দক্ষিণ কোরিয়া বনাম চেক প্রজাতন্ত্র/
বাছাইপর্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, দুই দল সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে। ছবি: এআই
দীর্ঘ চার বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিশ্বমঞ্চে গড়াল ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার হাই-ভোল্টেজ লড়াইয়ের পর ফুটবলপ্রেমীদের নজর এখন গ্রুপ ‘এ’-এর দ্বিতীয় ম্যাচের দিকে। যেখানে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এশিয়ার পরাশক্তি দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের লড়াকু ফুটবল ঐতিহ্যের দেশ চেক প্রজাতন্ত্র। দুই মহাদেশের ভিন্ন ঘরানার ফুটবল শৈলী এবং রণকৌশলের কারণে এই ম্যাচটি ফুটবল বিশেষজ্ঞদের কৌতূহলের কেন্দ্রে রয়েছে।
বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে আসার জন্য দুই দলকেই ভিন্ন ভিন্ন কঠিন সমীকরণ পার করতে হয়েছে, যা তাদের বর্তমান মানসিক শক্তি ও কৌশলগত অবস্থানের একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরে।
বাছাইপর্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, দুই দল সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া: এএফসি অঞ্চলে রীতিমতো রাজত্ব করে মূল পর্বে পা রেখেছে ‘টেইগুক ওয়ারিয়র্স’রা। বাছাইপর্বের দীর্ঘ ১৬টি ম্যাচে তারা অপরাজিত থাকার এক অনন্য কীর্তি গড়েছে। এই ১৬ ম্যাচে তারা গোল হজম করেছে মাত্র ৮টি, যা তাদের রক্ষণভাগের ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তাকেই প্রমাণ করে। এই অদম্য ফর্ম ইঙ্গিত দেয় যে, ট্যাকটিক্যাল দিক থেকে তারা কতটা সুশৃঙ্খল এবং যেকোনো বিশ্বমানের দলের বিপক্ষে তারা সমানে সমানে লড়াই করার সামর্থ্য রাখে।
চেক প্রজাতন্ত্র: অন্যদিকে, চেক প্রজাতন্ত্রের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। উয়েফা জোনে শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়ার পেছনে থেকে দ্বিতীয় হয়ে গ্রুপ পর্ব শেষ করায় তাদের প্লে-অফের কঠিন বৈতরণী পার হতে হয়। সেখানে চরম স্নায়ুচাপের মুখে দাঁড়িয়ে আয়ারল্যান্ড এবং ডেনমার্ককে পেনাল্টি শুটআউটে হারিয়ে তারা বিশ্বকাপের টিকিট কাটে। এই রোমাঞ্চকর জয়গুলো প্রমাণ করে যে, যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বা চাপের মুখে ম্যাচ বের করে নেওয়ার এক দুর্দান্ত মানসিক শক্তি ও প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে এই ইউরোপীয় দলটির মাঝে।
ম্যাচ বিশ্লেষণ ও মাঠের ট্যাকটিক্স: কাগজ-কলমে এবং সাম্প্রতিক ফর্মের বিচারে এই ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়াকে ফেভারিট মানছেন ফুটবল পণ্ডিতরা। ১৯৮৬ সাল থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপে খেলার এক অবিচ্ছিন্ন রেকর্ড রয়েছে কোরিয়ানদের, যা বড় মঞ্চে তাদের অভিজ্ঞতার পাল্লাকে ভারী করে। বিপরীতে, চেক প্রজাতন্ত্র দীর্ঘ ২০ বছর পর এই প্রথম বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ফিরেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার দলে রয়েছে বিশ্বমানের তারকাদের উপস্থিতি। বিশেষ করে আমেরিকান লিগের এলএএফসি ফরোয়ার্ড সন হিউং-মিন এবং প্যারিস সেন্ট জার্মেইর লি কাং-ইন যেকোনো মুহূর্তেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।
তবে আধুনিক ফুটবল কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় দলের কিংবদন্তি এবং বর্তমান কোচ হোং মিয়ুং-বো তার দলকে সাধারণত একটি নিখুঁত ৩-৪-৩ ফর্মেশনে খেলান। তবে মাঠে খেলার পরিস্থিতি অনুযায়ী উইংব্যাকরা নিচে নেমে এসে এটি দ্রুত ৫-৪-১ বা ৫-৩-২ ফর্মেশনে রূপ নেয়। ফলে তাদের রক্ষণভাগ ভাঙা প্রতিপক্ষের জন্য একপ্রকার দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, মিরোস্লাভ কাউবেকের অধীনে চেকরাও প্রায় একই ধরনের রক্ষণাত্মক কাঠামো ব্যবহার করে, তবে তাদের খেলার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের উইংব্যাকরা ডিফেন্স করার চেয়ে আক্রমণভাগে বেশি অবদান রাখে। তাদের মূল স্ট্র্যাটেজি হলো দুই প্রান্ত ব্যবহার করে উইংব্যাকদের দিয়ে অনবরত বক্সে ক্রস পাঠানো, যাতে তাদের লম্বা ফরোয়ার্ডরা হেডের মাধ্যমে গোল আদায় করতে পারে। দুই দলের এই ভিন্নধর্মী কৌশলের কারণে মাঝমাঠে বল দখলের এক তীব্র লড়াই দেখার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।
