রুমেল খান
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:৩৬ পিএম
আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:২৮ পিএম
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) শেষ হয়েছে নারী ফুটবল লিগের সপ্তম আসর। ১০ খেলার প্রতিটিতেই জিতে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে রাজশাহী স্টারস ফুটবল ক্লাব। লিগে একমাত্র দল হিসেবে কোনো ম্যাচেই গোল হজম করেনি। এছাড়া করেছে সবচেয়ে বেশি গোল, ৯০টি। নবাগত দলটির জন্য আরেকটি সুখবর হচ্ছে তাদের অপরিহার্য ফরোয়ার্ড আলপি আক্তার ৩০টি গোল করে হয়েছেন লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
লিগে দলের হয়ে প্রতিটি ম্যাচেই খেলেছেন সম্প্রতি নেপালে অনুষ্ঠিত সাফ অনুর্ধ-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে গোল্ডেন বল ও গোল্ডেন বুট জেতা আলপি। প্রতিটি ম্যাচেই করেছেন গোল। প্রতিষ্ঠিত স্ট্রাইকারদের পেছনে ফেলে প্রতিপক্ষের জালে জড়িয়েছেন একের পর এক গোল।
শুরুতে গোলসংখ্যায় তার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের আরেক ফরোয়ার্ড শামসুন্নাহার জুনিয়র। কিন্তু আলপি ছিলেন ধারাবাহিক, আত্মবিশ্বাসী ও ফর্মের তুঙ্গে। শামসুন্নাহার জুনিয়র মাত্র ১টি ম্যাচে গোল পাননি। আর সেই ম্যাচটিই ছিল রাজশাহী স্টারসের বিপক্ষে! আর সেটাকেই কড়ায়-গণ্ডায় কাজে লাগান আলপি। 
কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে এবারের লিগের সব ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজশাহী স্টারস তাদের প্রথম ম্যাচ খেলে গত ৩ জানুয়ারি। প্রতিপক্ষ ছিল গতবারের চ্যাম্পিয়ন নাসরিন স্পোর্টস একাডেমি। নাসরিনকে ১২-০ গোলে শোচনীয় হারের স্বাদ দিয়ে শুভসূচনা করে রাজশাহী। ম্যাচের ৭৬ মিনিটে গোল করেন আলপি, যা ছিল ম্যাচের শেষ গোল।
৭ জানুয়ারি বিকেএসপি ফুটবল ক্লাবের বিপক্ষে মুখোমুখি হয় রাজশাহী স্টারস। ৪-০ গোলে জেতে রাজশাহী। আলপি করেন লিগে তার প্রথম হ্যাটট্রিক (ম্যাচের ৩, ৬২ ও ৭১ মিনিটে)। হন প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ।
১০ জানুয়ারি নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ পুলিশ ফুটবল ক্লাবের মুখোমুখি হয়ে তাদের ৭-০ গোলে বিধ্বস্ত করে রাজশাহী স্টারস। ম্যাচের ষষ্ঠ গোলটি করেন আলপি (৮৪ মিনিটে)। 
রাজশাহী তাদের চতুর্থ ম্যাচে মুখোমুখি হয় আনসার ও ভিডিপি ফুটবল ক্লাবের। ১৩ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচেও ৮-০ গোলের বড় ব্যবধানে জেতে রাজশাহী। ম্যাচের ১৫ মিনিটে দলের হয়ে প্রথম গোলটিই ছিল আলপির।
১৭ জানুয়ারি নিজেদের পঞ্চম ম্যাচে গোলের বন্যা বইয়ে দেয় রাজশাহী স্টারস। কাচারিপাড়া একাদশ উন্নয়ন সংস্থাকে হারায় ২৪-০ গোলে! এই ম্যাচে আলপি ছিলেন ফর্মের তুঙ্গে। ডাবল হ্যাটট্রিকসহ একাই করেন ৭টি গোল (২, ৯, ২০, ৩৯, ৪৮, ৪৯ ও ৬৩ মিনিটে)। এবং সঙ্গত কারণেই হন ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’। 
২০ জানুয়ারি। ষষ্ঠ ম্যাচ। রাজশাহীর প্রতিপক্ষ ঢাকা রেঞ্জার্স ফুটবল ক্লাব। ম্যাচে যথারীতি জয়ী রাজশাহী। জেতে ১০-০ গোলে। আলপি করেন ডাবল হ্যাটট্রিক (৬, ২৪, ৫১, ৫৪, ৫৭ ও ৭৮ মিনিটে)। হন ম্যাচসেরা।
