প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৩৪ পিএম
আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৫৬ পিএম
বার্ধক্যে এবং তারুণ্যে রণজিৎ দাস
স্বাধীনতার
পর বাংলাদেশের ফুটবলের সেরা গোলরক্ষক হিসেবে সান্টু, মহসিন কিংবা আমিনুলদের নাম ঘুরেফিরে
এলেও স্বাধীনতার আগের যুগে যিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সেই রণজিৎ দাস (৯৩) আর নেই।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সকালে সিলেটের একটি হাসপাতালে হৃদরোগে মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, চার মেয়ে, এক
ছেলেসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন। কিংবদন্তী এই ফুটবলার, হকি খেলোয়াড়,
সাবেক কোচ, ক্রীড়া সংগঠক, রাষ্ট্রীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত (২০০৭) ক্রীড়াবিদের মহাপ্রয়াণে
গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন ও বাংলাদেশ
অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনসহ আরও অনেক ক্রীড়া সংগঠন। 
বয়স
তাঁকে কাবু করে ফেলেছিল। কয়েকে বছর ধরে কানে শুনতেন না। চলাফেরা ছিল সীমিত। বেশিরভাগ
সময় সিলেট শহরে করের পাড়ার বাসায় সময় কাটতেন। তাঁর ‘রণজিৎ’ নামের অর্থ ছিল রণে (যুদ্ধে)
জেতে যে। কিন্তু জীবনের রণে আর জিততে পারেননি তিনি। মৃত্যুর কাছে হার মেনে কাছের মানুষদের
কাঁদিয়ে পরলোকে পাড়ি জমিয়েছেন। সিলেট থেকে রণজিৎ দাসের ছেলে রাজীব দাস সংবাদ মাধ্যমকে
জানান, ‘আমার বাবা ভোর ৪টার দিকে হার্ট অ্যাটাক করেন। এর কয়েক ঘণ্টা পরই সকালে মারা
যান।’
হঠাৎ
অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ৩১ জানুয়ারি রণজিৎকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল এবং পরে আইসিইউতে
স্থানান্তর করা হয়। গত রবিবার তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করলেও রাতে আবার হার্ট অ্যাটাক
করেন। তাঁকে সিলেটের তালিবন্দর শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
রণজিৎ
১৯৫৫-১৯৬১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ফুটবল দলের হয়ে সুনামের সঙ্গে খেলেছেন।
এছাড়া গোলরক্ষক হিসেবে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ইস্পাহানী ক্লাব, আজাদ স্পোর্টিং
এবং মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। ফুটবলের পাশাপাশি হকিতেও তিনি ছিলেন
চৌকষ। তবে ফুটবলার হিসেবেই খ্যাতি পেয়েছেন বেশি। ঢাকায় হকি লিগে খেলেছেন ১৯৬৫-৭০ সাল
পর্যন্ত। ফুটবলে আইএফএ শিল্ডে ত্রিপুরা একাদশ ও ঢাকা মোহামেডানের জার্সি পরার অভিজ্ঞতা
আছে। কলকাতা মোহামেডানের হয়ে দিল্লীতে খেলেছেন ঐতিহ্যবাহী টুর্নামেন্ট ডুরান্ড কাপে।
উচ্চতা (৫ ফুট ৪ ইঞ্চি) কম বলে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে কখনো ডাক পাননি। এই আক্ষেপ
আজীবন বয়ে বেরিয়েছেন।
১৯৫৮
সালে রণজিৎ দাসের অধিনায়কত্বে ঢাকা ফুটবল লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব।
সেটা ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা-স্মরণীয় মুহূর্ত। হকিতে অধিনায়ক ছিলেন পূর্ব
পাকিস্তান দলে। ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের পর খেলেছেন সোনালী ব্যাংকে। দেশ স্বাধীন
হওয়ার পর সিলেট দলের অধিনায়ক ছিলেন। খেলোয়াড়ী জীবন শেষে তিনি পূর্ব পাকিস্তান যুব দল
এবং আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের কোচ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
অসামান্য
রিফ্লেক্স এবং সাহসিকতা তাঁকে সমসাময়িক সেরা গোলরক্ষকদের কাতারে নিয়ে গিয়েছিল। এছাড়া
ক্রিকেটেও তার বিশেষ পদচারণা ছিল। অবসরের পর তিনি সিলেটের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন ফুটবলার
তৈরির কারিগর হিসেবে কাজ করেন। দেশের অনেক নামী ফুটবলার তার হাত ধরেই উঠে এসেছেন।
খেলাধুলার
পাশাপাশি একজন ক্রীড়াসংগঠক হিসেবেও রণজিৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশ ফুটবল
ফেডারেশন ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সভাপতি, পূর্ব পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশন ঢাকার
নির্বাহী কমিটির সদস্য, ঢাকার আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের ফুটবল সম্পাদক ও কোচ, পূর্ব পাকিস্তান
যুব ফুটবল দলের কোচসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ‘ক্রীড়াঙ্গনের ফেলে আসা
দিনগুলো’ (২০২৫) নামে তাঁর একটি স্মৃতিচারণমূলক বইও প্রকাশিত হয়েছে।
আরকে/প্রবা