জাহাঙ্গীর সুর
প্রকাশ : ৭ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে
ভিন্ন দলের সমর্থক, তবু ফুটবলের শাশ্বত প্রেমে এক সুতোয় গাঁথা! বিশ্বকাপের আনন্দ-উন্মাদনায় প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর বিশেষ ফটোশুটে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিনেতা শরিফুল রাজ ও অভিনেত্রী মেঘলা মুক্তা। ছবি: আরিফুল আমিন
আমরা ভেবে দেখেছি কি, কেন প্রিয় দলের জার্সি গায়ে জড়াই? শুধু একটুকরো রঙিন কাপড় কীভাবে আমাদের মনস্তত্ত্ব ও আবেগে এবং মাঠের খেলায় এত বড় জাদুকরি প্রভাব ফেলে? মনোবিজ্ঞান, সাহিত্য ও সমাজবিজ্ঞানের আলোকে ভক্তের মনের ময়নাতদন্ত করেছেন জাহাঙ্গীর সুর।
বিশ্বকাপ মানেই বাংলাদেশে
এক অন্য রকম উন্মাদনা, এক বাঁধভাঙা উৎসব। জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’র চিরচেনা স্নিগ্ধ
নিসর্গের যেন এই সময়ে অদ্ভুত রূপান্তর ঘটে; বাড়ির ছাদে পতাকার লড়াই, চায়ের কাপে ঝড়,
আর রাজপথ থেকে শুরু করে অলিগলি ছেয়ে যায় হলুদ-সবুজ কিংবা আকাশি-সাদায়। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার
বিশাল ফ্যানবেজ ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই যেন নিজেদের অস্তিত্বের নতুন অর্থ খুঁজে পায় এই
দেশে। প্রিয় দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে অফিস যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠা কিংবা
গভীর রাতে টিভির সামনে বসে গলা ফাটানোÑ এসবই এক অলিখিত নিয়ম!
পরিচয়ের প্রতীক ও
এক অদৃশ্য বন্ধন : ফুটবল জার্সি আজ শুধু মাঠের খেলোয়াড়ের পোশাক নয়, এটি ফুটবল শিল্পের
অন্যতম লাভজনক একটি বিপণন মাধ্যম। বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক বিক্রীত এবং কাঙ্ক্ষিত স্পোর্টস
ও ফ্যাশন অনুষঙ্গÑ এই জার্সি। বাউল সম্রাট লালন সাঁইজি তার গানে গেয়েছিলেন, ‘লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে।’ বিশ্বকাপের
এই মৌসুম বাংলাদেশে এই দর্শনের নিখুঁত সামাজিক রূপায়ণ বৈকি। কে কোন পেশার, কার সামাজিক
অবস্থান কীÑ সব ভেদ মুছে গিয়ে মানুষের একটাই ‘জাত’ বা পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়; সে কোনো একটি
দলের সমর্থক, সে ফুটবলের সমর্থক।

জার্সি মূলত একটি
নান্দনিক ও পারফর্মেটিভ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যা মানুষের এই সামষ্টিক পরিচয়কে প্রকাশ
করে। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে এটি কেবলই একটি পোশাক, কিন্তু জিন্স বা টি-শার্টের মতো
ফুটবল জার্সি বিশ্বব্যাপী একটি ‘গ্লোবাল ইউনিফর্ম’-এ পরিণত হয়েছে। মুখে কোনো কথা না
বলেও, নিছক একটি জার্সি গায়ে জড়িয়ে একজন মানুষ সমাজে তার অবস্থান ও আবেগ জানান দেয়।
এটি যেন মতপ্রকাশের প্রচলিত ‘নীরবতার সর্পিল বলয়’ ভেঙে একজন ভক্তকে তার নিজস্ব গোত্রে
একাত্ম হতে সাহায্য করে। এর বিশেষ নকশা ও রঙ মাঠের ভেতরে এবং বাইরে দল, ক্লাব ও ভক্তদের
ঐক্যবদ্ধ করে; একটি সহযোগিতাপূর্ণ সম্প্রদায় গঠনে সাহায্য করে।
জার্সির সামাজিক
জীবন : জার্সির পেছনের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে আমাদের বস্তুর সামাজিক জীবনের দিকে তাকাতে
