বড় চুক্তি ও অর্থপ্রাপ্তির পরও প্রস্তুতি নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের সংশয়
রুমেল খান
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২০:১৮ পিএম
আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:৪১ পিএম
বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) অস্ট্রেলিয়ায় গেছে। মিশন এএফসি নারী এশিয়ান কাপের চূড়ান্তপর্বে অংশ নেওয়া। এবারই তারা
এই আসরে প্রথমবার খেলবে। বাছাইপর্বে যখন বাংলার বাঘিনীরা এই অসাধ্য সাধন করলো, তখন
এই দলটিকে নিয়ে অনেক ‘বড় বড়’ কথা বলেছিলেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) তিন
কর্তাব্যক্তি, তারা হলেন সভাপতি তাবিথ আউয়াল, সহসভাপতি ফাহাদ করিম এবং নারী উইংয়ের
চেয়ারম্যান ও বাফুফে সদস্য মাহফুজা আক্তার কিরণ। কিন্তু দল অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগ পর্যন্ত
তাদের কথার সঙ্গে কাজের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটাকে ফুটবলপ্রেমীরা বলছেন ‘চাপাবাজি’!
মোটকথা, প্রস্তুতির যথেষ্ট ঘাটতি নিয়েই আফঈদারা গেছেন অসি-ভূমে! এবং সেটা যাওয়ার আগে
বাফুফে ভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনেই বোমা আকারে ফাটিয়ে গেছেন দলের ব্রিটিশ কোচ পিটার
বাটলার।
এর বিপরীতে একটু দেখে নেওয়া যাক, অন্য
দেশগুলো এবার এশিয়ান কাপের প্রস্তুতি কিভাবে নিয়েছে।
আমাদের পাশের দেশ ভারতও এবার এই আসরে
খেলবে। তারা ১ জানুয়ারি থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তুরস্কে টানা ক্যাম্প করেছে। সেখানে
তারা স্থানীয় ক্লাবগুলোর সঙ্গে ৫/৬টা প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে। তারপর তারা বাংলাদেশের
আগেই অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে।
পক্ষান্তরে বাফুফে কি করেছে? নামকাওয়াস্তে
একটা নারী ফুটবল লিগের আয়োজন করেছে, যার মান নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। এক্ষেত্রে দায়
এড়াতে পারবেন না বাটলারও। কেননা তার কাছে ‘অচ্ছুত’ সাবিনা-মাসুরারা যখন ভুটানের লিগে
খেলতে যায়, তখন তিনি গণমাধ্যমে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন ওই লিগে তো মাহফুজা আক্তার কিরণও
খেলতে পারেন। মূলত ভুটানি লিগের মান যে কতটা নিচু-সেটা বোঝাতেই তিনি এমন উপমা দিয়েছিলেন।
কিন্তু ঢাকার কমলাপুর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত নারী ফুটবল লিগের মান যে ভুটানের মতোই ছিল,
সেটা দিবালোকের মতো পরিস্কার। ফলে প্রশ্ন উঠতে পারে, বাটলার এই লিগে কি খেলার জন্য
কিরণকে বলেছিলেন?
সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হচ্ছে ঘাসের মাঠ।
অস্ট্রেলিয়ায় ঋতুপর্ণা-সুরভীরা খেলবেন ঘাসের মাঠে। কিন্তু মেয়েদের দেশে লিগ খেলেছেন
টার্ফে। এতে করে তাদের প্রস্তুতিটা কি যথাযথ হলো? এটা কি বাটলার বাফুফেকে জানিয়েছিলেন?
লিগের ম্যাচগুলো কি ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম, বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়াম কিংবা বসুন্ধরা
কিংস অ্যারেনায় আয়োজন করা যেত না?
সাফ নারী ফুটসালে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন
হয়েছে। সেই দলের কাউকেই বাটলার এশিয়ান কাপের জন্য বিবেচনা করেননি। কারণটা সবাই জানে।
সাবিনাসহ কয়েক ফুটবলারকে ‘বিদ্রোহী’ মনে করেন বাটলার। নিজের ‘ইগো’ ধরে রাখতে তাদের
কখনোই জাতীয় দলে না-ফেরানোর ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। ফুটবলপ্রেমেীরা বলছেন সাবিনাদের ক্যাম্পে
ডেকে অন্ততঃ তাদের ট্রায়াল নিতে পারতেন, পরে বাদ দিয়ে দিলে কারোর কিছু বলার থাকতো না।
কিন্তু পিটার সে পথেই হাঁটেননি। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এশিয়ান কাপে।
এশিয়ান কাপে বাংলাদেশ গ্রুপ প্রতিপক্ষ
৯ বারের চ্যাম্পিয়ন চীন, তিনবারের চ্যাম্পিয়ন উত্তর কোরিয়া ও উজবেকিস্তান। সঙ্গত কারণেই
চীন-কোরিয়াকে বাদ দেওয়া যাক। বাকি থাকে উজবেকিস্তান, যারা এ নিয়ে ষষ্ঠবারের মতো এই
আসরে খেলবে। আগের পাঁচবারই বিদায় নিয়েছে গ্রুপ স্টেজ থেকে। বাফুফের কি কোনো ধারণা আছে,
এই উজবেকিস্তানকে হারাতে পারলে বাংলাদেশের নারী ফুটবল কোথায় কোন স্তরে চলে যেতে পারে?
তার আগে জানা দরকার উজবেকিস্তান কেমন
প্রস্তুতি নিয়েছে। গত অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত তারা ফিলিপাইন,
ইরান, ভিয়েতনামের সাথে একাধিক প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে। এবং তারাও বাংলাদেশের আগেই পাড়ি
জমিয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। 
এর বিপরীতে বাংলাদেশ কি ধরনের প্রস্তুতি
নিয়েছে? তাবিথ-ফাহাদ-কিরণ কি করলেন? তাদের কি একটাই কাজ ছিল, দলের লক্ষ্যের নাম ‘মিশন
অস্ট্রেলিয়া’ দেওয়া? একটা মোবাইল কোম্পানির সঙ্গে এই সময়ে চুক্তি করে
মোটা অংকের টাকা পেলেন, কিন্তু সেই টাকা মেয়েদের কোথায় কোন খাতে ব্যয় হয়েছে, তা কেউ
জানে না! ফিফা-এফসি থেকেও টাকা আসে মনিকা-মারিয়া-তহুরাদের জন্য, সেই টাকা কোথায় যায়,
অরেক স্পন্সর একটি ব্যাংকের টাকা কিভাবে খরচ হয় মেয়েদের পেছনে, তারাই ভালো জানেন!
ঢাকার পাঁচতারকা একটি হোটেলে নারী দলকে
কিছুদিন আগে রেখেছিল বাফুফে। শোনা গেছে, সেখানকার বিল পরিশোধ ঠিকমতো-সময়মতো করতে পারেনি
বাফুফে। ফলে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে মেয়েদেরকে পল্টনের একটি কমদামী হোটেলে রাখার ব্যবস্থা
করে বাফুফে! এগুলোই প্রমাণ করে বাফুফে কতটা ‘দক্ষ’ ও ‘পেশাদার’!
এবারের এশিয়ান কাপে মোট ১২ দল অংশ নেবে
তিন গ্রুপে। শীর্ষ পয়েন্টধারী ৮টি দল যাবে কোয়ার্টার ফাইনালে। এদের মধ্যে প্রতি গ্রুপে
চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ হচ্ছে ৪টি দল। বাকি ২টি হচ্ছে সেরা তৃতীয় দল। বাংলাদেশ যদি
গ্রুপ ম্যাচে আগামী ৯ মার্চ উজবেক বাহিনীকে হারাতে পারে, তাহলে তাদের জোরালো সম্ভাবনা
থাকবে শেষ আটে নাম লেখানোর। তখন বাংলাদেশের সামনে খুলে যাবে অলিম্পিক ফুটবলে কোয়ালিফাই
করার দরজা! ফলে ৯ মার্চ হতে পারে বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের স্মরণীয় দিন।
এখানেই শেষ নয়। কোয়ার্টারে যদি বাংলাদেশ
জিতে যায়, তাহলে বাংলাদেশ দল যোগ্যতা অর্জন করবে ফিফা বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার! আবার
শেষ আটে যদি হেরেও যায় লাল-সবুজ বাহিনী, তাতেও কোনো ক্ষতি নেই তাদের। এশিয়ান কাপের
সেমিতে ওঠা ৪টা দেশ ফিফা বিশ্বকাপে সরাসরি খেলবে। কোয়ার্টারে হেরে যাওয়া বাকি ৪ দেশ
তখন স্থান নির্ধারণী ম্যাচে খেলে জিতলে তখনও বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার সুযোগ থাকবে।

বাফুফের তাবিথ-ফাহাদ-কিরণ কি ভেবে দেখেছেন এশিয়ান কাপে বাংলাদেশের মেয়েরা কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে? তারা কি বুঝতে পারছেন মেয়েরা বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার দ্বারপ্রান্তে? বুঝতে পারলে তাহলে এই হচ্ছে দল গঠন, এই হচ্ছে প্রস্তুতি? কয়েক মাস আগে যেসব প্রতিশ্রতি দিয়েছিলেন, আজ কোথায় সেসব প্রতিশ্রুতি?
আরকে/প্রবা