প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:১০ পিএম
আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:১১ পিএম
পেশাদারত্বÑ এই শব্দটি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) মুখে সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবতায় সেই পেশাদারত্বের চর্চা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে। নারী এশিয়া কাপের মতো ঐতিহাসিক টুর্নামেন্টের দল ঘোষণার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই জাতীয় নারী দলের পূর্ণাঙ্গ স্কোয়াড সামাজিক মাধ্যম ও ফুটবলাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছেÑ যা নিঃসন্দেহে ফেডারেশনের ব্যবস্থাপনা কাঠামোর বড় ধরনের দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো নারী এশিয়া
কাপে অংশ নিতে যাচ্ছÑ এই অর্জন নিজেই গর্বের। এমন একটি ঐতিহাসিক মঞ্চে অংশগ্রহণের দল
তালিকা হওয়ার কথা ছিল আনুষ্ঠানিক, পরিকল্পিত ও মর্যাদাপূর্ণ ঘোষণার মাধ্যমে। কিন্তু
বাস্তবে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। ২৬ জন ফুটবলার ও কোচিং স্টাফের তালিকা বাফুফে সভাপতি
তাবিথ আউয়ালের চূড়ান্ত অনুমোদনের আগেই বিভিন্ন মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমনকি গণমাধ্যমেও
প্রকাশিত হয়েছে।
দল ফাঁসের সংস্কৃতি বাফুফের জন্য
নতুন নয়। ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলারের দায়িত্বকালেই বিষয়টি যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। আনুষ্ঠানিক
ঘোষণার আগেই স্কোয়াড সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে বারবার। অথচ নারী ফুটবল দলের তালিকার
সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজনÑ কোচ বাটলার ও নারী উইংয়ের
দুয়েকজন কর্মকর্তা ছাড়া কেউ নন। তবুও কীভাবে বারবার এই তথ্য ফাঁস হচ্ছে, তার স্পষ্ট
কোনো ব্যাখ্যা নেই বাফুফের কাছে, নেই কার্যকর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থাও।
ফাঁস হওয়া তালিকায় রয়েছে সুইডেনপ্রবাসী
ফুটবলার আনিকার নাম। ঢাকায় স্বল্প সময়ের ট্রায়াল দিতে এসে এক সপ্তাহেরও কম অনুশীলন
করে তিনি দেশে ফিরে যান। সে সময় কোচ বাটলার ছিলেন নেপালের পোখরায় অনূর্ধ্ব-১৯ দল নিয়ে।
অর্থাৎ আনিকাকে সরাসরি দেখার সুযোগই পাননি তিনি। অথচ এই সীমিত মূল্যায়নের মধ্যেই তাকে
রাখা হয়েছে চূড়ান্ত স্কোয়াডে। বিপরীতে সাবেক অধিনায়ক সাবিনা খাতুন, কৃষ্ণা রাণী সরকার,
মাসুরা পারভীনের মতো পরীক্ষিত ও অভিজ্ঞ ফুটবলারদের কয়েকটি সেশন দেখার প্রয়োজনও মনে
করেননি কোচ বাটলারÑ যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও যুক্তিবোধ নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।
প্রক্রিয়াগত দিক থেকেও বাফুফের
অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ। বিদেশ সফরের আগে নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ফেডারেশনকে জাতীয় ক্রীড়া
পরিষদে (এনএসসি) সরকারি আদেশের জন্য আবেদন করতে হয়, যার সঙ্গে খেলোয়াড় নির্বাচনের ভিত্তিসহ
প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সংযুক্ত থাকার কথা। নারী এশিয়া কাপের ক্ষেত্রেও বাফুফে আবেদন করেছে।
তবে এনএসসির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মৌখিকভাবে
খেলোয়াড় নির্বাচনের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হলেও বাফুফে তা সরবরাহ করেনিÑ ‘কোচের সিদ্ধান্ত’
অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে গেছে।
ফুটবলে দল নির্বাচন কোচের এখতিয়ারÑ
এ নিয়ে বিতর্ক নেই। কিন্তু সেই ক্ষমতার ব্যবহার যখন ব্যক্তিগত দূরত্ব, পেশাদার সম্পর্কের
সংকট ও ‘ইগো রাজনীতি’র ছায়ায় পড়ে, তখন সেটি আর কেবল ট্যাকটিক্যাল সিদ্ধান্ত থাকে না,
তা হয়ে ওঠে কাঠামোগত সমস্যা। কোচ বাটলারের সঙ্গে সাবিনা-কৃষ্ণা-মাসুরাদের সম্পর্কের
টানাপড়েনের কারণেই তারা দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরেÑ এমনটাই ফুটবলাঙ্গনের প্রচলিত ধারণা।
অথচ এশিয়া কাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পারলে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকের দরজায় কড়া নাড়ার
সুযোগ তৈরি হয়। সেই বাস্তবতায় অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত খেলোয়াড়দের ন্যূনতম মূল্যায়ন না করাকে
অনেকেই দেখছেন দলের বৃহত্তর স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলোÑ জাতীয়
ক্রীড়া পরিষদের লিখিত নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকরভাবে অনুসরণ না করা। ২০২৫
সালের ৯ অক্টোবর পরিচালক ক্রীড়া আমিনুল এহসানের স্বাক্ষরিত চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল,
ফ্লাইটের অন্তত দশ দিন আগে প্রস্তাব পাঠাতে হবে এবং যে ভিত্তিতে ক্রীড়াবিদদের নির্বাচন
করা হয়েছে তার ডকুমেন্ট সংযুক্ত করতে হবে। লিখিত নির্দেশনার পাশাপাশি মৌখিকভাবেও তথ্য
চাওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই তথ্য বাফুফে সরবরাহ করেনি।
সব মিলিয়ে নারী এশিয়া কাপ স্কোয়াড ঘিরে এই পুরো প্রক্রিয়া শুধু একটি দল ঘোষণার গল্প নয়Ñ এটি বাফুফের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, পেশাদারত্বের দাবি এবং ব্যবস্থাপনা কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। মাঠের লড়াইয়ের আগেই প্রশাসনিক ব্যর্থতায় বিতর্কে জড়িয়ে পড়া কোনোভাবেই একটি ঐতিহাসিক যাত্রার জন্য শুভ বার্তা নয়।
আরকে/প্রবা