রুমেল খান
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৩২ পিএম
আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০২:০৬ এএম
যেমনটা ভাবা হয়েছিল, তেমনটাই হয়েছে।
সাফ অনুর্ধ-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে টুর্নামেন্টের ও নিজেদের প্রথম ম্যাচে উদ্ভাসিত
সূচনা করেছে বর্তমান শিরোপাধারী বাংলাদেশ। শনিবার (৩১ জানুয়ারি) দিনটা যেন প্রতিপক্ষ ভুটান দলের জন্য
আসলেই ছিল ‘শনিময়’। কেননা এদিন তারা নেপালের পোখারার রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত
‘একতরফা’ ম্যাচে বলতে গেলে গো-হারা হেরেছে। তাদের জালে বাংলাদেশ গুণে গুণে বল ঢুকিয়েছেন
ডজনখানেক (১২-০)! ম্যাচে জয়ী দলের হয়ে হ্যাটট্রিক করেন তিন ফুটবলার মুনকি আক্তার, তৃষ্ণা
রানী ও আলপি আক্তার। বড় জয়ে শিরোপা ধরে রাখার মিশনটা দুর্দান্তভাবেই শুরু করল বাংলার
বাঘিনীরা। দিনের অপর ম্যাচে ভারত ১-০ গোলে স্বাগতিক নেপালকে হারায়।
ম্যাচে বাংলাদেশ যেভাবে মুড়িমুড়কির
মতো গোল করেছে, তাতে খেলার প্রথম ২৭ মিনিট পর্যন্ত ভুটানের কোনো গোল হজম না করাটাকে
বিস্ময়করই বলতে হবে। এজন্য তাদের গোলকিপিং ও ডিফেন্ডিংকে কৃতিত্ব দিতেই হবে। বাংলাদেশের
একের পর এক আক্রমণ দৃঢ়ভাবে রুখে দেয় তারা। কিন্তু একসময় বাংলাদেশের আক্রমণের তোড়ে ভেঙ্গে
যায় তাদের সব প্রতিরোধ। তাসের ঘরের মতো তছনছ হয়ে যায় রক্ষণদুর্গ। একের পর এক গোল হজম
করতে করতে একসময় ভুটানি দলের অবস্থাটা এমনই হয়ে যায় যেন তাদের অবস্থাটা হয় ‘ছেঁড়ে দে
মা, কেঁদে বাঁচি’র মতো! কিন্তু তাই বলে প্রতিপক্ষকে একবিন্দু ছাড় দেয়নি পিটার বাটলারের
শিষ্যারা। দেয়াননি কোনো দয়ামায়া। বরং দ্বিগুণ উৎসাহে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুর্হূমুর্হ আক্রমণে,
পেয়ে বসে গোলের নেশায়। নিজেদের জাল থেকে বল কুড়াতে কুড়াতে রীতিমতো যেন কাহিল হয়ে যায়
ভুটান! বাংলাদেশের আরও কিছু গোলপ্রচেষ্টা ব্যর্থ না হলে এক ডজন নয়, গোলসংখ্যা ‘চার
হালি’-ও হতে পারতো! 
এই ম্যাচের পর ফেসবুকে বাংলাদেশের কিছু
ফুটবলপ্রেমী মজার কিছু মন্তব্য করেন। যেমন : মাহমুদুল হাসান লেখেন, ‘ভুটানের কোচ সহ-খেলোয়ার
সহ সবাই জনপ্রতি একটা করে পেল।’ মো. রুবেল লেখেন, ‘মেয়েরা গোল করা শিখছে, কিন্তু সেলিব্রেশনের
একটু ঘাটতি রয়ে গেছে!’ রায়হান আহমেদ লেখেন, ‘বেশি না এক ডজন অনলি!’ সাঈদ ইসলাম লেখেন,
‘প্রতিপক্ষ খেলতে গেছে, নাকি দর্শকের ভুমিকা পালন করছে?’ মাহফুজ শাহরিয়ার গাজী লেখেন,
‘অভিনন্দন ভুটান। তাদের কেউ কোন গোল খেতে পায়নি, এই অভিযোগ কেউ করতে পারবে না!’ মেঘলা
লেখেন, ‘এরা সবাই কি শুরু করসে রে ভাই, যাকেই দেই ১০/১২টা ধরাই দেই।’
ম্যাচের ২৮ মিনিটে ‘গোলের হালখাতা’
খোলে বাংলাদেশ। আলপির শট এক ডিফেন্ডার কর্নারের বিনিময়ে বিপদমুক্ত করেন। কর্নার থেকে
দৃষ্টিনন্দন বাঁকানো শটে সরাসরি জাল খুঁজে নেন মামনি। করেন ‘অলিম্পিক গোল’ (১-০)। ৪৩
মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে বাংলাদেশ। সৌরভী আকন্দ প্রীতির আড়াআড়ি ক্রস মামনি ঠিকঠাক
