রুমেল খান
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:১৬ পিএম
সাফল্যের
জন্য চাই সঠিক পরিকল্পনা, অদম্য ইচ্ছা, একাগ্রতা, কঠোর অনুশীলন, আত্মবিশ্বাস আর ভাগ্যের
কিঞ্চিৎ পরশ। বাংলাদেশ জাতীয় অনুর্ধ-২১ হকি দলের ক্ষেত্রে এমনটাই প্রযোজ্য। গত বছর ওমানের
মাসকটে হওয়া জুনিয়র হকি এশিয়া কাপে পঞ্চম হয়েছিল বাংলাদেশ, যার সুবাদে প্রথমবার জুনিয়র
হকি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায় লাল-সবুজ বাহিনী। অভিষেক আসরেই যে বাংলাদেশ অভাবনীয়
খেলে একেবারে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে, এমনটা প্রত্যাশা করেননি কেউই। কিন্তু তাই বলে ভারতে
অনুষ্ঠিত এই আসরে বাংলার যুবারা যে একেবারেই রিক্ত হস্তে ফিরে এসেছে, সেটাও কিন্তু
হয়নি। স্থান নির্ধারণী ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ৫-৪ গোলে হারিয়ে ১৭তম স্থান অধিকার করে এবং
অর্জন করে ‘চ্যালেঞ্জার্স কাপ’-এর শিরোপা। সিনিয়র-জুনিয়র মিলিয়ে এটাই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ
হকি দলের সেরা সাফল্য। তবে বাংলাদেশের ঘরোয়া হকির স্থবিরতা-জটিলতা, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব,
আর্থিক নিশ্চয়তা না থাকা … সবমিলিয়ে এই অনুর্ধ-২১ দলের ভবিষৎ
নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। হকিপ্রেমীরা মনে করেন এখনই যদি তাদের নিয়ে সঠিক-দীর্ঘমেয়াদী
কোনো পরিকল্পনা না নেওয়া হয়, তাহলে অচিরেই এই সাফল্যই হবে দেশের হকির জন্য শেষ সুখবর!
বাংলাদেশ
হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজুল হাসান বলেন, ‘এটা দলীয় সাফল্য। সবাই কঠোর পরিশ্রম
করেছে। সবার মধ্যে একটা জেদ কাজ করেছে। হারার আগে না হারার মানসিকতাই ছেলেদের এই অর্জন
এনে দিয়েছে। এই দলকে নিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে।’
হকি
ছেড়েছেন সেই কবে, তারপরও বাংলাদেশের ঘরোয়া হকিতে প্রিমিয়ার লিগে এক মৌসুমে (১৯৯৬) সর্বোচ্চ
৪০ গোলের রেকর্ডটি এখনও রফিকুল ইসলাম কামালেরই দখলে। কামাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন,
‘তারা বাংলাদেশের পতাকা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। এতদিন আমরা দেখেছি অন্য দেশের খেলোয়াড়রা
এই কাজটি করেছ। এখন আমাদের ছেলেরা যে কাজটি করে দিয়েছে, এর চেয়ে বড় সাফল্য আমাদের হকিতে
আগে কখনো আসেনি।’
কামাল
আরও বলেন, ‘ছেলেরা যেভাবে পুরো টুর্নামেন্টটি খেলেছে, আমার মনে হয় প্রথমে কেউই এ ধরনের
আশা করেনি, যেভাবে উৎসাহ-আগ্রহও দেখায়নি টিম যাওয়ার আগ পর্যন্ত। তো, সেই হিসেবে তারা
যে ধরনের রেজাল্ট করেছে, তাতে শুধু বাংলাদেশ কেন, পুরো হকিবিশ্বই আজ হতবাক। এজন্য আমরা
গর্বিত। তাদেরকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। সেই সঙ্গে পুরো টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু
করে ফেডারেশনের বর্তমান থেকে অতীতে যারা কর্মকর্তা ও খেলোয়াড় ছিলেন, সবাইকেই অভিনন্দন
জানাচ্ছি। এই সাফল্য সবার উপভোগ করা উচিত। এটা সবার প্রাপ্য ছিল।’
দলের
প্রাণভোমরা আমিরুল ইসলামকে নিয়ে কামালের উচ্ছ্বাস, ‘আমিরুল তো “আউট অব ওয়ার্ল্ড”। সে
যদি টুর্নামেন্টের বেস্ট প্লেয়ারও হয়ে যায়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। একটা টুর্নামেন্টে
৬ ম্যাচে ৫ হ্যাটট্রিক ও ১৮ গোল … এমন আউটস্ট্যান্ডিং পারফরম্যান্স দিয়ে সে তো সেরা
খেলোয়াড় হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তার ধারেকাছে কোন প্লেয়ার নেই।’
এই
অনুর্ধ-২১ টিমটাকে যদি একটা সুন্দর প্ল্যানিংয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে
জাতীয় দলের জন্য ভালো একটা পাইপলাইন তৈরি হবে বলে অভিমত কামারের, ‘ বিভিন্ন টুর্নামেন্টের
মাধ্যমে, কোচিং কোর্স, বিদেশে পাঠিয়ে, বিদেশ থেকে টিম আনিয়ে এই দলটিকে সারাবছর মাঠে
রাখতে হবে। এছাড়া একটা চারবছর মেয়াদী একটি পরিকল্পনা নিতে হবে, যেন আমরা পরবর্তী বিশ্বকাপেও
খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারি। এটা যেন বেহাত না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।’
সিনিয়রদের
পাশাপাশি জুনিয়রদের দিকেও নজর রাখতে হবে, তারা যদি ম্যাচখরায় ভোগে, তাহলে কিন্তু আবারও
