× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফুটবল কি পারবে বিভেদ ঘোচাতে

প্রবা প্রতিবেদক

প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৪০ মিনিট আগে

 ছবি: স্পোর্টস ভ্যালু

ছবি: স্পোর্টস ভ্যালু

মেক্সিকোর সঙ্গে এবার যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। আয়োজকদের দাবি, এই যৌথ উদ্যোগ মহাদেশীয় ঐক্যের এক অনবদ্য প্রতীক। কিন্তু শুরু থেকেই এই ‘যৌথ আয়োজক’ ধারণাটি বেশ হাস্যকর মনে হয়েছে বেলন ফার্নান্দেজ-এর দৃষ্টিতে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে ইঙ্গিত করে আল জাজিরার এই কলাম লেখক ব্যঙ্গময় সুরে বলেছেন, এর মধ্যে একটি দেশ অন্যদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার ব্যাপারে একেবারেই অদক্ষ। প্রতিদিনের বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন জাহাঙ্গীর সুর।

শুরুতেই বলি যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতির কথা। বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য দেশটির অতিরিক্ত কঠোর ভিসার বিধিনিষেধ ও ‘ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা’ বিশ্বকাপকে আরও বেশি আর্থ-সামাজিক ও বৈষম্যমূলক এক আসরে পরিণত করেছে। বিশ্বকাপ যে আন্তর্জাতিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি সেই বিভ্রমকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

এ ছাড়া সহ-আয়োজক মেক্সিকোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে এক চরম সামরিকায়িত সীমান্ত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও কমান্ডার-ইন-চিফ ডোনাল্ড ট্রাম্প এই দেশটিতে বারবার বোমা হামলা ও আগ্রাসনের হুমকি দিয়েছেন। এখানেই শেষ নয়, ট্রাম্প মেক্সিকানদের ‘অপরাধী’, ‘মাদক ব্যবসায়ী’ ও ‘ধর্ষক’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। ২০১৯ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ট্রাম্প নাকি সীমান্ত অতিক্রমকারী অভিবাসীদের গুলি করার এবং সীমান্তে কুমিরভর্তি পরিখা খনন করারও পরামর্শ দিয়েছিলেন!

পুনরায় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর ট্রাম্প কার্যত আশ্রয়প্রার্থী ও অর্থনৈতিক কারণে যাওয়া শরণার্থীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছেন। এটি সত্যিই এক অদ্ভুত পদক্ষেপ; কারণ বিশ্বজুড়ে যে অস্থিরতা মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে, তার বড় অংশের জন্যই যুক্তরাষ্ট্র দায়ী।

মেক্সিকোর সহিংসতাপূর্ণ মিচোয়াকান রাজ্যের এক যুবক সম্প্রতি এক মানব পাচারকারীকে ১০ হাজার ডলার দিতে বাধ্য হয়েছেন, যাতে তাকে দড়ি দিয়ে সীমানাপ্রাচীর পার করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। নিজ দেশে জীবন যখন আর্থিকভাবে বা শারীরিকভাবে আর টেকসই মনে হচ্ছিল না, তখনই তিনি এই চরম পথ বেছে নেন। সহজ কথায়, বিশ্বের কিছু মানুষ যখন ১০ হাজার বা তার বেশি ডলার খরচ করে বিশ্বকাপের টিকিট কিনছেন, ঠিক তখন এই তরুণকে যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট দারিদ্র্য ও রক্তপাত থেকে বাঁচতে একই পরিমাণ অর্থ জোগাড় করতে হয়েছে।

অন্যদিকে মেক্সিকোর দিক থেকে চিন্তা করলে, এত বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্তটি অনেক মেক্সিকানের কাছেই চপেটাঘাতের মতো মনে হয়েছে। কারণ এই অর্থ দেশের ১ লাখ ৩৪ হাজারেরও বেশি নিখোঁজ মানুষকে খোঁজার কাজে লাগানো যেত। এই গুমের ঘটনাগুলোর বেশিরভাগই ঘটেছিল ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’ শুরুর পর, যা মূলত ছিল দরিদ্র মানুষের বিরুদ্ধে এক অঘোষিত যুদ্ধ। বিশ্বকাপের ভেন্যুগুলোর চারপাশে কুখ্যাত মেক্সিকান নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনও অনেক সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে।

এরই মধ্যে ফিফার দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, লোভ ও কপটতার ঐতিহ্য নিষ্ঠার সঙ্গে ধরে রেখেছেন সংস্থার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। গত ডিসেম্বরে তিনি ট্রাম্পকে ফিফার প্রথম ‘পিস প্রাইজÑ ফুটবল ইউনাইটস দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রদান করেন। ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ায় ট্রাম্পের ক্ষোভ প্রশমিত করতেই ইনফান্তিনো নির্লজ্জভাবে এই পুরস্কারটি উদ্ভাবন করেন। কিন্তু গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের গণহত্যার প্রধান মদদদাতার চেয়ে এই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য আর কে হতে পারে?