হবে। এই জার্সিগুলো নিবিড় এক সামাজিক বস্তু, যার মধ্য দিয়ে অর্থ, মূল্যবোধ ও সম্পর্ক
আদান-প্রদান হয়। সমাজবিজ্ঞানী অর্জুন আপাদুরাইয়ের ‘বস্তুর সামাজিক জীবন’ তত্ত্ব অনুযায়ী,
জার্সি হলো এমন পরিবর্তনশীল পণ্য, যার মূল্য ক্রমাগত বিনিময় ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে তৈরি
হয়।
জার্সি নিছক কোনো কাপড় নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘ সামাজিক গতিপথের ‘ঘনীভূত মুহূর্ত’। ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যা মহাকালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণÑ ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো মারাদোনার পরা জার্সিটি। সেই ম্যাচে মারাদোনা ‘ঈশ্বরের হাত’ দিয়ে ‘শতাব্দীসেরা গোল’ করেছিলেন, যা ওই নির্দিষ্ট জার্সিটিকে একটি পৌরাণিক মর্যাদা এনে দেয়। এই জার্সিটি তখন আর কেবল স্পোর্টস ইক্যুইপমেন্ট থাকে না, বরং এটি একটি স্মারকে পরিণত হয়, যা ভক্তদের মনে স্মৃতিকাতরতার জন্ম দেয়।
পরিচয় অর্থনীতি ও
রবীন্দ্রনাথের ‘অসীম’: মানুষ কেন নির্দিষ্ট রঙের জার্সির প্রতি এত অনুগত থাকে, তার
চমৎকার ব্যাখ্যা দেয় ‘আইডেন্টিটি ইকোনমিকস’ বা পরিচয় অর্থনীতি। আকেরলফ ও ক্রান্টন এক
গবেষণায় দেখিয়েছেন, একটি সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে পরিচিতি লাভ করা মানুষের আচরণের একটি
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘সীমার মাঝে, অসীম, তুমি বাজাও
আপন সুর।’ একটি নির্দিষ্ট মাপের ও রঙের জার্সি যেন ভক্তের কাছে সেই ‘সীমা’, যার ভেতরে
কোটি মানুষের ‘অসীম’ আবেগ ও উন্মাদনা অনুরণিত হয়।
বেশিরভাগ ফুটবল ভক্ত
একটি বিশাল ও নৈর্ব্যক্তিক গোষ্ঠীর সদস্য হয়েও নিজেদের মধ্যে একটি সামষ্টিক পরিচয় গঠন
করেন। স্বীকৃত ও নির্দিষ্ট রঙের জার্সি পরার মাধ্যমে তারা এই বিশাল গোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেদের
মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এই আলাদা করার প্রবণতা ভক্তদের আত্মসম্মানবোধ
ও মানসিক তৃপ্তি বাড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১২ সালে কার্ডিফ সিটি ক্লাবের মালিক ঐতিহ্যবাহী
নীল জার্সি পরিবর্তন করে লাল জার্সি প্রচলনের সিদ্ধান্ত নিলে ভক্তরা এর তীব্র বিরোধিতা
করেন। কারণ, লাল রঙ ছিল তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রিস্টল সিটির, আর নীল জার্সিটি ১৯০৮
সাল থেকে তাদের পরিচয়ের সঙ্গে মিশে ছিল।

মনস্তাত্ত্বিক পুঁজি ও খেলোয়াড়দের ওপর প্রভাব : ভক্তদের এই জার্সি পরার উন্মাদনা কেবল গ্যালারি বা ড্রয়িংরুমেই সীমাবদ্ধ থাকে না; মাঠের খেলোয়াড়দের ওপর এর প্রভাব জাদুকরি। দলের লোগো ও রঙ পরিহিত ভক্তদের দেখলে খেলোয়াড়দের প্রেরণা, মনোযোগ ও আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়। খেলোয়াড়দের ‘মনস্তাত্ত্বিক পুঁজি’ গঠনে এই দৃশ্যমান সমর্থন জাদুকরি ভূমিকা রাখে।
সামাজিক সমর্থন ও
মানসিক চাপ হ্রাস : ফ্রিম্যান ও রিজ এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, অ্যাথলিটরা যখন অনুধাবন
করেন যে, তাদের পেছনে একটি শক্তিশালী সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে, তখন তাদের মানসিক চাপ কমে
যায় এবং তারা আরও ভালো পারফর্ম করেন। সতীর্থ ও ভক্তদের কাছ থেকে পাওয়া এই সামাজিক সমর্থন
খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
পরিচয় ও দলের প্রতি
সংহতি : হ্যাসলাম ও তার সতীর্থ গবেষকরা দেখিয়েছেন, সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব অনুসারে, যখন
মানুষ এমন একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে, যাদের লক্ষ্য এবং মূল্যবোধ অভিন্ন,
তখন তাদের আত্মমর্যাদাবোধ বৃদ্ধি পায়। এই অভিন্ন পরিচয় তাদের মধ্যে একতার অনুভূতি সৃষ্টি
করে, যা খেলোয়াড়ের মনোযোগ বাড়ায় ও মানসিক চাপ কমায়।
প্রতীকী সমর্থনের
শক্তি : ভক্তদের পরিহিত জার্সি খেলোয়াড়দের জন্য এক প্রকার প্রতীকী সমর্থন বা ‘সিম্বলিক
অ্যাফার্মেশন’ হিসেবে কাজ করে। হেইস ও সহ-গবেষকদের গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের দৃশ্যমান
সমর্থন খেলোয়াড়দের মনস্তাত্ত্বিকভাবে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং কঠিন মুহূর্তে নিজেদের
দক্ষতার ওপর আস্থা রাখতে সাহায্য করে।
ভয় ও উদ্বেগ দূরীকরণ : দলীয় পোশাক পরা ভক্তদের দৃশ্যমান সমর্থন অ্যাথলিটদের মানসিক চাপ পরিচালনা করতে সাহায্য করে। রিজ ও ফ্রিম্যান এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ভক্তদের এই দৃশ্যমান সমর্থন খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স অ্যাংজাইটি বা পারফর্ম করার উদ্বেগ কমাতে একটি বাফার বা ঢাল হিসেবে কাজ করে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে
অনুপ্রাণিত করা : দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে ভক্তরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অ্যাথলিটদের জন্যও
একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। স্মিথ ও উলরিচ-ফ্রেঞ্চ দেখিয়েছেন, তরুণ অ্যাথলিটরা
যখন তাদের সম্প্রদায়ের মানুষকে দলের প্রতি এমন দৃশ্যমান আবেগ দেখাতে দেখেন, তখন তারা
খেলাধুলার প্রতি আরও বেশি নিবেদিত ও অনুপ্রাণিত বোধ করেন।
আবেগ বনাম বাজার
অর্থনীতি : জার্সি ঘিরে এই যে মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ, আধুনিক বিশ্ব ফুটবলে তা এক বিশাল
রূপকথার বাজার তৈরি করেছে। ব্র্যান্ডিং ও সুনামের কারণে ভক্তদের মনে একটি নির্দিষ্ট
ব্র্যান্ড বা রঙের প্রতি তীব্র আনুগত্য তৈরি হয়। এই আনুগত্য এতটাই শক্তিশালী যে, প্রতিবছর
ক্লাবের জার্সির নকশায় সামান্য পরিবর্তন এলেও ভক্তরা তা বিপুল মূল্যে কিনে নেন। এটি
প্রমাণ করে যে, একটি পণ্য যখন মানুষের অভ্যাস ও অনুভূতির সঙ্গে মিশে যায়, তখন তার অর্থনৈতিক
মূল্য চলে যায় সাধারণ হিসাব-নিকাশের বাইরে।
যখন বিশ্বকাপ ফুটবলের বাঁশি বাজবে, আমরা আমাদের প্রিয় দলগুলোর জার্সি পরে রাস্তায় নামব, তখন আমরা কেবল এক টুকরো কাপড় গায়ে জড়াব না। বরং আমরা আলিঙ্গন করব এক দীর্ঘ ইতিহাস, একটি সামষ্টিক পরিচয় ও সীমাহীন আবেগ। আমাদের এই দৃশ্যমান সমর্থন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা খেলোয়াড়দের মনে বুনে দেবে আত্মবিশ্বাসের বীজ। কারণ ফুটবলের আসল সৌন্দর্য কেবল মাঠের ঘাসেই সীমাবদ্ধ নয়; তা লুকিয়ে আছে কোটি ভক্তের মনের গভীরে, তাদের গায়ে জড়ানো ওই রঙিন জার্সির প্রতিটি সুতোয়।