মাছুম বিল্লাহ
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
রাত পোহালেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই আসর শুরু হবে মেক্সিকো সিটির কিংবদন্তি আজতেকা স্টেডিয়ামে। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ১টায় উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হবে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা। একই সঙ্গে জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীকে স্বাগত জানাবে উত্তর আমেরিকার তিন আয়োজক দেশ মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা।তবে এবারকার বিশ্বকাপ অনেক দিক থেকেই ব্যতিক্রমী ও ঐতিহাসিক। চার বছর পর পর আয়োজিত এই বৈশ্বিক উৎসব শুধু শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, বরং বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় তুলে ধরারও এক অনন্য মঞ্চ। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সেই অর্থে নতুন এক যুগের সূচনা করছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ যৌথভাবে আয়োজন করছে শুধু তাই নয়, এবারই প্রথম বিশ্বকাপের মূলপর্বে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দেশ। ফলে আরও বিস্তৃত হচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্র, বাড়ছে প্রতিযোগিতা।
এই ঐতিহাসিক আয়োজনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বল ‘ট্রাইওন্ডা’র নকশায়। নামের মধ্যেই রয়েছে তিন স্বাগতিক দেশের ঐক্য ও সংযোগের প্রতীকী বার্তা। আধুনিক ফুটবলের চাহিদা মাথায় রেখে বলটিতে যুক্ত করা হয়েছে অত্যাধুনিক ‘কানেক্টেড বল প্রযুক্তি’। বিশ্বকাপের রঙিন আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে তিনটি নতুন মাসকটও উন্মোচন করেছে ফিফা। কানাডার ‘ম্যাপল’ নামের মুজ, মেক্সিকোর ‘জায়ু’ নামের জাগুয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্লাচ’ নামের বল্ড ঈগল প্রতিনিধিত্ব করছে তিন স্বাগতিক দেশকে। শক্তি, সাহস, বৈচিত্র্য এবং ঐক্যের প্রতীক হিসেবে এই তিন চরিত্র বিশ্বকাপজুড়ে থাকবে।
বিশ্বকাপ
মানেই নতুনত্বের ছোঁয়া। আর সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ আসরে আসছে বেশ কয়েকটি নতুন নিয়ম।
মাঠে কোনো খেলোয়াড় হাত, বাহু বা জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে কথা বললে তাকে শাস্তির মুখোমুখি
হতে হবে। রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মাঠ ত্যাগ করলে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হবে।
থ্রো-ইন ও গোলকিকের ক্ষেত্রেও সময়সীমা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে
বল খেলায় না আনলে প্রতিপক্ষ সুবিধা পাবে। বদলি খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেও এসেছে নতুন নির্দেশনা।
পরিবর্তনের সংকেত পাওয়ার পর ১০ সেকেন্ডের মধ্যে নিকটবর্তী সীমানারেখা দিয়ে মাঠ ছাড়তে
হবে। পাশাপাশি ভিএআরের ক্ষমতাও আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। ভুল খেলোয়াড়কে কার্ড দেখানো,
দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের স্পষ্ট ভুল কিংবা নির্দিষ্ট কিছু সেট-পিস পরিস্থিতিতে এখন ভিএআর
হস্তক্ষেপ করতে পারবে।
উত্তর
আমেরিকার আবহাওয়ার কথা বিবেচনায় রেখে প্রতিটি ম্যাচে প্রতি অর্ধে তিন মিনিটের একটি
করে ‘ওয়াটার ব্রেক’ রাখা হয়েছে। খেলোয়াড়দের শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ।
এ ছাড়া গোলরক্ষক চিকিৎসা নেওয়ার সময় উভয় দলের খেলোয়াড়রা মাঠ ছেড়ে কোচদের সঙ্গে আলাদা
‘টাইমআউট’ নিতে পারবেন না।
বিশ্বকাপ
এলেই বাংলাদেশেও তৈরি হয় এক ভিন্ন আবহ। একসময় শহর থেকে গ্রাম, অলিগলি থেকে মহাসড়ক সবখানেই
উড়ত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা স্পেনের পতাকা। চায়ের দোকান, পাড়ার আড্ডা
কিংবা বাজারে চলত ফুটবল নিয়ে তুমুল বিতর্ক। কে সেরা, কে জিতবে বিশ্বকাপ এসব প্রশ্নে
উত্তপ্ত হয়ে উঠত পরিবেশ।
কিন্তু
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্তারে মাঠের বাইরের
