প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২১:০১ পিএম
কি-বোর্ডের ব্যাকস্পেসে না বলতে চাওয়া অনেক কথাই মুছে ফেলা যায়। কিন্তু জীবন? কখনও শেষ বিকালে নীড়ে ফেরা বকের দল। আজ শিশু, কাল যুবক, পরশু বয়োবৃদ্ধ। এরপর…, মহাকালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া। যাপিত জীবনের নানা রঙ। ক্রীড়াতেও তাই। এখানে কুঁড়ি থেকে ফুল হয়ে ফোটেন ক্রীড়াবিদরা, ঝরে পড়েন কোনো এক দমকা হাওয়ায়। নশ্বর পৃথিবীতে স্থায়ী নয় কিছুই। ক্রীড়াতে তো নয়ই। জীবনের মতো ফুটবলও যে নানা রঙের, বেলা শেষে সেই গানই যেন হয়ে উঠেছে নির্মম অথচ চরম সত্যি।
আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসি ক্যারিয়ারের
গোধূলিলগ্ন দেখছেন। ছাপা পাতার পত্রিকা যতক্ষণে আপনার হাতে পৌঁছবে ততক্ষণে হয়তো বুয়েনস
এইরেসে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, না হয় ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে জয় তুলে হোটেলরুমে ফিরছেন এমএলটেন।
কারণ ম্যাচটাই জাতীয় দলের হয়ে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে মেসির শেষ ম্যাচ।
কলি হয়ে ফোটা মেসির ঝরে পড়ার মুহূর্তে আবেগের স্ফুরণ
লক্ষ করা যাচ্ছে আর্জেন্টাইন ফুটবল সমর্থকদের মাঝে। বার কয়েক অবসরের কথা বলা মেসি সিদ্ধান্ত
নিয়েও পিছু হাটেন দল এবং দেশের কথা ভেবে। তবে এবার আর নয়। বিদায় নিতে হচ্ছে তাকে। আপাতত
সেটা দেশের মাটি থেকে। বুয়েনসে ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে ম্যাচই তার শেষ ম্যাচ। এই ম্যাচের
আগে আর্জেন্টাইন নায়ককে নিয়ে কথা বলেছেন কোচ ও এক সময়কার সতীর্থ লিওনেল স্কালোনি। ম্যাচ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনের প্রায় পুরোটাই ছিল আবেগঘন। সেখানেই স্কালোনি জানিয়ে
দিয়েছেন, মেসির উত্তরসূরি কখনও পাওয়া সম্ভব নয়।
ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে ম্যাচ। স্বভাবত ম্যাচ নিয়ে, শুরুর
একাদশ কিংবা আবহ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। তবে কথা হলো মেসিকে নিয়ে। তাতেই রাজ্যের নীরবতা
নেমে আসে। চোখে জল ছলছল করে উপস্থিত সাংবাদিকদের মাঝে। মেসিকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কেঁদেও
ফেলেন এক সাংবাদিক। স্কালোনি তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি কি কাঁদছেন? এটা তো আমার
উদ্দেশ্য ছিল না।’
জবাবে সাংবাদিক বলেন, ‘আপনি আমাকে জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ
উপহার দিয়েছেন।’ এ কথা শুনে কোচ স্কালোনির চোখও ভিজে যায়, কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। তিনি বোঝানোর
চেষ্টা করছিলেন, মেসি আসলে তার জীবনে, কোচিং ক্যারিয়ারে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
স্কালোনি শুধু মেসির গুরুই নন, তার সতীর্থও ছিলেন একসময়।
তার সঙ্গে পথচলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি ওর সঙ্গে খেলেছি। শুধু বলটা ওকে
পাস দেওয়াটাই আমার কাছে বিশেষ ব্যাপার ছিল। বিশ্বকাপে ওর সঙ্গে থাকা আর ওকে ট্রফি উঁচিয়ে
ধরতে দেখা সত্যিই হৃদয়স্পর্শী এক অভিজ্ঞতা। সময় গড়ানোর সঙ্গে আমরা সবাই এর অর্থ আরও
গভীরভাবে বুঝতে পারব। আগামীকাল দিনটা হবে সুন্দর আর আবেগময়। তবে আমার আশা আর্জেন্টিনায়
এটাই ওর শেষ ম্যাচ হবে না। আমরা চেষ্টা করব যেন ও চাইলে আরেকটা ম্যাচ খেলতে পারে। কারণ,
এটা ওর প্রাপ্য।’
২০২৬ বিশ্বকাপের সময় মেসির বয়স ৩৯ পেরিয়ে যাবে। বিশ্বকাপ
শেষে আর্জেন্টিনার জার্সি চিরতরে তুলে রাখার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। এরপর মেসির মতো আর
কাউকে কি পাবে আর্জেন্টিনা? স্কালোনির উত্তর, ‘আর্জেন্টিনা বা বিশ্বফুটবলে মেসির উত্তরাধিকারী?
না, এমন কেউ হতে পারবে না। হবেও না। হয়তো কয়েকজন দুর্দান্ত খেলোয়াড় আসবে, যারা একটি
যুগকে সংজ্ঞায়িত করবে। কিন্তু এত দিন ধরে সে যা করেছে, আমার মনে হয় তা অতুলনীয় হয়ে
থাকবে। ফুটবলে অনেক অকল্পনীয় ঘটনা ঘটে। কিন্তু আমি প্রায় নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, ওর
মতো কাউকে আর দেখা যাবে না। আমার মনে হয় ওর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।’
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০ বছরের ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনার
হয়ে ১৯৩ ম্যাচ খেলেছেন মেসি, গোল করেছেন ১১২টি। জিতেছেন চারটি ট্রফিÑ ২০২১ ও ২০২৪ কোপা
আমেরিকা, ২০২২ ফিনালিসিমা ও ২০২২ বিশ্বকাপ, যা তাকে ‘অমরত্বের স্বাদ’ পাইয়ে দিয়েছে।