রুমেল খান
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৮ এএম
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৯ এএম
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ২৫ জনুয়ারি হুয়া মাক ইনডোর স্টেডিয়ামে সিঙ্গেল লিগভিত্তিক আসরে নিজেদের শেষ ম্যাচে মালদ্বীপকে রেকর্ড ১৪-২ গোলে হারিয়ে অপরাজিত থেকেই সাফ ফুটসালের শিরোপা জিতেছে বাংলার বাঘিনীরা।
‘শোনো নারী/তুমি চাইলেই পারো সব/চোখ বুজে কেন?/কেন রবে মুখ চেপে আঁচলে/তোমরাই তো জলতরঙ্গে সুর-তাল-লয় এনেছো’ ...যেখানে পুরুষরা ব্যর্থ, সেখানে নারীরা সফল্যের শিখরে। সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে টানা দুটি শিরোপা বাংলাদেশকে এনে দিয়েছিলেন অধিনায়ক সাবিনা খাতুন। এবার তার অধিনায়কত্বে প্রথম সাফ ফুটসালের শিরোপাও জিতেছে লাল-সবুজের মেয়েরা।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে রবিবার হুয়া মাক ইনডোর স্টেডিয়ামে সিঙ্গেল লিগভিত্তিক আসরে নিজেদের শেষ ম্যাচে মালদ্বীপকে রেকর্ড ১৪-২ গোলে হারিয়ে অপরাজিত থেকেই শিরোপা জিতেছে বাংলার বাঘিনীরা। সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের (সাফ) সভাপতি কাজী মো. সালাউদ্দিনের হাত থেকে চ্যাম্পিয়ন ট্রফিটি গ্রহণ করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক সাবিনা খাতুন।
সাত দলের টুর্নামেন্টে ৫ জয় এবং এক ড্রয়ে ১৬ পয়েন্ট বাংলাদেশের। ১২ পয়েন্ট পেয়ে ভারত রানার্সআপ এবং ১১ পয়েন্ট পেয়ে ভুটান হয়েছে তৃতীয়। টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ মোট ৩৮ গোল করার বিপরীতে হজম করে মাত্র ৯টি। একমাত্র ভুটানের বিপক্ষেই ড্র (৩-৩) তাদের।
এর আগে ভারতকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু, এরপর নেপালকে ৩-০, শ্রীলঙ্কাকে ৬-১ এবং পাকিস্তানকে ৯-১ গোলে হারানোর পর শেষ ম্যাচে মালদ্বীপকে আরও বড় ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সাফ ফুটসালের মুকুট পরলেন সাবিনারা।
গত ২৩ জানুয়ারি ভারত-ভুটান ম্যাচ ড্র হলে সাবিনারা রবিবার ম্যাচের আগেই শিরোপা জিততে পারতেন। ওই ম্যাচে ভুটান জেতায় শিরোপা নিশ্চিত করতে নিজেদের শেষ ম্যাচ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। নারী ফুটসালে মালদ্বীপ সবচেয়ে দুর্বল শক্তির দল। ফলে বাংলাদেশের জয় অনুমেয়ই ছিল। টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত খেলা বাংলাদেশ দলের গোলরক্ষক স্বপ্না আক্তার ঝিলি ছিলেন অনবদ্য।
রবিবারের ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য ছিল ‘অঘোষিত ফাইনাল’। ড্র করলেই চলত, কিন্তু বিশাল জয়ের উৎসব করেছেন লিপি-মেহেনুররা। আর তাতে প্রথম সাফ নারী ফুটসালে চ্যাম্পিয়ন দলের তকমাটি নিজেদের করে নিয়েছে বাংলাদেশ।
ম্যচের প্রথমার্ধে ৬-১ গোলে এগিয়ে থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে প্রতিপক্ষের জালে আরও ৮ গোল দেয় বাংলাদেশ। হ্যাটট্রিকসহ সর্বোচ্চ ৪ গোল করেন অধিনায়ক সাবিনা। টুর্নামেন্টে ১৪ গোল নিয়ে শেষ করলেন ফুটবলে দেশের জার্সিতে দুটি সাফ জেতা কিংবদন্তি এই ফুটবলার। প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ গোল করে জিতেছেন সেরা গোলদাতার পুরস্কার। বড় জয়ে হ্যাটট্রিক করেন লিপি আক্তারও। জোড়া গোল করেন কৃষ্ণা রানী সরকার। ১টি করে গোল পান মাসুরা পারভীন, নওশন জাহান নিতি, সুমাইয়া মাতসুশিমা, নিলুফা ইয়াসমিন নিলা ও মেহেনুর আক্তার।
অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া ছোট ছোট একাধিক পোস্টে অধিনায়ক সাবিনা তুলে ধরেন নিজের অনুভূতি। মালদ্বীপ ম্যাচ শুরুর আগে সাবিনা পোস্ট করেন, ‘একটা লড়াই বাকি। সব হৃদয় (একসাথে), কোনো ভয় নেই। বাংলাদেশ বনাম মালদ্বীপ। বাংলাদেশ সময় ১০টায় (খেলা)। আমাদেরকে প্রার্থনায় রাখবেন।’ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর তিনটি পোস্টের একটিতে তিনি লেখেন ‘আলহামদুলিল্লাহ’, অন্যটিতে ‘আল্লাহ মহান’, আরেকটিতে পোস্ট করেছেন টিম বাসে করে হোটেলে ফেরার মুহূর্ত। সেখানে ‘চ্যাম্পিয়ন-চ্যাম্পিয়ন : বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন’।
২০১৮ সালে ফুটসালে বাংলাদেশের মেয়েদের পথচলা শুরু। সে বছর কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের অধীনে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেয় বাংলাদেশ নারী ফুটসাল দল। এরপর দীর্ঘ ছয় বছর কার্যক্রম বন্ধ ছিল। গত বছরের শেষদিকে বাফুফে নতুন করে দল গঠন শুরু করে। প্রথমবারের মতো সাফ নারী ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপ সামনে রেখে দেশে ও দেশের বাইরে অনুশীলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে এই চ্যাম্পিয়ন দল।
মেয়েদের পাশাপাশি ব্যাংককে চলছে ছেলেদের প্রথম সাফ ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপও। ৫ ম্যাচে ১৫ পয়েন্ট নিয়ে শিরোপা নিশ্চিত করেছে মালদ্বীপ। বাংলাদেশ ৬ ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে পঞ্চম হয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করেছে।
বাংলাদেশ নারী ফুটসাল দলের ঐতিহাসিক সাফল্যে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পাঠানো এক অভিনন্দন বার্তায় বিষয়টি জানানো হয়।
অভিনন্দন বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সাফ নারী ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে শিরোপা অর্জন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য গৌরবের। এই সাফল্য বাংলাদেশের নারী ক্রীড়াবিদদের অদম্য মনোবল, পরিশ্রম ও সক্ষমতার উজ্জ্বল প্রমাণ।
প্রধান উপদেষ্টা বিজয়ী দলের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এই অর্জন দেশের তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলায় আরও উৎসাহিত করবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবে। ভবিষ্যতেও নারী ক্রীড়াবিদদের ধারাবাহিক সাফল্য কামনা করেন প্রধান উপদেষ্টা।
বাংলাদেশ দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল, ‘বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে তাদের ফুটসাল যাত্রা শুরু করেছে। আমাদের পুরুষ ও নারী দল বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের দেশে প্রতিভা এবং জয়ের মানসিকতা রয়েছে।’
২০২৪ সালের অক্টোবরে দ্বিতীয়বার সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কয়েকদিন পরই বাফুফেতে দায়িত্ব নেয় তাবিথ আউয়ালের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিটি। এই কমিটির প্রথম সভা বসেছিল ৯ নভেম্বর ২০২৪। ওই সভায় বাফুফে সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য সাবিনাদের দেড় কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। কিন্তু আজও সেই পুরস্কার পায়নি মেয়েরা।
বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে দল থেকে বাদ পড়েন সাবিনা, মাসুরা, কৃষ্ণা, সুমাইয়া ও নীলারা। এখন সাফ ফুটসালের শিরোপা জেতার পর বাটলার তাদের আবারও দলে ফেরান কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
গত বছর নভেম্বরে বাফুফে সভাপতি তাবিথ বলেছিলেন, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ২০২৪ সাফজয়ী মেয়েদের পুরস্কার দিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু অদ্যাবধি সেই পুরস্কারের দেড় কোটি টাকা পায়নি নারী ফুটবলাররা। এদিকে সাবিনারা এরই মধ্যে জিতলেন আরেকটি সাফ। এবার কি সাবিনারা পুরস্কারের টাকা বুঝে পাবেন? নাকি আরেকটি সাফ জিততে হবে তাদের?