নাজমুল হক তপন
প্রকাশ : ৯ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৯ ঘণ্টা আগে
লিওনেল মেসি। ছবি: মিন্ট
‘বিধাতা এই চোখ দুটি যেমন তুমিই দিয়াছিলে, আজ তুমিই তাহা সার্থক করিলে’, সমুদ্রে সাইক্লোনের ভয়াল অথচ অপার সৌন্দর্যের রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে কথাগুলো বলেছিলেন বাংলা সাহিত্যের ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। চলতি বিশ্বকাপে ফুটবল নন্দন লিওনেল মেসির জাদুকরী খেলা দেখলে বোধ করি বিস্ময়ের ঘরে এমন কিছুই লিখতেন ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ সময় সকালে সৌধের পর সৌধ গড়েছেন মেসি।
বিশ্বকাপ ইতিহাসকে দিয়েছেন দুমড়ে-মুচড়ে। আর তাতে চ্যাম্পিয়নের মতোই শুরু করেছে মেসির আর্জেন্টিনা। মেসির হ্যাটট্রিকে ‘জি’ গ্রুপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে গতবারের চ্যাম্পিয়নরা।
গতকাল আলজেরিয়ার বিপক্ষে কী করেছেন
না বলে বলা উচিত কী করেননি মেসি! বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা মিরোস্লাভ
ক্লোসার সমতলে উঠে এসেছেন এই ফুটবল শিল্পী। জার্মান গোল মেশিন ক্লোসার মতোই বিশ্বকাপে
তার গোল সংখ্যা এখন ১৬। আর এক গোল করলেই এককভাবে ইতিহাসের চূড়ায় উঠবেন মেসি। চলতি বিশ্বকাপের
প্রথম হ্যাটট্রিকটির মালিকানাও এখন তার।
ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ৬টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার গৌরবও এখন মেসির ঝুলিতে। পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করে পর্তুগিজ সেনসেশন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর উচ্চতায় উঠে এলেন এই আর্জেন্টাইন জাদুকর। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পূরণ করলেন ম্যাচের ‘ডাবল সেঞ্চুরি’। এ ছাড়া বিশ্বকাপের ইতিহাসে বয়স্ক হ্যাটট্রিকম্যান হওয়ার কৃতিত্বও দেখিয়েছেন তিনি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করার সময় মেসির বয়স ছিল ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন।
গতকাল ক্যানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে
ম্যাচের ডেডলক ভাঙতে মেসি সময় নেন মোটে ১৭ মিনিট। ৬০তম মিনিটে করেন দ্বিতীয় গোল। ৭৬
মিনিটে পূর্ণ করেন হ্যাটট্রিক।
খেলার ১৭ মিনিট থেকে শুরু হয় মেসিজাদু। এ সময় সতীর্থ রদ্রিগো দি পল মাঝ মাঠ থেকে বল বাড়ান মেসির দিকে। দ্রুত একটু এগিয়ে এসে বক্সের বাইরে থেকে দুই ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে বুলেট শট নেন মেসি। জিনেদিন জিদানপুত্র লুকা জিদান চেষ্টা করেও বলের নাগাল পাননি। ম্যাচের এক ঘণ্টার মাথায় আলরিয়ার জালে দ্বিতীয়বার বল জড়িয়ে দেন মেসি। একটা সংঘবদ্ধ আক্রমণ থেকে বক্সের মধ্যে ফাঁকায় বল পেয়ে যান। আলতো ছোঁয়ায় বল জালে ঠেলে দেন। মেসির সামনে বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিকের হাতছানি। টানটান উত্তেজনায় জেগে ওঠে গ্যালারি। ভক্তদের নিরাশ করেননি মেসি। বক্সের ঠিক ওপর থেকে তীব্র গড়ানো শটে জন্ম দেন আরেকটি সোনালি মুহূর্তের। ৭৯তম মিনিটে তাকে তুলে নেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। গোটা গ্যালারি উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায় তাকে। মেসিবিহীন ম্যাচের বাকি সময়টুকু পরিণত হয় নিছকই আনুষ্ঠানিকতায়।
ম্যাচে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দশে
১০ পান মেসি। তার কাছাকাছি ছিলেন দি পল। দেশে ৮ পান দি পল। এখান থেকেই সুস্পষ্ট ম্যাচটা
কতটা মেসিময় ছিল।
ম্যাচ শেষে মেসিকে সর্বকালের সেরা
বলে উল্লেখ করেছেন আলজেরিয়ান ডিফেন্ডার আইস্যা মান্দি। বলেছেন ‘মেসি এমন একজন খেলোয়াড়,
সম্ভবত সর্বকালের সেরা। আমরা তাকে যতটা সম্ভব থামিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু
সেটা কাজে আসেনি।’
এদিকে ম্যাচ শেষে মেসির প্রতি মুগ্ধতায়
অনেকটাই যেন বাকরুদ্ধ আর্জেন্টাইন কোচ স্কালোনি। তার ভাষায়, ‘আমি বাকরুদ্ধ। কীভাবে
ভাষায় প্রকাশ করব বুঝতে পারছি না। মেসি অবিশ্বাস্য।’
এত এত রেকর্ড আর অর্জনের পরও বিনয়
প্রকাশ করতে এতটুকু কার্পণ্য করেননি মেসিÑ ‘ক্লোসার পাশে এই জায়গায় থাকতে পারা গৌরবের।
সর্বকালের অন্যতম সেরা রোনালদোও আছেন কাছেই। আছেন এমবাপেও। তবে দিনশেষে, এসব শুধুই
পরিসংখ্যান, এর বেশি মূল্য নেই।’
ম্যাচ শেষে সতীর্থদের প্রশংসা করে
মেসি বলেন, ‘আমাদের দলটি গোছানো ও শক্তিশালী। আমার নিজেরও বেশ ভালো লাগছে। টুর্নামেন্টের
প্রথম ম্যাচে জয় দিয়ে শুরু করাটা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ।’ গ্যালারি মাতানো আর্জেন্টাইন
সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আমি ভক্তদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ তারা আবারও প্রমাণ
করেছেন যে আর্জেন্টিনা ফুটবলকে কতটা ভালোবাসেন।’
আলজেরিয়াকে হারিয়ে শুভসূচনার পর আগামী
সোমবার গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রিয়ার মুখোমুখি হবে মেসির দল। এই ম্যাচ জিতলেই
নকআউট পর্ব নিশ্চিত হয়ে যাবে গতবারের চ্যাম্পিয়নদের।