পাতকঠিন দলগত সংহতি ও কৌশলগত পরিপক্বতা। লাউতারোর ক্ষিপ্রতা, পারেদেসের নিখুঁত পাসিং আর মেসির জাদুকরী নেতৃত্বের মেলবন্ধনে আর্জেন্টিনা এখন আরও একবার বিশ্বজয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। নীল-সাদা জার্সির এই মহাগর্জন ফুটবল বিশ্বকে মনে করিয়ে দিচ্ছেÑ বিশ্বকাপের আসল রাজা এখনও তারাই।
এখন অপেক্ষা শেষ ৩২-এর। যে দলই সামনে আসুক না কেন, বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় আর্জেন্টিনাকে হারানো যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে।
২০২২ সালে বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন মেসি। অনেকেই ভেবেছিলেন, সেটিই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। কিন্তু তিনি ফিরেছেন, আর ফিরেই ইতিহাসের পর ইতিহাস লিখে চলেছেন। প্রতিটি ম্যাচে যেন তিনি নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছেনÑ কিংবদন্তিরা কখনও ফুরিয়ে যান না।
আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন; তিনি কোটি মানুষের আবেগ, বিশ্বাস ও স্বপ্নের প্রতীক। আর এই আর্জেন্টিনা শুধু একটি দল নয়; এটি লড়াই, ঐতিহ্য, শিল্প আর জয়ের আরেক নাম। বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের পথচলা যত এগোচ্ছে, ততই জোরালো হচ্ছে একটি প্রশ্নÑ আরেকবার কি সোনালি ট্রফি উঠবে মেসির হাতেই? ফুটবলপ্রেমীরা সেই উত্তর জানার অপেক্ষায়।