রুমেল খান
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৫৫ পিএম
আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:১৭ পিএম
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটেছে। ফুটবল
মাঠের লড়াইয়ে যিনি ছিলেন দলের অন্যতম ভরসা, গোলপোস্টের অতন্দ্র প্রহরী, যিনি রাজনীতির
মাঠে নেমে সয়েছেন কারাভোগ-নির্যাতন, নির্বাচনের লড়াইয়ে শিকার হয়েছেন ষড়যন্ত্রের, সেই
ব্যক্তিটির রাজনৈতিক ভাগ্য স্রষ্টা লিখে রেখেছিলেন অন্যভাবে। বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট
পার্টির (বিএনপি) হয়ে যে নিদারুণ ত্যাগ স্বীকার করেছেন ও নিষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন, তারই
স্বীকৃতি পেলেন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দিনটি
যেন যথার্থ অর্থেই ‘মঙ্গলময়’ ছিল আমিনুলের জন্য। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৬ আসন
থেকে হারলেও ‘টেকনোক্র্যাট’ কোটায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব
পেয়েছেন এই আলোচিত নেতা। জাতীয় দলের সাবেক তারকা এই গোলরক্ষককে প্রধানমন্ত্রী তারেক
রহমানের নেতৃত্বধীন মন্ত্রিসভায় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদের
দক্ষিণ প্লাজায় অন্যান্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সাথে তাকে শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি
মো. সাহাবুদ্দিন।
আমিনুলের রেকর্ড ও অন্যান্য ফ্যাক্ট
: বাংলাদেশের
ইতিহাসে ক্রীড়াবিদ থেকে সংসদ সদস্য হয়ে মন্ত্রিত্ব পাওয়ার নজির একেবারেই নগণ্য। আমিনুলকে
নিয়ে সংখ্যাটা মাত্র তিন! আগের দুজন হলেন দুই ফুটবলার : মেজর (অব) হাফিজ উদ্দিন বীর
বিক্রম ও আরিফ খান জয়। কাকতালীয়ভাবে আমিনুলও ফুটবলার! 
হাফিজ ১৯ মার্চ ১৯৯৬ থেকে ২৯ মার্চ
১৯৯৬ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব
পালন করেন। এরপর অষ্টম জাতীয় সংসদে খালেদা জিয়ার তৃতীয় মন্ত্রিসভায় তিনি ১১
অক্টোবর ২০০১ থেকে ২২ মে ২০০৩ সাল পর্যন্ত পাটমন্ত্রী, ২২ মে ২০০৩ থেকে ২৯ অক্টোবর
২০০৬ পর্যন্ত পানিসম্পদমন্ত্রী এবং পরে ২৪ এপ্রিল ২০০৬ থেকে ২৮ অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত
বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জয় ২০১৪-২০১৯ সাল পর্যন্ত যুব ও ক্রীড়া
উপমন্ত্রী ছিলেন।
সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের পর এই তালিকায়
যুক্ত হয়েছেন আমিনুল। তিনি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন, তবে টেকনোক্র্যাট
কোটায়। নির্বাচনে পরাজিত হয়ে বা টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হওয়ার নজির আগে কোনও সাবেক
ক্রীড়াবিদের ছিল না। আমিনুল হকই এখানে প্রথম! এছাড়া এর আগে কোনো ক্রীড়াবিদই ক্রীড়ামন্ত্রী
বা প্রতিমন্ত্রী হতে পারেননি। এখানেও আমিনুলই প্রথম।
এছাড়া ক্রীড়াঙ্গন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছেন
আরও কয়েকজন। তারা হলেন- মাহবুব হারান গিনি, আব্দুস সালাম মুর্শেদী, নাইমুর রহমান দুর্জয়,
সাকিব আল হাসান ও মাশরাফি মুর্তজা। তবে তাদের কেউ মন্ত্রিত্ব পাননি। তাই এখন পর্যন্ত
ফুটবলার থেকে মন্ত্রী হওয়ার ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে থাকলেন হাফিজ, জয় ও আমিনুল। 
আমিনুলকে অভিনন্দন : নতুন ক্রীড়া
প্রতিমন্ত্রী আমিনুলকে অভিনন্দন জানিয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ফুটবল
ফেডারেশন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা, বাংলাদেশ স্পোর্টস
প্রেস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নলিস্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ স্পোর্টস
জার্নলিস্টস কমিউনিটিসহ বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশন-অ্যাসোসিয়েশন।
যে ব্যতিক্রমী ধারায় মন্ত্রী : গত ১২ ফেব্রুয়ারি
জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-১৬ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির হয়ে লড়াই করেন আমিনুল।
নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী কর্নেল (অব) আবদুল বাতেনের
কাছে স্বল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে গেলেও ক্রীড়াঙ্গন ও দলীয় অবদান বিবেচনায় আমিনুল হককে
টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী করার দাবি ছিল ক্রীড়াঙ্গনের। শেষ পর্যন্ত ক্রীড়াঙ্গনের
সেই দাবিই রূপ নিয়েছে বাস্তবে। যদিও বিসিবির সাবেক সভাপতি আলী আসগর লবি ও সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী
নিতাই রায়ের নাম শোনা গেলেও অবশেষে আমিনুলই দায়িত্ব পেলেন। সবশেষ নির্বাচিত সরকারে
পূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন নাজমুল হাসান পাপন।
সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রীসভার মোট সদস্যের
১০ শতাংশ টেকনোক্র্যাট হতে পারেন। সাধারণত দলের প্রতি ত্যাগ, বিশেষ দক্ষতা ও অপরিহার্যতা
বিবেচনায় এই কোটায় নিয়োগ দেওয়া হয়। আমিনুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং ক্রীড়াঙ্গনে
তার গ্রহণযোগ্যতাই তাকে এই পদে আসীন করেছে। মাঠের বাস্তব সমস্যাগুলো বুঝে ক্রীড়াঙ্গনে
সুশাসন ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতেই তাকে এই মন্ত্রণালয়ের জন্য যোগ্য মনে করা হচ্ছে।
ক্রীড়াবিদদের যে প্রত্যাশা আমিনুলকে
ঘিরে : বিএনপির ইশতেহারে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন এবং
তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় অন্বেষণের যে মহাপরিকল্পনা রয়েছে, আমিনুলের নেতৃত্বে তা নতুন গতি
পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে নির্বাচনী প্রচারণার সময় আমিনুল জানিয়েছিলেন,
তার দল ক্ষমতায় এলে ক্রীড়া অবকাঠামোর চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে ক্রীড়াবিদদের ওপর।
জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় ও
কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, ‘আমিনুল এই মুহূর্তে ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক হওয়ার জন্য
সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। আশা করি তিনি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবেন।’ উপমহাদেশের
প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদ বলেন, ‘আমিনুলের একটি নিজস্ব ভিশন রয়েছে। তিনি
দেশের ইতিহাসের সেরা ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন বলে বিশ্বাস করি।’
স্বর্ণজয়ী শুটার শারমিন আক্তার রত্না বলেন, ‘আমিনুল ভাই সব বিষয়ে অবগত। আমরা আশাকরি
এখন থেকে ক্রীড়াবিদরা তাদের ন্যায্য অধিকার পাবেন।’ 
আমিনুলের দীর্ঘদিনের সতীর্থ গোলরক্ষক
বিপ্লব ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘নির্বাচনে হারলেও দল তাকে মূল্যায়ন করায় পুরো ক্রীড়াঙ্গন
আজ সম্মানিত।’ সাবেক ফুটবলার জাহেদ পারভেজ চৌধুরী বলেন, ‘আমিনুলের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের
ক্রীড়াঙ্গন আবার সচল হবে।’
জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত কামরুন
নাহার ডানা বলেন, ‘আমিনুলের খেলোয়াড়ি পরিচয় ও রাজনৈতিক দক্ষতা ক্রীড়াঙ্গনকে সামনের
দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’ 
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আমিনুলের
সামনে তিন চ্যালেঞ্জ : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জিতলে দলটির
যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক আমিনুল হক এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন, সেই আলোচনা ছিল দীর্ঘদিনের।
তবে সংসদ নির্বাচনে আমিনুল হেরে গেলে আলোচনার ডালপালা ছড়িয়েছিল বিভিন্নজনকে নিয়ে। তবে
শেষ পর্যন্ত টেকনোক্র্যাট কোটায় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন আমিনুল। 
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের
পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে অবহেলিত ছিল ক্রীড়াঙ্গন।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও আসিফ নজরুল পর্যায়ক্রমে সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন যুব ও ক্রীড়া
উপদেষ্টা হিসেবে। কিন্তু এই দুই ‘আসিফ’-এর চরম অদক্ষতায় ক্রীড়াঙ্গন হয়ে উঠেছিল স্থবির,
রোপণ হয়েছিল বিশৃঙ্খলার বীজ! ফলে আমিনুলের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ হবে স্থবির ক্রীড়াঙ্গনে
প্রাণ ফিরিয়ে আনা। বিশেষ করে অন্যতম প্রধান খেলা ক্রিকেটের সর্বনাশই হয়েছে বিগত ১৮
মাসে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিসিবিসহ বিভিন্ন ফেডারেশনে অসংগঠক ও অদক্ষদের দিয়ে সাজিয়েছে।
আমিনুলের চ্যালেঞ্জ হবে প্রকৃত ও দক্ষ সংকঠকদের হাতে ক্রীড়াঙ্গন ফিরিয়ে দেওয়া, ক্রীড়াঙ্গনে
গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে ফেডারেশনগুলোয় নির্বাচন আয়োজন করা, ক্রীড়াঙ্গন রাজনীতিমুক্ত করা। 
যখন ফুটবলার ছিলেন আমিনুল : আমিনুলকে শুধু
বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গোলরক্ষক হিসেবে গণ্য করা হয়। ব্রাজিলের নেইমারের
সাবেক ক্লাব আল-হিলাল তাঁকে প্রস্তাব দিয়েছিল সেই ২০০২ সালে! কিন্তু নানা কারণে সেই
ক্লাবে খেলা হয়নি তাঁর।
অনেক পরিচয় তাঁর। মূল পরিচয় ফুটবলার।
এছাড়াও একসময় রেস্টুরেন্ট ব্যবসা, একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের স্পোর্টস এ্যাম্বাসেডর
ও স্পোর্টস এ্যাডভাইজার-ও ছিলেন। এছাড়া এএফসির ‘ওয়ান গোল’ প্রচারণায়ও সম্পৃক্ত হয়েছিলেন।
নারীর স্বাধীনতা, খাদ্যনিরাপত্তা, শিশু ইত্যাদি বিষয়ে প্রচারণায় বাংলাদেশে আয়োজিত বিভিন্ন
অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন ১৯৯৮-২০১০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জার্সিতে ৫৫ ম্যাচ খেলা
আমিনুল।
ভোলার ছেলে আমিনুলের বেড়ে ওঠা ঢাকার
মিরপুরে। পাইওনিয়ার লিগের এমএসপিসি সিটি ক্লাবে হাতেখড়ি। ১৯৯৪-২০১৪ সাল পর্যন্ত ক্লাব
পর্যায়ে খেলেছেন মোহামেডান, মুক্তিযোদ্ধা, ফরাশগঞ্জ, আবাহনী, ব্রাদার্স ইউনিয়ন, শেখ
জামাল ধানমন্ডি ও টিম বিজেএমসিতে। জিতেছেন ১৫টি শিরোপা, যার ৭টিই মুক্তিযোদ্ধার হয়ে।
আর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে জিতেছেন চোখ ধাঁধানো দুটি শিরোপা, একটি ২০০৩ সালে জাতীয়
দলের হয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ, আরেকটি ২০১০ সালে অ-২৩ দলের হয়ে এসএ গেমস ফুটবল (শেষের
আসরে গোল গোল হজম করেননি, ছিলেন দলের অধিনায়ক)। 
ফুটবল ছাড়ার পরপরই ২০১৪ সালে রাজনীতিতে
জড়িয়ে পড়েন আমিনুল। বর্তমানে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির ক্রীড়া সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর
উত্তর বিএনপির আহবায়ক তিনি।
এক নজরে আমিনুল
· * ক্রীড়াবিদদের মধ্যে প্রথম টেকনোক্রেট মন্ত্রী
· * প্রথম ক্রীড়াবিদ হিসেবে প্রতিমন্ত্রী
· * নির্বাচনে পরাজিত হয়েও মন্ত্রী হওয়ার নজির
· * হাফিজ-জয়ের পর তৃতীয় ফুটবলার-ক্রীড়াবিদ হিসেবে মন্ত্রী
· * ৩৪তম ব্যক্তি হিসেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে
আরকে/প্রবা