বিশৃঙ্খলার কারণে আয়োজক শতদ্রু গ্রেফতার, গণ্ডগোলের মূলে দুই মন্ত্রীর ‘মেসি দখলের’ লড়াই
প্রবা স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:৫৯ পিএম
দুজনে
ভিন্ন ভিন্ন খেলার খেলোয়াড় হলেও উভয়েই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সেরা। দুজনেই ক্যারিয়ার-সায়াহ্নে
জিতেছেন পরম আরাধ্য সোনালী বিশ্বকাপের ট্রফি। দুজনেই ১০ নম্বর জার্সি পড়েন। একজন আর্জেন্টিনার
লিওনেল মেসি, অন্যজন শচীন টেন্ডুলকার। সর্বকালের সেরা ফুটবলার মেসি এখন ভারত সফরে।
রবিবার (১৪ ডিসেম্বর) মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ক্রিকেট কিংবদন্তী টেন্ডুলকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ
ঘটে আর্জেন্টাইন মহাতারকা মেসির। ক্রিকেট ও ফুটবলের দুই আইকনের এই সাক্ষাৎ মুহূর্তে
রূপ নেয় এক স্মরণীয় দৃশ্যে।
ভারত
সফরের দ্বিতীয় দিনে মুম্বাইয়ে এসে এক অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী হন মেসি। যে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম
ভারতের ক্রিকেট ঈশ্বর শচিন টেন্ডুলকারের হোমগ্রাউন্ড হিসেবে পরিচিত, সেই ক্রিকেটের
মক্কাতেই ফুটবল খেললেন বিশ্বসেরা এই ফুটবলার। এই দৃশ্যই রবিবার সন্ধ্যায় মুগ্ধ করেছে
হাজারো দর্শককে।
২০২২
বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ও আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী মেসি ‘গোট ইন্ডিয়া ট্যুর’-এর
অংশ হিসেবে কলকাতা ও হায়দরাবাদ ঘুরে এবার পৌঁছান মুম্বাইয়ে। ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে পৌঁছাতেই
‘মেসি-মেসি’ ধ্বনিতে গর্জে ওঠে গ্যালারি। তার সঙ্গে ছিলেন তার দুই ইন্টার মায়ামির সতীর্থ
লুইস সুয়ারেজ ও রদ্রিগো ডি পল।
ওয়াংখেড়ের
সবুজ ঘাসে নেমে মেসি শুধু উপস্থিতই ছিলেন না, অংশ নেন নানা ফুটবল কার্যক্রমেও। প্রদর্শনী
ম্যাচে একটি পেনাল্টি গোল করেন তিনি। পরে বল কিক করে পাঠান গ্যালারিতে—নিচের
স্তরের দর্শকদের পাশাপাশি উপরের টিয়ারের দর্শকদের দিকেও বিশেষভাবে বল পাঠাতে দেখা যায়
তাকে, যা উপস্থিত ভক্তদের উচ্ছ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়।
এদিন
ওয়াংখেড়েতে অনুষ্ঠিত হয় তারকাসমৃদ্ধ ৭ বনাম ৭ একটি প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ। ‘ইন্ডিয়ান
স্টারস’ ও ‘মিত্রা স্টারস’-এর মধ্যকার ম্যাচে অংশ নেন সাবেক ভারতীয় ফুটবল অধিনায়ক সুনীল
ছেত্রী, নারী ফুটবল দলের সাবেক তারকা বালা দেবী, রাহুল ভেকে, ইব্রাহিম আলি খানসহ বলিউড
অভিনেতা টাইগার শ্রফ, জিম সার্ভ, ডিনো মোরিয়া ও পার্থ জিন্দাল। ম্যাচে হেডারে গোল করে
মিত্রা স্টারসকে এগিয়ে দেন সুনীল ছেত্রী। পরে বালা দেবীর সহায়তায় ইন্ডিয়ান স্টারস সমতা
ফেরালেও শেষ পর্যন্ত ২–১ ব্যবধানে এগিয়ে থাকে মিত্রা স্টারস।
ম্যাচের