ফুটবল উন্মাদনার বড় অংশ এখন স্থানান্তরিত হয়েছে ভার্চুয়াল জগতে। আগের মতো রাস্তাজুড়ে
পতাকার সমারোহ কিংবা রাতভর তর্ক-বিতর্কের দৃশ্য তুলনামূলক কম দেখা যায়। তবুও গ্রামাঞ্চলের
অনেক এলাকায় বিশ্বকাপ ঘিরে এখনও উৎসবের আবহ তৈরি হয়। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকরা
ভাগ হয়ে প্রীতি ম্যাচ আয়োজন করে, শোভাযাত্রা বের করে, নিজেদের দল ঘিরে নানা কর্মসূচি
পালন করে।
বাংলাদেশের
ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনার গল্পও কম নয়। ২০১৪ সালে মাগুরার কৃষক আমজাদ হোসেন সাড়ে তিন
কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির পতাকা তৈরি করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসেন। পরবর্তীতে সেই পতাকার
দৈর্ঘ্য বেড়ে সাত কিলোমিটারে পৌঁছে। এবার মৌলভীবাজারের শৈশব হাজরা নিজের পুরো বাড়িকে
আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা রঙে সাজিয়ে তুলেছেন। স্থানীয়দের কাছে সেটি এখন ‘আর্জেন্টিনা
বাড়ি’ নামেই পরিচিত। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও
নতুন মাত্রা যোগ হয়। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার দূতাবাস চালু হওয়াকে অনেকেই
ফুটবল-সৃষ্ট আবেগেরই এক অনন্য প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
এবারের
বিশ্বকাপের মাঠের বাইরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক।
যুদ্ধের ক্ষত, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং ভিসা জটিলতার মধ্যেও বিশ্বকাপে
অংশ নিচ্ছে ইরান। তবে খেলোয়াড়রা ভিসা পেলেও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা অনুমতি পাননি। বিশ্বকাপের
মতো বৈশ্বিক আসরের প্রেক্ষাপটে এমন ঘটনা বিরল ।
বিশ্বকাপের
ইতিহাসও যেন আটলান্টিক মহাসাগরের দুই তীরকে ঘিরেই আবর্তিত। দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপ
ছাড়া অন্য কোনো মহাদেশের দেশ এখনও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। ২২টি বিশ্বকাপের মধ্যে ১২টি
জিতেছে ইউরোপের দেশগুলো এবং ১০টি দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিনিধিরা। ফলে ফুটবলের সর্বোচ্চ
আসরে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই এখনও মূলত আটলান্টিকের দুই পাড়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
বর্তমান
চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবার মাঠে নামছে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। ২০২২ সালের সাফল্যের
ধারাবাহিকতা ধরে রেখে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য তাদের। ফুটবল ইতিহাসে এই
কীর্তি এর আগে কেবল ইতালি ও ব্রাজিলই করতে পেরেছে। এদিকে, হ্যাট্রিক ফাইনাল খেলার সুযোগ
রয়েছে ফ্রান্সের। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল, তাদের শিরোপা পাঁচটি। এরপর
জার্মানি ও ইতালির চারটি করে, আর্জেন্টিনার তিনটি, ফ্রান্স ও উরুগুয়ের দুটি করে এবং
ইংল্যান্ড ও স্পেনের একটি করে শিরোপা রয়েছে।
তবে
এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সম্ভবত অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মহারণ। একদিকে কিলিয়ান
এমবাপে, লামিন ইয়ামাল, জুড বেলিংহ্যাম, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কিংবা আর্লিং হালান্ডদের মতো
তরুণ তারকারা বিশ্ব ফুটবলের নতুন সম্রাট হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। অন্যদিকে লিওনেল মেসি,
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, লুকা মদরিচ, ম্যানুয়েল নয়্যার, মোহাম্মদ সালাহ ও নেইমারদের মতো
কিংবদন্তিরা শেষবারের মতো নিজেদের মহিমা ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত। ফুটবল ইতিহাসে অনেক বিশ্বকাপ
এসেছে, অনেক কিংবদন্তি বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু একই আসরে এতগুলো মহাতারকার সম্ভাব্য শেষ
বিশ্বকাপ খুব কমই দেখা যায়। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু নতুন চ্যাম্পিয়নের সন্ধানই নয়;
এটি বিশ্ব ফুটবলের এক সোনালি প্রজন্মকে শেষবারের মতো সম্মান জানানোরও রাজকীয় আয়োজন।