২৪ জানুয়ারি। ‘মহা গুরুত্বপুর্ণ’ ম্যাচে ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের মুখোমুখি হয় রাজশাহী স্টারস। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই ম্যাচে ১-০ গোলে জেতে রাজশাহী। এক গোলেই ভাগ্যরেখা টানেন আলপি। ম্যাচের তখন ৩৯ মিনিট। ফরাশগঞ্জের সীমানায় বল। গোলরক্ষক ইয়ারজান বেগম ব্যাকপাস দিলেন এক সতীর্থ। সেই বল আরেক সতীর্থ সমীক্ষা ঘিমিরিকে দিতে চাইলেন ইয়ারজান। কিন্তু সমীক্ষার একটু দূরেই দাঁড়িয়ে থাকা রাজশাহী স্ট্রাইকার আলপি আক্তার সেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। সুযোগ সন্ধানী আলপি বল নিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই বক্সের ভেতরে ঢুকে পড়েন। বিপদ বুঝে পেছন থেকে সমীক্ষা এবং সামনে থেকে ইয়ারজান দ্রুত এগিয়ে যান। কিন্তু তাদের বিন্দুমাত্র কোনো সুযোগ দেননি আলপি। ঠাণ্ডা মাথায় ডন পায়ের প্লেসিং শটে বল পাঠান জালে (১-০)। সতীর্থদের সঙ্গে মেতে ওঠেন বাঁধভাঙা উল্লাসে। ইয়ারজান তখন হতাশায় নিজের মাথায় হাত দিয়ে ফেলেছেন। লিগে এটা আলপির ২০তম গোল, যা সর্বোচ্চ গোলদাতা ফরাশগঞ্জের শামসুন্নাহার জুনিয়রের চেয়ে ২টি কম। এই ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হন আলপি। 
নিজেদের অষ্টম ম্যাচে ২৭ জানুয়ারি সিরাজ স্মৃতি সংসদের বিপক্ষে মাঠে নামে রাজশাহী স্টারস। ১৩-০ গোলে অনায়াসেই জেতে তারা। হ্যাটট্রিকসহ একাই ৫ গোল করেন আলপি (৩, ১৮, ৬০, ৮৩ ও ৮৫ মিনিটে)। ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারটি চলে যায় আলপির হাতেই, পঞ্চমবারের মতো। 
১০ ফেব্রুয়ারি। নিজেদের নবম ম্যাচ খেলে রাজশাহী স্টারস। প্রতিপক্ষ সদ্যপুস্করিনী যুব স্পোর্টিং ক্লাব। রাজশাহী জেতে ৮-০ গোলে। ম্যাচে হ্যাটট্রিসহ ৪ গোল করেন আলপি (৯, ৫৫, ৬৭ ও ৭৫ মিনিটে)। 
১৩ ফেব্রুয়ারি। নিজেদের দশম ও শেষ ম্যাচ খেলতে নামে রাজশাহী স্টারস। প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ আর্মি স্পোর্টস ক্লাব। এই ম্যাচে ড্র করলেই শিরোপা নিশ্চিত হতো রাজশাহীর। কিন্তু ড্র নয়, ৩-০ গোলে জিতেই প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দ উদযাপন করে রাজশাহী। ৪৭ মিনিটে ম্যাচের প্রথম গোলটিই আসে আলপির পা থেকে।
২০২৪৩-২৪ মৌসুমের লিগে সিরাজ স্মৃতি সংসদের হয়ে খেলেছিলেন আলপি। সেটাই ছিল তার প্রথম লিগে খেলা। সেবার ১১ গোল করে আলপি আরও চার জনের সঙ্গে মিলিতভাবে হয়েছিলেন তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। ওই লিগে আলপির ক্লাব পঞ্চম হয়েছিল।
লিগে দুই মৌসুম খেলে আলপির মোট গোলসংখ্যা ৪১, যা অলটাইম টপ টেনে তাকে নিয়ে গিয়ে ষষ্ঠ স্থানে।
* নারী ফুটবল লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতারা : সাবিনা খাতুন (২৫ গোল, শেখ জামাল ধানমণ্ডি, ২০১১-১২), অম্রাচিং মারমা (২৯ গোল, ঢাকা আবাহনী, ২০১২-১৩), সাবিনা খাতুন (৩৫ গোল, বসুন্ধরা কিংস ওমেন্স, ২০১৯-২০), কৃষ্ণা রানী সরকার (২৮ গোল, বসুন্ধরা কিংস ওমেন্স, ২০২০-২১), আকলিমা খাতুন (২৫ গোল, এআরবিসি স্পোর্টিং ক্লাব, ২০২১-২২), সাবিনা খাতুন (১৭ গোল, নাসরিন স্পোর্টস একাডেমি, ২০২৩-২৪), আলপি আক্তার (৩০ গোল, রাজশাহী স্টারস, ২০২৫-২৬)।
* স্পেশাল ফ্যাক্ট :
১. আকলিমা খাতুন একমাত্র টপ গোলস্কোরার, যার ক্লাব লিগ শিরোপা জেতেনি।
২. সাবিনা খাতুন সর্বাধিক ৩ বার টপ গোলস্কোরার হয়েছেন। বাকিরা কেউ একবারের বেশি হতে পারেনি।
৩. সাবিনা খাতুন একমাত্র ফুটবলার, যিনি ৩টি ভিন্ন ক্লাবের হয়ে টপ গোলস্কোরার হয়েছেন।
৪. সাবিনা খাতুন এক আসরে সর্বাধিক গোল করেছেন।
আরকে/প্রবা