শট নিতে না পারলেও গোলমুখে বল পেয়ে যান তৃষ্ণা রানী। ফাঁকা পোস্টে বল ঠেলে দেন তিনি
(২-০)। এই গোলের রেশ থাকতেই ৪৪ মিনিটে পুজা দাসের ফ্লিকে বল পেয়ে মুনকি ব্যবধান বাড়ান
আরও (৩-০)।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে (৪৫+৩ মিনিট)
পুজার ক্রস বক্সে দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পায়ের কারিকুরিতে জায়গা করে নিয়ে বাঁ পায়ের
শটে স্কোরলাইন ৪-০ করেন মুনকি।
বিরতির পর আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে বাংলাদেশ।
৫৪ মিনিটে ডান পায়ের চমৎকার কৌনিক শটে তৃষ্ণা লক্ষ্যভেদ (৫-০)। ৬০ মিনিটে গোলরক্ষকের
বাজে ভুলে ষষ্ঠ গোলটি হজম করে ভুটান। দুর্বল কিকে তৃষ্ণার পায়ে বল তুলে দেন তিনি, বক্সের
একটু বাইরে পাওয়া এমন সুযোগ চিপ শটে কাজে লাগিয়ে হ্যাটট্রিক পূরণ করেন এই ফরোয়ার্ড
(৬-০)।
৭২ মিনিটে ভুটানের এক ডিফেন্ডার বল
বিপদমুক্ত করতে ব্যর্থ হলে তার সঙ্গে সেঁটে থাকা আলপি বাম পায়ের কৌনিক শটে গোল করেন
(৭-০)। ৮০ মিনিটে সতীর্থের থ্রু পাস ধরে একক প্রচেষ্টায় অনেকটা এগিয়ে গোলরক্ষককের পাশ
দিয়ে বল জালে পাঠিয়ে হ্যাটট্রিক পূরণ করেন মুনকি (৮-০)।
৮৬ মিনিটে বক্সে ক্রস বাড়ান জয়নব বিবি
রিতা। ফাঁকায় থাকা আলপি ডান পায়ের প্লেসিং শটে লক্ষ্যভেদ করেন (৯-০)। দ্বিতীয়ার্ধের
যোগ করা সময়ে আরও তিন গোল করে বাংলাদেশ। মুনকি নিজের চতুর্থ গোলটি (১০-০) করার পর
অধিনায়ক অপির্তা বিশ্বাস গোলের খাতায় নাম তোলেন (১১-০)। অন্তিম সময়ে হ্যাটট্রিক পূরণ
করেন বাংলাদেশ নারী ফুটবল লিগে গোলের বন্যা
বইয়ে দেওয়া আলপি (১২-০)।
শেষ পর্যন্ত রেফারি খেলা শেষের বাঁশি
বাজালে একক আধিপত্যের ম্যাচে বড় জয় কুড়িয়ে নেওয়ার চিত্তসুখ নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ।
রাউন্ড রবিন লিগে সোমবার নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে ভারতের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ।
চার জাতির এই টুর্নামেন্টে (লিগভিত্তিক)
পয়েন্ট টেবিলে শীর্ষ দুই দল ৭ ফেব্রুয়ারি ফাইনালে লড়বে।
সাফ পরিসংখ্যানে অনূর্ধ্ব-১৮, ১৯ ও
২০ পর্যায়ে এ পর্যন্ত ৬টি টুর্নামেন্টের ৫টিতেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে
ঢাকায় সর্বশেষ সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ চ্যাম্পিয়ন হয়। গত বছর ঢাকায়
সাফ অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবলেও চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। এবারও মুকুট ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়েই
মিশন শুরু করেছে লাল-সবুজের মেয়েরা।
ম্যাচসেরা তৃষ্ণা রানী বলেন, ‘অনেক
ভালো লাগছে। সতীর্থদের ধন্যবাদ। ওদের জন্যই প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ হতে পেরেছি। কোচকেও
ধন্যবাদ। সবার দোয়া-আশীর্বাদেই এই সাফল্য। বাংলাদেশের সকল সমর্থকদের ধন্যবাদ। চ্যাম্পিয়ন
হয়ে দেশে ফিরতে চাই।’
আরকে/প্রবা