রুমেল খান
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:৪৬ পিএম
আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ২৩:০০ পিএম
একটি
মাঠ। একটি চর্মগোলক। ২২ ফুটবলার। হাজারো দর্শক। এর মধ্যে এক ফুটবলার কেড়ে নেন সব আলো।
সেটা স্কিলের অনুপম প্রদর্শন করে, সফলতায়, শিরোপা জিতে। গায়ে-গতরে যেমন খুব একটা লম্বা
নন, তেমনি খুব একটা স্বাস্থ্যবানও নন। ডান পায়ে ও মাথা দিয়ে তেমন খেলতে পারেন না। কিন্তু
বল পায়ে তিনি যেন ফুটবলের এক জাদুকর, বিস্ময় মানব। তার বা পায়ের কারুকাজ দেখলে হয়ে
যায় চোখের শান্তি, মনের শান্তি। ড্রিবলিং, পাসিং, শুটিং, বিগ চান্স ক্রিয়েট, প্লেমেকিং,
গোল, এ্যাসিস্ট … ফুটবলের সব ধরনের পরিসংখ্যানেই জুড়ে আছেন যিনি,
বেশিরভাগ ফুটবলবোদ্ধা ও ফুটবলামোদীদের মতে সর্বকালের সেই সেরা ফুটবলারটি হচ্ছেন লিওনেল
আন্দ্রেস মেসি।
সেই
মেসি রবিবার (৭ ডিসেম্বর) মেজর সকার লিগের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি ‘এমএলএস কাপ’ জিতলেন ইন্টার
মায়ামির হয়ে। মেসির জাদুকরী পারফরম্যান্স এবং জোড়া অ্যাসিস্টে ভর করে ইতিহাস সৃষ্টি
করল মায়ামি। ফাইনালে কানাডিয়ান ক্লাব ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপসকে ৩-১ গোলে (মিয়ামির
গোলদাতা রদ্রিগো ডি পল ও তাদেও আলেন্দে, আরেকটি
আত্মঘাতী গোল বিজিত দলের এডিয়ার ওকাম্পো, তাদের একমাত্র গোলটি করেন আলী আহমেদ) হারিয়ে
প্রথমবারের মতো এমএলএস কাপ জয় করল তারা। এই জয়ে গোলাপি জার্সির সমর্থকদের আনন্দ উল্লাসে
চেজ স্টেডিয়ামে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
এ
ম্যাচ দিয়েই পেশাদার ফুটবলের ইতি টানেন মেসির দীর্ঘদিনের দুই সঙ্গী সের্জিও বুসকেটস
ও জর্দি আলবা। তাদের বিদায় নিয়ে মেসির কণ্ঠে ছিল আবেগ, ‘ওদের অর্জনে আমি সত্যিই খুশি।
ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে এমএলএস কাপ জিতে ক্যারিয়ার শেষ করা বিশেষ কিছু।
ওরা আমার খুব কাছের বন্ধু। ওদের হাসিমুখে বিদায় নিতে দেখে আনন্দ লাগছে। নতুন জীবনের
জন্য শুভকামনা।’
যদিও
ফাইনালের আগে মেসিকে চোখ রাঙাচ্ছিল বিব্রতকর একটি রেকর্ড। সেটি হচ্ছে ভ্যাঙ্কুভারের
অধিনায়ক ও জার্মান ফরোয়ার্ড টমাস মুলারের তার বিরুদ্ধে মুখোমুখি লড়াইয়ে ৭-৩ ব্যবধানে
জয়ী হয়ে এগিয়ে থাকার রেকর্ড।এর মধ্যে একটি ছিল ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে হারের তিক্ত
স্মৃতি। কিন্তু এবার মুলারকে জিততে দেননি মেসি।
মেসিই
বিশ্বের একমাত্র ফুটবলার, যিনি ক্লাব ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সব ধরনের শিরোপা জিতেছেন।
ক্যারিয়ারের ২৬তম বড় ফাইনালে এটি মেসির ১৮তম শিরোপা জয়। তবে এমএলএস কাপ জেতার পর বির্তক