ফাঁকে মেসি, সুয়ারেজ ও পলকে তরুণী ফুটবলারদের সঙ্গে রন্দো অনুশীলনে অংশ নিতেও দেখা
যায়। মহারাষ্ট্রের উঠতি ফুটবলারদের জন্য এটি ছিল ‘জীবনের একবারের অভিজ্ঞতা’—বিশ্ব
ফুটবলের কিংবদন্তিদের সঙ্গে একই মাঠ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ।
ভারতে
মেসিকে আনেন শতদ্রু দত্ত। মেসির সঙ্গে শনিবার কলকাতা ছেড়ে হায়দ্রাবাদ চলে যাওয়ার কথা
ছিল শতদ্রু দত্তের। তবে তার আগেই সিআইএসএফ ও পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। রবিবার
তাকে বিধাননগর মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়। শুনানি শেষে আদালত শতদ্রুকে ১৪ দিনের পুলিশ
হেফাজতের নির্দেশ দেন। তাকে আদালতে হাজির করার সময় কোর্ট চত্বরে বিক্ষোভ করে বিজেপি।
শতদ্রুর
বিরুদ্ধে স্বপ্রণোদিত মামলা রুজু করে কলকাতা পুলিশ। বিধান নগর দক্ষিণ থানায় মামলার
দায়ের হয়। অশান্তি সৃষ্টি, ভাঙচুর, হিংসা ছড়ানো, নাশকতামূলক কার্যকলাপ এবং জনগণের
নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বিভিন্ন ধারায় মামলা করা হয়
শতদ্রুর বিরুদ্ধে। এছাড়াও এমপিও বা মোটর ভেহিকলস আইন ও পিডিপিপি আইন এও মামলা হয়।
কলকাতা
পুলিশের তরফে ডিজিপি রাজীব কুমার জানিয়েছেন, গোটা ঘটনার তদন্তে একটি সরকার-নিযুক্ত
কমিটি গঠন করা হবে। শনিবার কলকাতা শহরে পা রাখেন লিওনেল মেসি। তার কর্মসূচিতে মানুষে
ঠাসা। যুবভারতীতে শুধু কলকাতা নয়, রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে দর্শকরা জমায়েত হন।
এমনকি দেশের অন্যান্য রাজ্য থেকেও মেসি-প্রেমিরা সল্টলেকের যুবভারত স্টেডিয়ামে হাজির
ছিলেন।
তবে
যুবভারতীতে মেসি ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। দর্শকদের অভিযোগ, মেসিকে
ঘিরে ছিলেন ভিআইপিরা। গ্যালারি থেকে প্রায় ২০ মিনিট মেসিকে দেখা যায়নি। এই নিয়েই
ক্ষোভ জমতে থাকে। একসময় বোতল ছোড়া শুরু হয়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে,
মেসি ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা দ্রুত মাঠ ছেড়ে চলে যান। এরপরই যুব ভারতীজুড়ে ছড়িয়ে
পড়ে চরম বিশৃঙ্খলা। ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কলকাতা বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা
হয় শতদ্রু দত্তকে। ভারতীয় গণমাধ্যম বলছে, তৃণমূল কংগ্রেসের দুই মন্ত্রী সুজিত বসু
এবং অরূপ বিশ্বাসের ‘মেসি দখলের’ লড়াইয়ের কারণেই নাকি এই গোলমালের ঘটনা ঘটেছে। বিপর্যয়ের
মাত্রা এতটাই বেশি ছিল যে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রকাশ্যে
ক্ষমা চাইতে হয়। এসবের পেছনেই আছেন দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু এবং ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস।
প্রতারিত দর্শকরা এখন শতদ্রুর পাশাপাশি এই দুই মন্ত্রীকে গ্রেপ্তারের দাবিও জানাচ্ছেন।
আরকে/প্রবা