ম্যাচের মূল আকর্ষণ ও এক্স-ফ্যাক্টর
এই ম্যাচে দুই দলেরই কিছু নির্দিষ্ট শক্তি ও লক্ষ্য রয়েছে, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। যেমন-
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়া শেষ ১৬-তে ব্রাজিলের কাছে বিধ্বস্ত হয়ে বিদায় নিয়েছিল। সেই টুর্নামেন্টে নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন কোরিয়ার ইতিহাসের সেরা গোলদাতা সন হিউং-মিন। ২০২৬ বিশ্বকাপই সম্ভবত এই টটেনহ্যাম হটস্পারের সাবেক তারকার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। স্বাভাবিকভাবেই, নিজের শেষ সুযোগে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে উজার করে দিতে এবং সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে প্রথম ম্যাচ থেকেই আগুন ঝরাতে চাইবেন সন।
দক্ষিণ কোরিয়ার রক্ষণভাগ যদি চেকিয়াকে আটকাতে চায়, তবে তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা দিতে হবে শূন্যে ভাসা বলের বিরুদ্ধে। চেক প্রজাতন্ত্রের আক্রমণভাগের প্রায় সব খেলোয়াড়ই শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং উচ্চতায় দীর্ঘ। বিশেষ করে প্যাট্রিক শিক (৬ ফুট ৩ ইঞ্চি) এবং টমাস চোরি (৬ ফুট ৬ ইঞ্চি) প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে হেডের ক্ষেত্রে মারাত্মক বিপজ্জনক। কর্নার কিংবা ফ্রি-কিক থেকে আসা যেকোনো সেট-পিস কোরিয়ানদের জন্য বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
ইনজুরি আপডেট ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্ভাব্য একাদশ: ম্যাচের আগে দক্ষিণ কোরিয়া শিবিরে একমাত্র চোটজনিত উদ্বেগ তরুণ মিডফিল্ডার বে জুন-হো-কে নিয়ে। তবে কোচ হোং মিয়ুং-বোর হাতে তার বিকল্প হিসেবে পাইক সেউং-হো এবং কিম জিন-গিউর মতো দক্ষ মিডফিল্ডার প্রস্তুত রয়েছেন।
দলের রক্ষণের মূল স্তম্ভ হিসেবে থাকবেন বায়ার্ন মিউনিখের তারকা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার কিম মিন-জায়ে। আক্রমণভাগে সবার চোখ থাকবে সন এবং লির ওপর। উলভারহ্যাম্পটনের ফরোয়ার্ড হুয়াং হি-চ্যান খেলবেন মূল স্ট্রাইকার হিসেবে, যাকে দুই প্রান্ত থেকে সাহায্য করবেন সন ও লি কাং-ইন। পিএসজি তারকা লি কাং-ইনকে প্রায়ই মাঝমাঠে নেমে এসে প্লে-মেকারের ভূমিকা পালন করতেও দেখা যেতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়া সম্ভাব্য লাইনআপ (৩-৪-৩): কিম সেউং-গিউ (গোলরক্ষক); চো ইউ-মিন, কিম মিন-জায়ে, কিম তাই-হিয়ন; কিম মুন-হওয়ান, কিম জিন-গিউ, পাইক সেউং-হো, লি তাই-সিওক; লি কাং-ইন, হুয়াং হি-চ্যান, সন হিউং-মিন।
চেক প্রজাতন্ত্রের সম্ভাব্য একাদশ ও আক্রমণভাগ: চেকরা তাদের চেনা ছক ৩-৫-২ বা ৩-৪-১-২ ফর্মেশনেই মাঠে নামবে। দলটির নতুন অধিনায়ক লাডিস্লাভ ক্রেচির সাথে রক্ষণভাগ সামলাবেন টমাস হোলেস এবং রবিন রানাক। দুই উইংব্যাকে ডেভিড জুরাসেক এবং ভ্লাদিমির কুফালের ওপর থাকবে নিখুঁত ক্রস দেওয়ার গুরুদায়িত্ব।
মাঝমাঠে অভিজ্ঞ টমাস সুচেক এবং ভ্লাদিমির দারিদা কোরিয়ান আক্রমণ রুখে দেওয়ার পাশাপাশি দলের আক্রমণ তৈরিতে সাহায্য করবেন। আক্রমণভাগে প্যাট্রিক শিকের সঙ্গী হিসেবে টমাস চোরি অথবা পাভেল সুলচকে দেখা যেতে পারে, যিনি নাম্বার টেন পজিশনে প্লে-মেকার হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারেন।
চেকিয়া সম্ভাব্য লাইনআপ (৩-৫-২): কোভার (গোলরক্ষক); হোলেস, হ্রানাক, ক্রেচি; কুফাল, সুচেক, দারিদা, প্রোভোদ, জুরাসেক; শিক, সুলচ।
ম্যাচ প্রেডিকশন বা ম্যাচের সম্ভাব্য ফলাফল : এই ম্যাচটি অত্যন্ত নিটোল ও কৌশলগত হতে যাচ্ছে, যেখানে স্পষ্ট সুযোগ তৈরি করা উভয় দলের জন্যই কঠিন হবে। চেকরা ম্যাচের শেষ মূহূর্ত পর্যন্ত হাই-প্রেস ফুটবল খেলে কোরিয়াকে চাপে রাখার চেষ্টা করবে। তবে কাউন্টার অ্যাটাকে সন হিউং-মিনের ক্ষিপ্র গতি এবং লি কাং-ইনের জাদুকরী পাসিং ম্যাচের ডেডলক ভেঙে দিতে পারে। রক্ষণ ও আক্রমণের ভারসাম্য বিচারে ম্যাচের সম্ভাব্য ফলাফল: দক্ষিণ কোরিয়া ১ - ০ চেক প্রজাতন্ত্র।