লুকা জিদান। ছবি: আরিসে নিউজ
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মহাকাব্যের নাম জিনেদিন জিদান। যার পায়ের জাদুতে বুঁদ হয়েছিল পুরো বিশ্ব, যিনি ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সকে এনে দিয়েছিলেন প্রথম বিশ্বকাপ। ঠিক ২৮ বছর পর, ২০২৬ সালের এই বিশ্বমঞ্চে ‘জিদান’ নামটা আবার ফিরছে।
তবে এবার ফরাসি নীল জার্সিতে নয়, ফিরছে আলজেরিয়ার সবুজ-সাদা রঙে। আর জিনেদিন জিদান এবার মাঠের জাদুকর নন, গ্যালারিতে বসে থাকা এক আবেগপ্রবণ বাবা।
জিনেদিনের ছেলে লুকা জিদান
গোলরক্ষক হিসেবে নিজের অভিষেক বিশ্বকাপ ম্যাচটি খেলতে যাচ্ছেন ২৮ বছর বয়সে। প্রতিপক্ষ
ফুটবল বিশ্বের আরেক পরাশক্তি আর্জেন্টিনা। যে ম্যাচে গ্যালারিতে উপস্থিত থেকে ছেলের
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হবেন খোদ জিনেদিন।
এই ম্যাচের পেছনে লুকিয়ে আছে
এক অদ্ভুত আবেগ আর শিকড়ের টান। জিনেদিন জিদান নিজে ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বজয় করলেও তার
পূর্বপুরুষরা ছিলেন আলজেরীয়। আর তাই ছেলে লুকা যখন বাবার দেশ ফ্রান্সের পরিবর্তে (এর
আগে ফ্রান্সের ৫টি জাতীয় বয়সভিত্তিক দলে খেলেছেন) নিজের শিকড় আলজেরিয়াকে ২০২৫ সালে
বেছে নিলেন, তখন থেকেই এই গল্পের শুরু। বাবা যেখানে গোল করে প্রতিপক্ষের জাল কাঁপাতেন,
পাক্কা ৬ ফুট উচ্চতার ছেলে সেখানে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে বাজপাখির মতো গোল ঠেকানোর
দায়িত্ব নিয়েছেন।
আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী
দলের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচÑ চাপটা আকাশচুম্বী। তবে লুকার সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটা থাকবে
গ্যালারির ভিআইপি বক্সে। যেখানে বসে থাকবেন একজন পিতা, যিনি নিজেও এমন শত চাপ সামলে
নিজেকে কিংবদন্তি বানিয়েছেন। ছেলের প্রতিটি সেভ, প্রতিটি ডাইভ দেখার সময় জিনেদিনের
বুকে যে ঝড় উঠবে, তা হয়তো কোনো ট্রফি জয়ের আনন্দের চেয়ে কম নয়।
ফুটবল কত সুন্দরভাবে বৃত্ত
পূরণ করে, এই ম্যাচ তারই প্রমাণ। যে জিনেদিন জিদান ফুটবল বিশ্বকে শাসন করেছেন, তিনি
আজ গ্যালারিতে সাধারণ এক বাবা, যার চোখ থাকবে কেবল গোলপোস্টে দাঁড়ানো ছেলের দিকে। পিতার
গৌরব আর ছেলের নতুন স্বপ্নের এই মেলবন্ধন ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য আবেগঘন অধ্যায়
হিসেবে লেখা থাকবে।
জিনেদিন জিদানের চার ছেলের
মধ্যে দ্বিতীয় হলেন লুকা জিদান। ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সফল এবং পরিচিত ‘ফুটবল পরিবার’
থেকে এলেও লুকা মাঠে নিজের এক সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয় তৈরি করেছেন।
বাবা জিনেদিন জিদান
কিংবা তার বাকি তিন ভাই (এনজো, থিও এবং এলিয়াজ)Ñ সবাই যেখানে মাঝমাঠ বা আক্রমণভাগে
খেলে থাকেন, লুকা সেখানে একদম ব্যতিক্রম। তিনি ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বেছে নিয়েছেন
গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ানোর কঠিন দায়িত্ব। গোল ঠেকানোতেই তার আসল আনন্দ। ইতোমধ্যেই আলজেরিয়ার
হয়ে ৭টি ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। এখন অপেক্ষায় বিশ্বকাপে অভিষিক্ত হওয়ার।
লুকার ফুটবল ক্যারিয়ারের হাতেখড়ি
স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদের যুব একাডেমিতে। ২০০৪ সালে মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি
রিয়াল মাদ্রিদের ‘লা ফাব্রিকা’য় যোগ দেন। একাডেমির বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে তিনি রিয়াল মাদ্রিদের
মূল দলেও ডাক পান এবং ক্লাবটির হয়ে লা লিগায় মাঠে নামার সুযোগ পান।
আলজেরিয়া জাতীয় দলের হয়ে খেললেও
যুব ক্যারিয়ারে লুকা কিন্তু খেলতেন ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলে। ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৬
থেকে শুরু করে অনূর্ধ্ব-২০ দল পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টে তিনি ফরাসিদের
গোলপোস্ট সামলেছেন। ২০১৫ সালে ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে উয়েফা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ
জেতার ক্ষেত্রেও তার বড় ভূমিকা ছিল (সেবার সেমিফাইনালের টাইব্রেকারে তিনটি পেনাল্টি
সেভ করেছিলেন তিনি)।
রিয়াল মাদ্রিদ মূল দলে নিয়মিত
সুযোগ না পাওয়ায় লুকা তার ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্যে স্পেনের অন্য ক্লাবগুলোতে পাড়ি জমান।
তিনি রেসিং সান্তান্দার, রাও ভায়েকানো এবং গ্রানাদার মতো ক্লাবগুলোর হয়ে খেলেন। বিশেষ
করে রাও ভায়েকানোকে স্পেনের শীর্ষ লিগ লা লিগায় উন্নীত করার ক্ষেত্রে তিনি দারুণ অবদান
রেখেছিলেন।
লুকা তার খেলার ধরনের জন্য
বেশ প্রশংসিত। আধুনিক ফুটবলের চাহিদা অনুযায়ী তিনি একজন চমৎকার ‘সুইপার-কিপার’। শুধু
হাত দিয়ে বল সেভ করাই নয়, জিদানের ছেলে হওয়ায় স্বভাবজাতভাবেই তার পায়ের কাজ ও পাসিং
দক্ষতা বেশ নিখুঁত, যা রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণ তৈরিতে দলকে অনেক সাহায্য করে।
এখন দেখার বিষয়, এই বিশ্বকাপে
অভিষেকটা কেমন হয় লুকার। তবে তার জন্য অগ্রিম শুভকামনা- ‘ওয়েলকাম, জিদানপুত্র!’