বড় বোন স্মৃতির স্বপ্নপূরণে প্রথমবার জাতীয় দলে
রুমেল খান
প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৪৬ এএম
আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০২:১৭ এএম
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সোনারপাড়া।
এখানকার অধিবাসী মেডিসিন সেলার সেকেন্দার আলী প্রধান। তার স্ত্রী গৃহিণী জোৎস্না বেগম। এই
দম্পত্তির তিন মেয়ে, এক ছেলে। সালে। মেয়েদের মধ্যে দ্বিতীয় আর সবার মধ্যে তৃতীয়জন একটু
‘স্পেশাল’। কেননা সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের ক্যাম্পে ডাক পেয়েছেন
প্রথমবারের মতো। আর এই স্বপ্নটা দেখেছিলেন জাতীয় দলে ডাক পাওয়া সেই ফুটবলারের বড় বোন।
তার স্বপ্নপূরণ করতে ছোট বোন নিজের সর্বোচ্চটাই নিংড়ে দেবেন। তার নাম সুরভী আক্তার
আফরিন। ফুটবলে সৌরভ ছড়াতে চান ৫ জুন, ২০০৮ সালে পৃথিবীর আলো দেখা সুরভী। এ নিয়ে কথা
বলেছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে ।
ফুটবল
যেভাবে আকৃষ্ট হওয়া : সুরভীর বড় বোন স্মৃতি আফরিন শোভা ফুটবল খেলতেন।
বড় ভাই জুলহাস প্রধানও ফুটবলার, আর্মি (ইউনিট ডিভিশন) ফুটবল দলে খেলেন। স্মৃতির স্বপ্ন
ছিল তার বোন সুরভী অনেক বড় প্লেয়ার হবে। তখন তাদের গ্রামে এক ফুটবল কোচ ছিলেন- মো.
রায়হান। তার কাছে সুরভীকে নিয়ে যান স্মৃতি। সুরভী তখন ক্লাস টু-তে পড়েন। রায়হানের মাধ্যমে
ফুটবলে প্রথম হাতেখড়ি সুরভীর। এরপর একই গ্রামের রেজাউল করিম ও মো. রানারও কোচিং পেয়েছেন
সুরভী। তারপর স্মৃতির সহায়তায় সাভারের বিকেএসপিতে কেআইবি ক্যাম্পে ট্রায়াল দেন (কিডস
আইডেন্টিফিকেশন ব্যাচ, অর্থাৎ প্রতিভাবান শিশু ক্রীড়াবিদ বাছাই ও শনাক্তকরণ ক্যাম্প)
সুরভী। কিন্তু স্মৃতির চাওয়া ছিল সুরভী যেন আর্মিতে ভর্তি হন, তাই সুরভীকে বিকেএসপিতে
ভর্তি হতে দেননি। সুরভী বলেন, ‘আপু আমাকে অনেক কেয়ার করে। সবসময় বলে, ‘তোমাকে অনেক
বড় প্লেয়ার হতে হবে। তোমার নিজের যোগ্যতায় জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে হবে।’ 
যাদের
অবদান : সুরভী এগিয়েছেন ধাপে ধাপে। স্কুল, গ্রাম, থানা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে
ফুটবল খেলেছেন। ভালো খেলার সুবাদে ততদিনে ছড়িয়ে পড়েছে তার নাম। বাকি ছিল লিগে খেলা।
নারী ফুটবল লিগে কুমিল্লা ইউনাইটেড ক্লাবে চুক্তিবদ্ধ হয়ে সেটাও পূরণ হয়। সেটা ২০২১-২২
সাল। তারপর যোগ দেন বাংলাদেশ আর্মি স্পোর্টস ফুটবল ক্লাবে (২০২৩)। তখন মাত্রই ক্লাবটি
গঠন করা হচ্ছে। সেখানে কোচ ছিলেন জাতীয় নারী ফুটবল দলের সাবেক ও জীবন্ত কিংবদন্তী কোচ
গোলাম রব্বানী ছোটন। তবে পরের মৌসুমে ছোটনের পরবর্তী কোচ আনোয়ার হোসেনকে বেশি স্মরণ
করেন সুরভী, ‘আনোয়ার স্যারের টেকনিক্যাল
সাইড অনেক ভালো কোচ। তাঁর কাছে ট্রেনিং করলে প্লেয়াররা দ্রুত জাতীয় দলে চলে আসতে পারবে।
যেমনটা আমি পেরেছি। উনি অনেক ভালোমনের কোচ। ওনার কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি।’
বোনের সঙ্গে একই দলে খেলা : যার অনুপ্রেরণায়
ফুটবলে আসা, সেই বড় বোন স্মৃতির সঙ্গে আর্মি দলের হয়ে লিগে অন্ততঃ একটি ম্যাচ খেলার
স্বপ্ন দেখেন সুরভী। যদিও অনেক আগে বিকেএসপিতে একটি প্রীতি ম্যাচে বোনের সঙ্গে একই
দলে খেলেছেন তিনি, ‘কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে দুই বোনের একসঙ্গে খেলার আনন্দই
আলাদা। আশাকরি আগামীতে এই স্বপ্ন পুরণ হবে’ সুরভীর আবেগী কণ্ঠ।
বড় বোন স্মৃতি আফরিন শোভার (বায়ে) সঙ্গে সুরভী
ডিফেন্ডার
হওয়ার গল্প : শুরু থেকেই ডিফেন্সে খেলতেন সুরভী, ‘মূলত স্টপার পজিশনেই খেলি। তবে
লেফট ব্যাকেও খেলতে পারি।’মাসুরা পারভীন, শামসুন্নাহার সিনিয়র ও আঁখি খাতুনের খেলা
