নাজমুল হক তপন
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
ইরানের বিশ্বকাপ খেলা আর অন্য দেশগুলোর অংশ নেওয়া এই দুইয়ের ভেতর পার্থক্যটি খুবই সুস্পষ্ট। ছবি: সংগৃহীত
ইরানের বিশ্বকাপ খেলা আর অন্য দেশগুলোর অংশ নেওয়া এই দুইয়ের ভেতর পার্থক্যটি খুবই সুস্পষ্ট।
অন্য দলগুলো একটা বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়। প্রস্তুতি ম্যাচ, অনুশীলন ক্যাম্প নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে অন্য দলগুলো। আর সেখানে শুধুমাত্র বিশ্বকাপের মঞ্চে পৌঁছতেই যুদ্ধ করতে হচ্ছে ইরানকে।
ইরানের জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি যেন একের পর এক বাধা পেরোনোর গল্প। যুদ্ধের ক্ষত, ভিসা জটিলতা এবং অর্থনৈতিক সংকট সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রের পদে পদে প্রতিবন্ধকতা তৈরি- এতসব বাঁধাবিপত্তি পেরিয়ে বিশ্বকাপ অভিযানে নামতে হচ্ছে ইরানকে।
সুস্থধারার সবচেয়ে বড় সর্বজনীন উৎসব বিশ্বকাপ ফুটবল। তবে এই মহোৎসবে মাঝেমধ্যেই পড়ে কালো ছায়া।
গোলাবারুদ-ট্যাংক-ফাইটার প্লেন সর্বোপরি অস্ত্রের ঝনঝনানির মধ্যে মাঝেমধ্যেই থমকে যায় ফুটবল। কিন্তু ইরান হারা না মানা মানসিকতা দেখিয়ে অনেক লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অংশ নিচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ আসরে।
অনেক নাটকীয়তার পর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা মিলেছে ইরানের। বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র ৫ দিন আগে এই ছাড়পত্র পেয়েছে দেশটির ফুটবল সেনানিরা।
মেক্সিকোর সময় অনুযায়ী রবিবার ভোর ৫টায় ইরানের বিমান পৌঁছে তিজুয়ানায়। ১৬ জুন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের প্রথম ম্যাচ লস অ্যাঞ্জেলেসে। ২২ জুন ক্যালিফোর্নিয়ায় বেলজিয়াম এবং ২৭ জুন সিয়াটলে মিসরের বিরুদ্ধে ম্যাচ রয়েছে ইরানের।
গ্রুপ পর্বের সবগুলো ম্যাচই শত্রুর দেশে খেলতে হবে তাদের। দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে পারলে কানাডায় খেলতে যেতে হবে ইরানকে।
সব দেশ থাকবে খেলার ভেন্যুর কাছাকাছি। সেখানে মেক্সিকোর তিজুয়ানা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে খেলতে হবে ইরানকে। কেননা মাত্র একদিনের জন্য ভিসা পেয়েছেন ইরানের ফুটবলাররা।
আমেরিকায় রাত কাটানোর সুযোগ নাই তাদের। ম্যাচের দিন সকালে তারা আমেরিকায় যাবেন এবং খেলা শেষ হওয়ার পর ফিরে আসবেন আবার মেক্সিকোয়।
যুক্তরাষ্ট্র ভিসা দিয়েছে খেলোয়াড়দেরই, পাননি ১৫ জন কর্মকর্তা। এমন ঘটনা বিশ্বকাপ ইতিহাসে নজিরবিহীন।
বলা বাহুল্য ইরানের বেজক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় হওয়ার কথা থাকলেও সেটা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে মেক্সিকোতে।
আক্ষেপ করে দেশটির ফুটবল প্রধান মেহদি তাজ বলেছেন, “বিশ্বের আর কোথায় কোনো জাতীয় দল ম্যাচের মাত্র এক দিন আগে প্রবেশের অনুমতি পায়?”
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র টেনশন অনেক পুরনো। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসঙ্গে ইরানে বিমান হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিরোধ শুরু করে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র সর্বস্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েও বাগে আনতে পারেনি দেশটিকে। ওই যুদ্ধ শুরুর পর, বিশ্বকাপে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। এমনকি ইরানের জায়গায় ইতালিকে বিশ্বকাপে খেলানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সব অপচেষ্টাই ব্যর্থ করে দিয়েছে তারা।
এর আগেও যুদ্ধের কালো থাবা পড়েছে বিশ্বকাপের ওপর। কিন্তু সরাসরি যুদ্ধ হওয়া দুটো দেশের একটিতে খেলতে যাওয়ার ঘটনা আলোড়ন তুলেছে গোটা বিশ্বে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল) কারণে বিশ্বকাপের দুই দুটো আসরে ছেদ পড়ে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের জন্য ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের দুটি বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়নি।
বিশ্বকাপ ফুটবল মাঠে যুদ্ধের প্রভাবের বড় ঘটনার সাক্ষী ১৯৮৬ বিশ্বকাপ। যার পেছনের ঘটনাটি ছিল ঐতিহাসিক ফকল্যান্ড যুদ্ধ।
দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুদ্ধে জড়ায় আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্য। ১৯৮২ সালের ২ এপ্রিল থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলে।
২ মে ব্রিটিশ একটি ডুবোজাহাজ যুদ্ধ-অঞ্চলের বাইরে আর্জেন্টিনার জেনেরাল বেলগ্রানো নামের ক্রুজার জাহাজটি ডুবিয়ে দেয়। এতে ৩৭০ জন আর্জেন্টাইন প্রাণ হারান। এই যুদ্ধে ব্রিটিশরা জয়ী হয়।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড। ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে দেয় ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা।
জোড়া গোল করেন ম্যারাডোনা। হেড করার বদলে হাত দিয়ে প্রথম গোলটি করেছিলেন ম্যারাডোনা। যেটি 'হ্যান্ড অব গড' নামে খ্যাত। ওই ম্যাচে ম্যারাডোনোর দ্বিতীয় গোলটি সর্বকালের সেরার মর্যাদায় উন্নীত। নীরবে ফকল্যান্ড যুদ্ধের যেন প্রতিশোধই নিয়েছিলেন ম্যারাডোনা।
'হ্যান্ড অব গড' তথা ওই ম্যাচ নিয়ে ম্যারাডোনা অসংখ্যবার বলেছেন, “ফকল্যান্ড যুদ্ধে আর্জেন্টাইনবাসীর মধ্যে যে দুঃখ দিয়েছে ব্রিটিশরা, আমি সেটাই ওদেরকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।”
ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২২ বিশ্বকাপের আসরে জয়গা হয়নি রাশিয়ার। যুক্তরাষ্ট্রের কূটচালে বিদেশের মাটিতে ফুটবল ম্যাচে নিষিদ্ধ করা হয় রাশিয়ার জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত।
তবে ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন কিংবা ইরানের সঙ্গে অন্যায় ও অন্যায্য যুদ্ধের পরও বিশ্বকাপের অন্যতম গর্বিত আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র।
পুঁজি ও ক্ষমতার দাপটে ধরাকে সরা জ্ঞান করা আমেরিকানদের জন্য ইটের বদলে পাথরই বোধকরি জুৎসই জবাব।
আর তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আসল যমদূত ইরান। এটা যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে তেমিন মাঠের খেলায়ও।
১৯৯৪-এর বিশ্বকাপের আগে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক অবরোধের মুখে পড়ে ইরান। বিশ্বকাপে একই গ্রুপে পড়ে দুই দল। যেখানে মুখোমুখি লড়াইয়ে ২-১ গোলে যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে বড় জবাবটাই দেয় ইরান।