দেশের হকি পিছিয়ে যাবে বলে মনে করেন কামাল, ‘সেই প্রেক্ষিতে বলবোÑসরকারেরও উচিৎ হকি
ফেডারেশনের যা যা প্রয়োজন, সে ধরনের সহযোগিতা করা। সেই সঙ্গে পৃষ্ঠপোষকদেরও এগিয়ে আসা
উচিৎ। ফেডারেশন এখন যারা আছে কিংবা আগামীতে নতুন কমিটিতে যারাই আসুক না কেন, সবাইকে
সবার সহযোগিতা করতে হবে। এখানে কেউ কারোর বিরুদ্ধে লাগা যাবে না।’
কামাল
আরও যোগ করেন, যেহেতু আমরা হকিতে কিছু একটা প্রমাণ করতে পেরেছি, সেহেতু সবাইকে একইসঙ্গে
থেকে হকির উন্নয়নের জন্য, হকিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য একযোগে কাজ করতে হবে।’
দেশের
ঘরোয়া লিগ, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ, অফিস লিগ, বিজয় দিবস হকি, স্বাধীনতা দিবস হকি, শহীদ
দিবস হকি … এসব টুর্নামেন্টগুলো আবারও চালু করা উচিৎ বলে মনে
করেন কামাল, ‘ঢাকার বাইরেও যেন হকিটা ছড়ায়,
সেদিকে ফেডারেশনের নজর দেওয়া বা মনিটরিং করা উচিৎ। এসবের মাধ্যমে অনেক তরুণ-দক্ষ প্লেয়ার
খুঁজে পাওয়া সম্ভব, যারা ভবিষ্যতে জাতীয় দলে আলো ছড়াতে পারবে। মোট কথা, একটা সুষ্ঠ
“চেইন অব কমান্ড”-এর মতো প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা উচিৎ। ক্রিকেটের মতো হকিতেও অনুর্ধ-১৫,
১৭, ১৯ দল তৈরি করা উচিৎ। এটা করতে পারলে আগামী ৮-১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের হকির চেহারাটা
আমূল পাল্টে যাবে।’
সবশেষে
কামাল বলেন, ‘অতি অবশ্যই চ্যালেঞ্জার্স কাপজয়ী এই অনুর্ধ-২১ হকি দলটিকে সংবর্ধনা দিয়ে ভালো অঙ্কের আর্থিক প্রণোদণা দিয়ে পুরস্কৃত করা
উচিৎ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, হকি ফেডারেশন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের।’
বাংলাদেশ
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও তারকা ডিফেন্ডার মামুনুর রহমান চয়ন তো আমিরুল বলতে অজ্ঞান।
উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জানালেন, ‘আমিরুলকে অবশ্যই ঢাকা শহরে একটা ফ্ল্যাট দিতে হবে ক্রীড়া
মন্ত্রণালয় থেকে। ও যা অর্জন করেছে জুনিয়র হকি বিশ্বকাপে, তার কোন তুলনা নেই। আমি দীর্ঘদিন
ধরে জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসে লিগ খেলি, আমি জানি এদের সম্পর্কে। এখানে বাঘা বাঘা
দলের বিপক্ষে ৬টা ম্যাচের মধ্যে ৫টিতেই হ্যাটট্রিক, ১৮টা গোল, দলকে চ্যালেঞ্জার্স কাপ
জেতাতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা আমিরুলের জন্য যদি এই দেশ কিছু করতে না পারে, তাহলে
এটা হবে চরম লজ্জাজনক একটা বিষয়। আমিরুলকে সম্মান দেওয়ার জন্য অন্ততঃ এই মিনিমাম কাজটা
করা উচিৎ, যেন পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারে এবং অনুপ্রাণিত হয়।’
চয়ন
আরও যোগ করেন, ‘যখন এই দলটি ভারতে খেলতে যায়, তখন জানতাম টিমটা মোটামুটি ভালো। ফাইট
করবে। কিন্তু তারা যে এমন “এক্সট্রা অর্ডিনারি” খেলবে, এটা স্বপ্নেও ভাবিনি। কারণ প্রতিপক্ষ
যে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া, কোরিয়া, অস্ট্রিয়ার মতো শক্তিশালী সব দল। কিন্তু তাদের
বিপক্ষে আমিরুলের প্রায় প্রতি ম্যাচে হ্যাটট্রিক করা ও জেতা, এগুলো তো বিশাল অর্জন।’
চয়নের
উপলব্ধি, ‘আমি ৭/৮ বছর জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলাম। তখন দেখেছি জাতীয় দলের হয়ে কোনো সাফল্য
এনে দিলে তা নিয়ে ঠিকই একটা আলোড়ন ওঠে, কিন্তু মাস দুয়েকের মধ্যেই সেই হাইপটা শেষ হয়ে
যায়! দলীয় খেলায় ক্রিকেটের পর এই হকিই সম্ভাব্য খেলা যেটা বিশ্বকাপ লেভেলে খেলতে পারে।’
যুব
দল নিয়ে চয়নের পরামর্শ, ‘এই অনুর্ধ-২১ দলটা যা অর্জন করল, তাদের জন্য অবশ্যই একটা ৩/৪
বছরের পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে। শুধু জুনিয়রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, সিনিয়র
ওয়ার্ল্ডকাপ সামনে রেখে সবকিছু করতে হবে। প্লেয়ারদের আর্থিক নিরাপত্তা দিতে হবে, তাদের
জন্য পরিবার-সংসার চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে না হয়। তারা যেন বেশি করে আন্তর্জাতিক
ম্যাচ খেলতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। মোটকথা, সারাবছরই তাদের ফিল্ডে রাখতে হবে।
জুনিয়র দলের একাধিক প্লেয়ারকে সিনিয়র দলে নিয়ে কম্বিনেশন তৈরি করতে হবে।’
আরকে/প্রবা