ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত ও ব্যতিক্রমী এই বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হবে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
অপেক্ষার অবসান। জমকালো আয়োজনে আজ শুরু হচ্ছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত ও ব্যতিক্রমী এই বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হবে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে।
বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় ‘এ’ গ্রুপে উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকো মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকার। \
তার আগে বর্ণিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে স্বাগত জানাবে তিন আয়োজক দেশ মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বরাবরই ফুটবলপ্রেমীদের বাড়তি আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তবে এবার আয়োজনের পরিধি ও বৈচিত্র্যে সেটি পেয়েছে নতুন মাত্রা। আয়োজক তিন দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস, সংগীত ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে উদ্বোধনী মঞ্চ।
আধুনিক প্রযুক্তি, আলোকসজ্জা ও চমকপ্রদ পরিবেশনার মাধ্যমে ফুটবলের এই মহোৎসবকে স্মরণীয় করে রাখার প্রস্তুতি নিয়েছে ফিফা। প্রতিটি আয়োজক দেশের প্রথম ম্যাচ শুরুর প্রায় ৯০ মিনিট আগে অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
এই আয়োজনের সৃজনশীল পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান প্রযোজক মার্কো বালিচ।
অলিম্পিকসহ বিশ্বের বিভিন্ন বড় ক্রীড়া আসরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের নেপথ্যের কারিগর হিসেবে পরিচিত বালিচ। অনুষ্ঠানে শাকিরা, বার্না বয়সহ বিশ্বের জনপ্রিয় সংগীত তারকাদের পরিবেশনার দিকে তাকিয়ে কোটি কোটি দর্শক।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে এবারই প্রথম ফাইনালে যুক্ত হচ্ছে ‘সুপার বোল’ ধাঁচের হাফটাইম শো। নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠেয় ফাইনালের বিরতিতে বিশ্বের শীর্ষ সংগীত তারকারা মঞ্চ মাতাবেন।
শুধু আয়োজন নয়, টুর্নামেন্টের কাঠামোতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। ম্যাচ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ফলে প্রতিযোগিতার ব্যাপ্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি বিশ্বের আরও বেশি দেশ পাচ্ছে ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ।
বিশ্বকাপ আয়োজনের ইতিহাসে প্রতিটি আসরই রেখে গেছে নিজস্ব স্বাক্ষর। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ আয়োজন করে। ভুভুজেলার অবিরাম ধ্বনি, বর্ণিল আফ্রিকান সংস্কৃতি এবং প্রাণবন্ত দর্শকসমাগম সেই আসরকে দিয়েছিল অনন্য পরিচয়। যদিও স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়, তবে টুর্নামেন্টের সফল আয়োজন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়। মাঠের লড়াইয়ে সেবার প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন।
২০১৪ সালে ফুটবলের প্রাণকেন্দ্র ব্রাজিলে বসেছিল বিশ্বকাপের আসর। সাম্বার দেশ পুরো টুর্নামেন্টকে পরিণত করেছিল এক বিশাল উৎসবে। তবে সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের ঐতিহাসিক পরাজয় ব্রাজিলিয়ানদের হৃদয়ে আজও বেদনার স্মৃতি হয়ে আছে।
২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে শুরুতে নানা প্রশ্ন ও সংশয় থাকলেও বাস্তবে সেটি পরিণত হয় সফল এক আয়োজনের উদাহরণে। আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দর্শকবান্ধব ব্যবস্থাপনা প্রশংসা কুড়ায় বিশ্বজুড়ে। স্বাগতিক রাশিয়াও কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে চমক দেখায়। ফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে মাতে ফ্রান্স।
২০২২ সালে কাতার আয়োজন করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আসর। অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভেন্যু এবং ছোট ভৌগোলিক পরিসরে পুরো টুর্নামেন্ট আয়োজন ছিল সেই বিশ্বকাপের বড় বৈশিষ্ট্য। সেই আসরের অফিসিয়াল মাসকট ‘লা’ইব’ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। আরবি শব্দ ‘লা’ইব’-এর অর্থ বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন খেলোয়াড়। যদিও মাঠে স্বাগতিক কাতারের পারফরম্যান্স হতাশাজনক ছিল, তবে ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের রুদ্ধশ্বাস লড়াই বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ পুনরুদ্ধার করে।
এবারের আসর আবারও ইতিহাসের নতুন দুয়ার খুলে দিচ্ছে। প্রথমবারের মতো তিন দেশ যৌথভাবে আয়োজন করছে বিশ্বকাপ। মেক্সিকো তৃতীয়বার, যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয়বার এবং কানাডা প্রথমবারের মতো স্বাগতিকের দায়িত্ব পালন করছে। মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়াম বিশ্বের প্রথম স্টেডিয়াম হিসেবে এটি তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছে।