রুমেল খান
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ফিফা বিশ্বকাপ এ পর্যন্ত জিতেছে আট দেশ উরুগুয়ে, জার্মানি, ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, স্পেন এবং ইতালি। আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হওয়া বিশ্বকাপের বিশ্বমঞ্চে প্রথম সাতটি দেশই খেলবে, কিন্তু দেখা যাবে না চারবারের শিরোপাধারী ইতালিকে।
ফুটবল বিশ্বকাপের চেয়ে বড় মহোৎসব এই গ্রহে আর দুটি নেই। চার বছর পর পর যখন এই মহারণ ফিরে আসে, তখন পুরো বিশ্ব মেতে ওঠে এক অদ্ভুত উন্মাদনায়। কিন্তু এই উৎসবের আলো যতটা তীব্র, এর পেছনের অন্ধকারটাও ঠিক ততটাই নির্মম। বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেওয়ার বাছাইপর্বের লড়াইটা এক আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে ইতিহাস, ঐতিহ্য কিংবা মহাতারকাদের নামের ওজন কোনো বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দেয় না। আর তাই, ২০২৬ সালের এই মেগা আসরকে সামনে রেখে ফুটবলবিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে বেশকিছু পরাশক্তিকে বরণ করতে হয়েছে নির্মম বিদায়ের ভাগ্য।
সবচেয়ে বড় এবং অবিশ্বাস্য ধাক্কাটি এসেছে নিঃসন্দেহে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালির ক্যাম্প থেকে। একসময় ডিফেন্সিভ ফুটবলের যে ‘কাতেনাসিও’ দেওয়াল দিয়ে তারা বিশ্ব শাসন করত, সেই দেওয়াল এখন নিজেদের ঘরের মাঠেই ভেঙে পড়েছে। আজ্জুরিদের জন্য এটি কেবল একটি ব্যর্থতা নয়, এটি একটি জাতীয় ট্র্যাজেডি। ২০১৮ আর ২০২২-এর পর এবার ২০২৬-টানা তৃতীয়বারের মতো ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে কোয়ালিফাই করতে পারেনি ইতালি। যে দেশের ফুটবল ঐতিহ্য এত সমৃদ্ধ, ডনোরুম্মা-বারেলাদের মতো তারকাদের এভাবে টানা এক যুগ ধরে বিশ্বমঞ্চের বাইরে থাকাটা ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক ভীষণ বেদনাদায়ক দৃশ্য। গ্যালারিতে নীল জার্সির জোয়ার আর মাঠের সেই চিরচেনা ইতালিয়ান ট্যাকটিকসের অভাব এবারও পুড়াবে ফুটবল রোমান্টিকদের।
তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের এই কান্নার মিছিলে ইতালি একদম একা নয়। ইউরোপ থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকা কিংবা আফ্রিকা-সব মহাদেশেরই বেশ কিছু ফেভারিট ও শক্তিশালী দলকে পুড়তে হয়েছে বাছাইপর্বের অগ্নিপরীক্ষায়।
লাতিন আমেরিকার অন্যতম আক্রমণাত্মক ও শক্তিশালী দল চিলি। যারা ২০১৫ ও ২০১৬ সালে টানা দুবার লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, সেই আলেক্সিস সানচেজ ও আরতুরো ভিদালদের দল লাতিন আমেরিকার কঠিন বাছাইপর্বের সমীকরণ মেলাতে ব্যর্থ হয়ে মূল পর্বের টিকিট কাটতে পারেনি।
ইউরোপের লড়াকু এবং প্রতিভাবান দল হিসেবে আলাদা পরিচিতি রয়েছে ইউক্রেন এবং রবার্ট লেভানডোভস্কির পোল্যান্ডের। ইউরোর মতো বড় মঞ্চে নিয়মিত দাপট দেখালেও, ইউরোপের প্লে-অফের সেমিফাইনাল ও ফাইনালের ভাগ্যনির্ধারণী ম্যাচে (যেমন সুইডেনের কাছে পোল্যান্ডের হার) হেরে গিয়ে তাদের ২০২৬ বিশ্বকাপের স্বপ্নভঙ্গ হয়।
আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি নাইজেরিয়া। দেশটি টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ তাদের দলে ছিলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার ভিক্টর ওসিমেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অ্যাডেমোলা লুকম্যান, ভিক্টর বোনিফেসদের মতো তারকারা ইউরোপীয় ফুটবলে আলো ছড়িয়েছেন। এত প্রতিভা থাকার পরও বিশ্বকাপে জায়গা না পাওয়াটা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।
ইউরোপ থেকে আরেকটি চমকপ্রদ অনুপস্থিতি ডেনমার্ক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের সবচেয়ে সংগঠিত দলগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিল ডেনিশরা। ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেন, রাসমুস হয়লুন্ডদের নিয়ে গড়া দলটিকে অনেকেই সহজেই বিশ্বকাপে দেখার আশা করেছিলেন। কিন্তু প্লে-অফের বাধা পেরোতে পারেনি তারা।
আফ্রিকার আরেক ঐতিহ্যবাহী শক্তি ক্যামেরুন। তাদের অনুপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। রজার মিলা, স্যামুয়েল এতোদের উত্তরসূরিরা এবার বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি। ২০২২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে হারানোর স্মৃতি এখনও টাটকা, অথচ চার বছর না যেতেই তারা বিশ্বমঞ্চ থেকে ছিটকে পড়েছে।
এ ছাড়া সার্বিয়া, ওয়েলস, কোস্টারিকার মতো পরিচিত দলগুলোকেও দেখা যাবে না উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। ইতিহাস, ঐতিহ্য কিংবা তারকাখচিত স্কোয়াড কোনো কিছুরই আলাদা মূল্য নেই যদি মাঠের লড়াইয়ে নিজেকে প্রমাণ করা না যায়। ৪৮ দলের বিশ্বকাপেও ইতালি, নাইজেরিয়া, চিলি বা ক্যামেরুনের মতো দল বাদ পড়ে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে আধুনিক ফুটবলে ব্যবধান কমে এসেছে। বিশ্বকাপের টিকিট এখন আর কারও জন্মগত অধিকার নয়; সেটি অর্জন করতে হয় মাঠে, ঘামের বিনিময়ে, প্রতিটি ম্যাচে। আর তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হলে ট্রফির লড়াই যেমন আলোচনায় থাকবে, তেমনি আলোচনায় থাকবে সেই সব বড় নামও, যারা এবার বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসবটি দেখবে দর্শক হয়ে।