২০২৬ বিশ্বকাপে অফিসিয়াল ম্যাচ বলগুলোর ভেতরে থাকছে আল্ট্রা-ওয়াইডব্যান্ড সেন্সর এবং কানেক্টেড বল টেকনোলজি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ফুটবল মহোৎসবের ঘণ্টা বাজছে। উত্তর আমেরিকার তিন দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ কেবল দলসংখ্যা বৃদ্ধির কারণেই অনন্য নয়, বরং মাঠ ও মাঠের বাইরের একগুচ্ছ বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কারণে এটি হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে আধুনিক এবং পরিবেশবান্ধব বিশ্বকাপ।
তথ্যপ্রযুক্তির অবিশ্বাস্য ব্যবহার থেকে শুরু করে পরিবেশ সচেতনতা আর নিয়মের আধুনিকায়ন- ফুটবলকে আরও গতিশীল ও নিখুঁত করতে ফিফা এবার ঢেলে সাজিয়েছে পুরো আয়োজন। মাঠে ও মাঠের বাইরে এবারের বিশ্বকাপে যেসব বড় নতুনত্ব দেখা যাবে, সেদিকে তাকানো যাক।
বল চার্জিং স্টেশন: চিপ প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত
গত বিশ্বকাপে আমরা প্রথমবার ফুটবলকে চার্জ দিতে দেখেছিলাম, তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে এই প্রযুক্তি আরও এক ধাপ পরিপক্ক রূপ নিচ্ছে। এবারের অফিসিয়াল ম্যাচ বলগুলোর ভেতরে থাকছে আল্ট্রা-ওয়াইডব্যান্ড সেন্সর এবং কানেক্টেড বল টেকনোলজি। ম্যাচের আগে রেফারিদের রুমে বিশেষ চার্জিং ডকের মাধ্যমে বলগুলো পুরোপুরি চার্জ করা হবে। এই চার্জড বলের ভেতরের সেন্সরটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার ডেটা পাঠাবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি রুমে। এর ফলে মিলিমিটারের সূক্ষ্মতায় অফসাইড নির্ধারণ এবং বল গোললাইন পার হয়েছে কি না, তা মুহূর্তের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে। অফসাইডের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এখন আর অনর্থক সময় নষ্ট হবে না। পরিবেশ সুরক্ষায় গ্রিন ইনিশিয়েটিভবদলে যাচ্ছে পানির বোতল পরিবেশের ওপর বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব কমানোর বড় এক মিশন নিয়ে মাঠে নামছে ফিফা। এবারের বিশ্বকাপে ওয়ান-টাইম বা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পানির বোতল ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণ আনা হচ্ছে। খেলোয়াড়দের জন্য থাকছে বিশেষভাবে তৈরি রিইউজেবল বায়োডিগ্রেডেবল (সহজে পচনশীল) জলের বোতল। এমনকি গ্যালারিতে দর্শকদের জন্যও প্লাস্টিক বর্জ্য কমাতে স্টেডিয়াম জুড়ে বসানো হচ্ছে 'স্মার্ট ওয়াটার স্টেশন' বা রিফিল বুথ। মাঠের তীব্র গরমে খেলোয়াড় ও অফিসিয়ালদের তরতাজা রাখতে প্রতি অর্ধে প্রথাগত 'কুলিং ব্রেক' তো থাকছেই, তবে সে ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বোতল ও লজিস্টিকসের রিসাইক্লিং নিশ্চিত করতে থাকবে বিশেষ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা। তথ্যপ্রযুক্তির মহাসমারোহ : ভিআইপি অভিজ্ঞতা গ্যালারিতে ও বেঞ্চে ডাগআউটে থাকা কোচদের জন্য এবার থাকছে রিয়েল-টাইম ডেটা অ্যানালিটিক্স ট্যাব। ম্যাচ চলাকালীন দলের কোনো খেলোয়াড় কতটা ক্লান্ত, কার পাসিং অ্যাকুরেসি কেমন, বা প্রতিপক্ষের ট্যাকটিক্যাল দুর্বলতা কোথায় তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির মাধ্যমে কোচেদের স্ক্রিনে ভেসে উঠবে। মাঠের বাইরে দর্শকদের জন্যও থাকছে 'অগমেন্টেড রিয়ালিটি' অ্যাপস। স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে স্মার্টফোনের ক্যামেরা মাঠের দিকে তাক করলেই কোনো খেলোয়াড়ের লাইভস্পিড, গোল রেশিও বা লাইভ স্ট্যাটস স্ক্রিনে দেখা যাবে। আইন-কানুন ও রেফারিংয়ে কঠোরতা খেলার গতি বাড়াতে এবং ইচ্ছাকৃত সময় নষ্ট করা বন্ধ করতে ফিফা এবার 'স্টপ-ক্লক' ধারণার কাছাকাছি কিছু নিয়ম আরও কড়াভাবে প্রয়োগ করবে। চোটের কারণে বা গোল উদযাপনে নষ্ট হওয়া সময় যেন নিখুঁতভাবে ইনজুরি টাইমে যোগ হয়, সেজন্য চতুর্থ রেফারির বোর্ডে থাকবে বিশেষ ডিজিটাল কাউন্টডাউন। এ ছাড়াও মাঠে রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে কেবল দলের অধিনায়কই কথা বলতে পারবেন- এই নিয়মটি অত্যন্ত কঠোরভাবে পালন করা হবে। অধিনায়ক ছাড়া অন্য কোনো খেলোয়াড় রেফারির দিকে ধেয়ে এলে সাথে সাথেই হলুদ কার্ড দেখার নিয়ম এবার আরও কঠোর হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে মুখ ঢেকে কথা বললেই কড়া শাস্তির আওতায় আনা হবে।
সর্বোচ্চ দেশ ও আয়োজক ৪৮ দলের বিশাল
ক্যানভাস মাঠের ভেতরের সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান পরিবর্তনটি অবশ্যই দলসংখ্যায়। ৩২ দলের চিরচেনা কাঠামো ভেঙে এবারই প্রথম অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দেশ। ১২টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দলগুলো খেলবে এবং নকআউট পর্বে যুক্ত হচ্ছে রাউন্ড অব থার্টি-টু (৩২ দলের রাউন্ড)। ফলে টুর্নামেন্টের মোট ম্যাচের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১০৪টিতে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ কেবল ফুটবলারদের পায়ের জাদুই দেখাবে না, বরং এটি হতে যাচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞান, পরিবেশ সচেতনতা এবং প্রযুক্তির এক নিখুঁত মেলবন্ধন। মাঠের ৯০ মিনিটের রোমাঞ্চকে অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে খেলাটিকে আরও আধুনিক ও টেকসই করা যায়, এই বিশ্বকাপ বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনকে সেই নতুন পথই দেখাতে চলেছে।