ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ছবি: সংগৃহীত
আজ ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে এক নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ববাসী। ‘কে’ গ্রুপের প্রথম ম্যাচে আফ্রিকার দেশ কঙ্গোর মুখোমুখি হচ্ছে পর্তুগাল। খাতা-কলমে ম্যাচটি পর্তুগালের জন্য গ্রুপ পর্বের সাধারণ এক ম্যাচ মনে হলেও, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্য এটি অনন্য এক রেকর্ডের ডালি সাজিয়ে বসে আছে।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২২৬ ম্যাচে
১৪৩ গোল করা এই গোলমেশিনের তালিকায় নেই কঙ্গোর নাম। কারণটাও বেশ চমৎকার; ফুটবল ইতিহাসে
এর আগে কখনোই কঙ্গোর মুখোমুখি হয়নি পর্তুগাল! স্বভাবতই ১০০০ গোলের নেশায় মজে থাকা পর্তুগিজ
অধিনায়কের সামনে আজ সুযোগ থাকছে নিজের ‘শিকার’ করা দেশের তালিকায় নতুন একটি প্রতিপক্ষের
নাম তোলার।
তবে কঙ্গোর বিরুদ্ধে কেবল
নতুন গোল করার সুযোগই নয়, মাঠে নামার সাথে সাথেই রোনালদো ছুঁয়ে ফেলবেন তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী
লিওনেল মেসির এক অনন্য কীর্তি। আজ মাঠে নামার মধ্য দিয়ে ফুটবল ইতিহাসের দ্বিতীয় খেলোয়াড়
হিসেবে টানা ও সর্বোচ্চ ৬টি ফিফা বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড গড়বেন সিআর সেভেন। এখানেই শেষ
নয়, কঙ্গোর জালে বল পাঠাতে পারলেই ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে টানা ৬টি পৃথক বিশ্বকাপে
গোল করার অবিশ্বাস্য ও প্রায় অসম্ভব এক কীর্তি নিজের করে নেবেন তিনি।
চলমান এই বিশ্বকাপে পর্তুগালকে
নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা। ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসেও তার ফিটনেস
ও গোলের ক্ষুধা তরুণদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ‘হুওপ’ ডেটা অনুসারে বিদায়ী মৌসুমে ৯৮%
ম্যাচ রেডিনেস নিয়ে খেলা রোনালদো নিশ্চিতভাবেই চাইবেন কঙ্গো ম্যাচ দিয়েই নিজের বিশ্বকাপ
গোলের খাতা খুলতে এবং ১০০০ গোলের মাইলফলকের দিকে আরও একধাপ এগিয়ে যেতে।
তবে মাঠের এই ব্যক্তিগত রেকর্ড
বা পরিসংখ্যানের চেয়ে রোনালদোর কাছে এখন দলের সাফল্যই মুখ্য। নিজের বর্ণিল ক্যারিয়ারে
ইউরো কাপসহ ক্লাব ফুটবলের সম্ভাব্য সব ট্রফি জিতলেও, বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা এখনও
রোনালদোর অধরাই রয়ে গেছে। তাই ফুটবলপ্রেমী ও বিশ্লেষকদের মতে, নিজে কোনো গোল না পেয়ে
কিংবা আসরজুড়ে গোলহীন থেকেও যদি পর্তুগালকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে পারেন, তবে রোনালদোর
মনে হয়তো আর কোনো আক্ষেপ বা অভিযোগ থাকবে না। আজ কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে কি শুরু
হবে রোনালদোর সেই অধরা স্বপ্নপূরণের মহাকাব্য? উত্তর দেবে সময়।
২০২২ সালে ফুটবল বিশ্ব দেখেছিল
লিওনেল মেসির সেই রূপকথার বিশ্বকাপ জয়। এবার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর সেই অনন্য কীর্তিকে
স্পর্শ করার শেষ সুযোগ রোনালদোর সামনে। কিন্তু প্রশ্নÑ এই বয়সে এসে ২০২৬ বিশ্বকাপে
পর্তুগালের শুরুর একাদশে জায়গা পাবেন তো সিআর সেভেন?
সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে
নতুন এক বৈজ্ঞানিক ডেটা পর্তুগাল কোচের সিদ্ধান্তকে পানির মতো সহজ করে দিয়েছে। মাঠের
পারফরম্যান্সের পাশাপাশি মাঠের বাইরের অবিশ্বাস্য ফিটনেস ডেটা বলছে, পর্তুগাল দলে রোনালদোর
শুরুর একাদশে থাকা নিয়ে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
ক্রীড়াবিদদের ফিটনেস ও রিকভারি
ট্র্যাকিং অ্যাপ ‘হুওপ’-এর সাম্প্রতিক ডেটা প্রকাশ করেছে রোনালদোর চিরসবুজ থাকার রহস্য।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ মৌসুমে আল-নাসরকে বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘সৌদি প্রো লিগ’ শিরোপা জেতানোর পথে
রোনালদো অফ-ফিল্ড রিকভারিতে দেখিয়েছেন চরম পেশাদারত্ব।
পুরো মৌসুমের ৪৬টি ম্যাচের
মধ্যে ৪৫টিতেই রোনালদো হুওপ ডেটার ‘গ্রিন’ অথবা ‘ইয়েলো’ জোনে ছিলেন। এর মানে হলো, প্রতি
ম্যাচেই তার শরীর সর্বোচ্চ স্তরে খেলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল।
৪৬টি ম্যাচজুড়ে তিনি গড়ে ১৫.০
ম্যাচ স্ট্রেইন বজায় রেখেছিলেন, যা একজন তরুণ ফুটবলারের জন্যেও বেশ কঠিন।
ম্যাচ ডের সকালে তার গড় রিকভারি
ছিল ৬৫.৬ এবং টানা ৮ দিন তিনি ‘গ্রিন রিকভারি’ জোনে থাকার রেকর্ড গড়েছেন।
বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে রোনালদো
নিজের পারফরম্যান্সকে অন্য স্তরে নিয়ে গেছেন। তার রিকভারি অভ্যাসের পেছনে সবচেয়ে বড়
ভূমিকা রেখেছে ‘সাউনা’, যা তার রিকভারি ক্ষমতাকে সবচেয়ে বেশি (+৫.৭ পয়েন্ট)
বাড়িয়েছে।
অন্যান্য থেরাপির মধ্যে রয়েছে
আইস বাথ (+৪.৭), ওয়ার্ম বাথ (+৪.২), ব্রিদিং এক্সারসাইজ (+৩.৫), স্ট্রেচিং (+৩.৩) এবং
রেডলাইট থেরাপি (+২.৮)। এগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি এই বয়সেও নিজেকে শতভাগ ফিট রাখছেন।
যদি মাঠের বাইরের এই অবিশ্বাস্য
নিয়মানুবর্তিতা পর্তুগাল দলে তার জায়গা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট না হয়, তবে মাঠের
পরিসংখ্যান সেই দাবিকে আরও জোরালো করবে। সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে ৩৭ ম্যাচে ৩৪টি গোলে সরাসরি
অবদান (গোল ও অ্যাসিস্ট) রেখেছেন এই ফুটবল মহাতারকা।
ইউরোতে অবিশ্বাস্য সফল হলেও
রোনালদোর বর্ণিল ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে কোনো গোল না থাকার খতিয়ানটি কিছুটা
মলিন। তবে ৪১ বছর বয়সে এসেও রোনালদো যেভাবে ফুটবল বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে বিশ্বের
অন্যতম সেরা অ্যাথলেট হিসেবে ধরে রেখেছেন, তাতে ২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের প্রথম ম্যাচ
থেকেই তার মাঠে নামার সিদ্ধান্তটি পর্তুগাল ম্যানেজমেন্টের জন্য এখন সময়ের সবচেয়ে সহজ
সিদ্ধান্ত।
রোনালদোর বিশ্বকাপ
পরিসংখ্যান (২০০৬-২০২২)
ক্যাটাগরি পরিসংখ্যান
মোট ম্যাচ ২২
অধিনায়ক হিসেবে ম্যাচ ১৬
মোট গোল ৮
পেনাল্টি থেকে গোল ৩
অ্যাসিস্ট ২
হ্যাটট্রিক ১টি (২০১৮, বিপক্ষ স্পেন)