দেখেই ডিফেন্ডার পজিশনে খেলার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন, ‘তাঁদের খেলা দেখতে অনেক ভালো লাগতো।’
জাতীয়
দলে ডাক পাওয়া : দুই বছর আর্মিতে খেলার পর জাতীয় দলে খেলার ডাক
পান, সেটা অনুর্ধ-১৯ দলের হয়ে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি নেপাল থেকে খেলে এসেছেন সাফ অনুর্ধ-১৯
নারী চ্যাম্পিয়নশিপ। সেই আসরে রানার্সআপ হয় বাংলাদেশ। তবে সর্বপ্রথম ডাক পেয়েছিলেন
আরও আগেই। সেটা ২০১৯ সালে, অনুর্ধ-১২ দলের ক্যাম্পে। বেশ কয়েকমাস সেই ক্যাম্পেও ছিলেন।
ফিফা রেফারি ও কোচ জয়া চাকমার সঙ্গে সুরভী
নেপাল থেকে ফেরার পরই সুরভী
ডাক পেলেন সিনিয়র দলে। এ প্রসঙ্গে তার ভাষ্য, ‘কখনোও ভাবতে পারিনি এত তাড়াতাড়ি ন্যাশনাল
টিমে ডাক পাব। অনেক ভালো লাগছে। এখন আছি বাফুফের ক্যাম্পে।’
সিনিয়র দলের ক্যাম্প নিয়ে সুরভী
বলেন, ‘এখানকার ডিসিপ্লিন, সবকিছুই অনেক ভালো। কোচ পিটার বাটলার অনেক ভালো কোচ। অনুর্ধ-১৯
দলে তার অধীনে খেলেছি। আশাকরি এবার সিনিয়র দলেও তার অধীনে খেলবো। উনি অনেক যত্নবান
কোচ। সবকিছু খুব সুন্দরভাবে বোঝান নিজের মেয়ের মতো। আর আমাদের দেখেনও নিজের মেয়ের মতো।’
প্রথম
গোলের অপেক্ষায় : ডিফেন্ডাররা সাধারণত গোল করে না। ক্লাব ও বয়সভিত্তিক
জাতীয় দলে খেলে ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার সুরভীও কোনো গোল পাননি। তবে সিনিয়র দলে অন্ততঃ
একটা গোল করার স্বপ্ন দেখেন তিনি, ‘কোচ যদি অনুমিত দেন, তাহলে দল কর্নার বা ফ্রি কিক
পেলে প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে গোল করতে চাই।’
বল নিয়ে দুই বোন সুরভী ও স্মৃতি
সিনিয়র
দলে খেলে যা অর্জন করতে চান : ‘আমার স্বপ্ন জাতীয় দলের হয়ে খেলা, ভালো খেলা,
শিরোপা জেতা ও দেশের জন্য কিছু করা। এছাড়া কিছুদিনের মধ্যেই এএফসি নারী এশিয়ান কাপ
খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় যাব। সেখানে গিয়ে ট্রেনিং করা, সেরা ২৩-এ জায়গা করে নেওয়া এবং সবশেষে
প্রথম একাদশে সুযোগ পাওয়াই লক্ষ্য থাকবে আমার।’বলেন সুরভী।
প্রিয়
ফুটবলার যখন ফরোয়ার্ড : মজার ব্যাপার হচ্ছে- ডিফেন্ডার হয়েও বিশ্ব
ফুটবলে সুরভীর প্রিয় ফুটবলাররা কিন্তু কেউই ডিফেন্ডার নন, বরং তারা ফরোয়ার্ড! এই যেমন
: আর্জেন্টিনার পাওলো দিবালা, পুর্তগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালেদো এবং নরওয়ের আরলিং হল্যান্ড।
সুরভী ও স্মৃতি
পাত্তা
দেননি নিন্দুকদের কথা : সুরভীর মা-বাবা তার ফুটবল খেলা নিয়ে কখনোই
কোনো বাধা দেননি, বরং সমর্থন দিয়েছেন। তারা কেবল একটাই কথা বলেছেন, ‘আম্মু, যেখানেই
যাবে, খেলবে, আমাদের মান-সম্মানের দিকে খেয়াল রাখবে।’পরিবারের কাছ থেকে কোনো বাধার
সম্মুখীন না হলেও পাড়া-প্রতিবেশী ও আশেপাশের অনেক মানুষের কাছ থেকে বাঁকা মন্তব্য শুনতে
হয়েছে সুরভীকে, ‘অনেকে অনেক কথাই বলেছে। যেমন : মেয়ে মানুষ হয়ে খেলাধুলা করে কেন, এটা
কেমন কথা? এরা তো বাসায় থাকবে, পড়ালেখা করবে, তারপর বিয়ে দিয়ে দেবে। যখন আপুর আর্মিতে
চাকরি হলো, তখন সবার এসব কথা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল। আর এখন আমিও আর্মি দলে খেলি।
জাতীয় দলে ডাক পেয়েছি। এখন সেসব সমালোচরাই বাসায় আমাদের দেখতে আসে। তারা অনেক খুশি
এখন!’ খুশি সুরভীর মা-বাবাও। তারা কল্পনাই করতে পারেননি তাদের মেয়েটা এত অল্প বয়সে
চাকরি করবে, জাতীয় দলে ডাক পাবে।
উপসংহার
: মা-বাবার সমর্থন এবং বড় বোনের উৎসাহ-অনুপ্রেরণায় ধীরে ধীরে ফুটবলের
যাত্রাপথে এগিয়ে যাওয়া সুরভী আগামী এই খেলায় কতটা সৌরভ ছড়াতে পারবেন, সেটা সময়ই বলে
দেবে।
আরকে/প্রবা