সৃষ্টি হয়েছে মেসির সার্বিক ক্যারিয়ারের শিরোপাসংখ্যা ৪৭, না ৪৮ তা নিয়ে।
ফিফার
নিয়ম অনুযায়ী, মেসির ক্যারিয়ারে ইস্টার্ন কনফারেন্সের ওই ট্রফি নতুন শিরোপা হিসেবে
যোগ হয়নি। কারণ এমএলএস ইস্টার্ন কনফারেন্সের এই শিরোপা ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি
দেয় না। ফিফা কেবল প্লে-অফের ইস্টার্ন চ্যাম্পিয়নকে স্বীকৃতি দেয়। পুরো লিগের একমাত্র
আনুষ্ঠানিক শিরোপা হলো এমএলএস কাপ। লিগের হিসেবে কনফারেন্স শিরোপা একটি সাফল্য হলেও
মেজর ট্রফি হিসেবে গণ্য করা হয় না। সে কারণে এমএলএস কাপ জেতার পরই মেসির ক্যারিয়ারের
আনুষ্ঠানিক শিরোপা সংখ্যা বেড়ে ৪৭ হয়েছে। অবশ্য মেসি এখন এমন এক অনন্য উচ্চতায় চলে
গেছেন, শিরোপাসংখ্যা তার জন্য কোনো ব্যাপারই নয়।
মেসি
মায়ামিতে এসেছিলেন যে স্বপ্ন নিয়ে, সেটি পূরণ করেছেন এমএলএস কাপ জিতে। এই অর্জনের পথে
হয়েছেন লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা, লিগে গোলে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা, প্লে-অফে সবচেয়ে
বেশি গোলে অবদান রাখা, মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার … আরও কত কী! অথচ মার্কিন
মুল্লকে মেসি পাড়ি জমান, তখন এ নিয়ে অনেক ট্রল করেছিলেন মেসির প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। কিন্তু এ নিয়ে মেসি মুখে কিছু বলেননি। বরং কাজে করে দেখিয়েছেন।
তলানির দলকে জিতিয়েছেন তিনটি ট্রফি, যা একমাত্র তুলনীয় হতে পারে ডিয়েগো ম্যারাডোনার
নাপোলিকে সাফল্য এনে দেওয়ার সঙ্গেই। অথচ রোনালদো সৌদি লিগের টপ ক্লাব আল-নাসরে যোগ
দিয়ে এখনও কোনো শিরোপার স্বাদ পাননি, এটা বেশ বিস্ময়করই বটে।
ফুটবল
দলীয় খেলা। আর এই দলীয় খেলায় সবচেয়ে বেশি ট্রফির মালিক অনেকদিন ধরেই মেসি। সেই রেকর্ডটিকে
অন্যদের ধরাছোঁয়ার আরও বাইরে নিয়ে গেলেন তিনি। আগামীতে কেউ তার এই অবিস্মরণীয় কীর্তিকে
ছাপিয়ে যাবেন, বাজি ধরার এমন কেউ নেই। তবে মেসি কিন্তু এখানেই থেমে যাচ্ছেন না। তার
সামনে আরও তিনটি ট্রফি জেতার সুযোগÑ কনকাকাফ ট্রফি, ফিনালিসিমা ও ফিফা বিশ্বকাপ। প্রতিটি
জিতলে বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র ফুটবলার হিসেবে ৫০টি ট্রফি জেতা বিরল ফুটবলারে পরিণত
হবেন তিনি। সেটা কি খুব কঠিন মেসির জন্য?
বিষয়টি
এখন এমন হয়ে গেছে যে, ট্রফির জন্য মেসি, নাকি মেসির জন্য ট্রফি!
* ফুটবল ইতিহাসে সর্বাধিক ট্রফিজয়ী ১০
ফুটবলার
খেলোয়াড় ট্রফিসংখ্যা
লিওনেল মেসি ৪৮
দানি আলভেস ৪৩
হুসাম আশুর ৩৯
মার্কিনিয়োস ৩৮
সের্জিও বুসকেটস ৩৮
জেরার্ড পিকে ৩৭
ডেভিড আলাবা ৩৭
ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো ৩৬
আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ৩৫
কেনি ডালগ্লিশ ৩৫
আরকে/প্রবা