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৪২১ জন ফুটবলারসহ প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ফিফার ওই ‘শান্তি পুরস্কার’ পাওয়ার পর ট্রাম্প বিশ্বকে ‘ঐক্যবদ্ধ’ করার কাজে আরও এগিয়ে যানÑ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ, ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শুরু এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের দখলদারত্ব ও ধ্বংসযজ্ঞে অর্থায়ন করার মাধ্যমে।

সহ-আয়োজক কানাডা নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরীহ উত্তরের প্রতিবেশী হিসেবে তুলে ধরতে পছন্দ করলেও ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ এবং গাজার গণহত্যার সহযোগী হিসেবে তাদেরও নৈতিক ‘লাল কার্ড’ প্রাপ্য।

তবে এ বছরের বিশ্বকাপকে যতটা সম্ভব বিভেদপূর্ণ ও আনন্দহীন করার মূল কারিগর যুক্তরাষ্ট্রই। আসর শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে ইরানি ফুটবল ফেডারেশন জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের তিন ম্যাচের টিকিট বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে এবং ফেডারেশনের ১৫ জন কর্মীর ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এরপর সোমালিয়ার শীর্ষ রেফারি ওমর আরতানের কথা বলা যায়, যার এই বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের কথা ছিল, কিন্তু গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র তাকে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। আর হাইতির নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা থাকায় দলটিকে সমর্থন জানাতে দেশটিতে যাওয়ার কথা হাইতিয়ানদের ভুলেই যেতে হবে।

অবশ্য গত কয়েক দশকে সোমালিয়া ও হাইতি উভয় দেশেই মার্কিন সামরিক বাহিনী ধ্বংসাত্মক আগ্রাসন চালিয়েছে, কিন্তু তাদের নাগরিকদের একটি ফুটবল খেলা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত অতিক্রম করতে বারণ করা হয়েছে। ট্রাম্পের অব্যাহত গণগ্রেপ্তার ও নির্বাসন অভিযান ‘ঐক্য’ নামের চমৎকার ধারণাকে গলা টিপে ধরেছে। আর টিকিটের অবিশ্বাস্য চড়া দাম যেন পুঁজিবাদের এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সাফল্যের প্রমাণÑ এটি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে সব মানুষ সমান নয়।

সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, ইরানের বিশ্বকাপ দলকে মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী শহর তিজুয়ানায় নিজেদের ঘাঁটি গাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। তাদের কেবল প্রতিটি ম্যাচ খেলার জন্যই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, খেলা শেষ হলেই তাদের আবার মার্কিন ভূখণ্ড ছেড়ে যেতে হবে। এটি অনেকটা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ‘রিমেইন ইন মেক্সিকো’ (বা, মেক্সিকোতে থাকুন) নীতির কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে মেক্সিকোকে অবাঞ্ছিত দর্শনার্থীদের ডাম্পিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

যখন আমি তিজুয়ানা থেকে মার্কিন সীমান্ত পার হয়েছিলাম, তখন একজন মার্কিন নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও সেটি আমার জন্য অত্যন্ত অপমানজনক অভিজ্ঞতা ছিল। আমার কাছে মাত্র একটি কমলালেবু ছিল, কিন্তু সীমান্তরক্ষীরা এমন আচরণ করেছিল যেন ওটি কোনো পারমাণবিক ওয়ারহেড! তাই আমি ইরানি দলকে পরামর্শ দেব, তারা যেন কোনো ফলমূল সঙ্গে না রাখে।

এ কথা সত্য যে, গণহত্যার আগের ওই সময়ে ফিফার দুর্নীতি আর করপোরেট লোভের পরও বিশ্বকাপ এবং এই সুন্দর খেলায় নিজেকে হারিয়ে ফেলা অনেক সহজ ছিল। ২০২২ সালে কাতারের বিশ্বকাপে আমরা নিখাদ সৌন্দর্যের কিছু মুহূর্ত দেখেছি। যেমনÑ মরক্কো দল যখন তাদের সাবেক ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের পরাজিত করেছিল, তখন তারা ফিলিস্তিনিদের অধিকারের বিষয়টি তুলে ধরে খাঁটি মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। কিন্তু এবার, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ ও তাদের সাম্রাজ্যবাদী অহংকারের পটভূমিতে ফুটবলের সেই পুরনো উৎসাহ আর জাদুকরি অনুভূতির আর তেমন কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই।

এত কিছুর পরও মিথ্যা বলব না, আমি ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে আমার ঘরে বসে টিভিতে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার উদ্বোধনী ম্যাচটি দেখেছি এবং কিছুটা রোমাঞ্চিতও হয়েছি। মেক্সিকান ফুটবলের একটি জার্সি গায়ে জড়িয়ে, কিছুটা বিয়ার কিনে ইতালীয় চ্যানেল রাই ১-এ খেলা দেখতে বসেছিলাম। কিন্তু রাই ১-এর লোকেরা খেলা শুরুর আগে ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকা কিছু সাবেক ইরানির সাক্ষাৎকার প্রচার করার সিদ্ধান্ত নিল, যারা নিজেদের ‘পার্সিয়ান’ মনে করেন এবং ইরানের বদলে মার্কিন দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। আমি বিরক্ত হয়ে টিভির ভলিউম কমিয়ে দিলাম আর বিয়ারে চুমুক দিলাম।

বিশ্বকাপ সব সময়ই রাজনীতির অংশ ছিল। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে মার্কিন সীমান্ত যেন আসরের একেবারে বুক চিরে চলে গেছে, আর এর মধ্যে সুন্দর বলতে আসলেই কিছু নেই।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা