অব্যবস্থাপনা আর বৃষ্টিতে ফাইনাল স্থগিত
রুবেল রেহান, ময়মনসিংহ থেকে
প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৫ ২০:৪৮ পিএম
একটা ফাইনাল ম্যাচের উত্তেজনা, রোমাঞ্চ সবকিছুই ছিল ফেডারেশন কাপে আবাহনী-বসুন্ধরা কিংস ফাইনালে। প্রথম ১৫ মিনিটের মধ্যে একবার করে দুই দল কাঁপায় প্রতিপক্ষের জাল। এরপর হাতাহাতিতে খেলা বন্ধ। প্রথমার্ধেই মাঠ আর ডাগআউট মিলে হলুদ কার্ড দেখল ১০ জন। উত্তেজনার সবটা থামিয়ে দিতেই যেন চেয়েছিল বৃষ্টি। কিন্তু বৃষ্টির সঙ্গে কালবৈশাখী ঝড়; খেলা বন্ধ থাকল ঘণ্টাখানেক। পরে খেলা মাঠে গড়ালেও গোলের দেখা পায়নি কোনো দল। অতিরিক্ত সময়ে লাল কার্ড দেখে ১০ জনের দলে পরিণত হলো কিংস। ফাইনালের মীমাংসা টানার আগেই ম্যাচ কমিশনার স্থগিত ঘোষণা করলেন। আর এতে ঝুলে থাকল শিরোপাভাগ্য।
ময়মনসিংহের রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার ফেড কাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয় ঢাকা আবাহনী ও বসুন্ধরা কিংস। নির্ধারিত সময়ের পর অতিরিক্ত সময়ের খেলা চলে আরও ১৫ মিনিট। এরপর আলো স্বল্পতার কারণে স্থগিত হয় এবারের ফাইনাল। এই ফাইনালের পরবর্তী দিন ধার্য্ হয়নি। সিদ্ধান্ত গেছে পেশাদার লিগ কমিটির টেবিলে। যেদিন ম্যাচ হবে, সেদিন হবে বাকি ১৫ মিনিটের খেলা। সেই সঙ্গে এই ম্যাচের সবকিছুই বহাল থাকবে অর্থাৎ যেখান থেকে ম্যাচ শেষ হয়েছে বাকি অংশ সেখান থেকেই শুরু হবে। বাইলজেও আছে সেটি। বাকি ১৫ মিনিটে খেলার নিষ্পত্তি না হলে ম্যাচের রেজাল্ট আসবে টাইব্রেকারে।

তবে ম্যাচ কমিশনার তৈয়ব হাসানের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই দলের দুই রকম মত, স্বাগত জানায় কিংস, আবাহনীর ভিন্নমত। ক্লাবটির কর্মকর্তারা মনে করছেন, ম্যাচ শেষ হওয়ার মতো পর্যাপ্ত আলো তখনও ছিল। যদিও কালবৈশাখীর অজুহাতকেই সামনে টানছেন ম্যাচ কমিশনার ও রেফারি। এদিন ফাইনাল শুরুর নির্ধারিত সময় ছিল দুপুর পৌনে তিনটা। মাঠে খেলোয়াড়দের হাতাহাতি, সমর্থকদের উল্লাস, দুই দলের ডাগআউটের ঝাঁজ সামলে প্রথমার্ধের খেলা শেষ হয় সঠিক সময়েই। দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর প্রথম মিনিটেই নামে বৃষ্টি। দুই মিনিটে সেটি রূপ নেয় ভয়াল ঝড়ে। যে ঝড়ে উড়ে গিয়েছিল মাঠের অনেক কিছুই।
মাঠের পূর্ব ও পশ্চিম পাশের গ্যালারিতে দুই দলের সমর্থকদের জন্য আলাদা করে দুটি প্যান্ডেল বসানো হয়। ঝড়ের শুরুতেই প্যান্ডেলের কাপড় ও বাঁশ উড়ে গিয়ে পড়ে স্টেডিয়ামের বাইরে। তার কিছু অংশ এবং সাইডলাইনে থাকা প্লাস্টিকের চেয়ার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে মাঠে। ঝড়ে লন্ডভন্ড হয় স্টেডিয়ামের ছাদে অস্থায়ীভাবে নির্মিত প্রেসবক্স। তুমুল বৃষ্টিতে জবুথবু অবস্থায় স্টেডিয়ামের সিঁড়িতে কোনোরকম অবস্থান নেন ঢাকা থেকে আগত সাংবাদিকরা। চলমান এই বৃষ্টির মধ্যে ঘটে অন্যরকম এক ঘটনা, আগত দর্শকের অনেকে ঢুকে পড়েন মাঠে। দর্শকদের জলকেলি অবশ্য কিছুক্ষণ পর থামিয়ে দেন নিরাপত্তাকর্মীরা।
ততক্ষণে প্রায় ৪৫ মিনিট বর্ষণের পর থামে বৃষ্টি। কিন্তু মাঠে জমে যায় পানি। এই মাঠের পানি নিষ্কাশনের যে কী দুরবস্থা সেটি এলো সামনে। পাইপ টেনে, প্লাস্টিকের টেবিল উল্টো করে সেই পানি নামানোর চেষ্টা করলেন মাঠকর্মীরা! হাস্যকর সেই কাণ্ডে নামল না পানি। বাতাসে উড়ে যাওয়া ডাগআউট ধরে টেনে আনলেন কয়েকজন। কিন্তু বৃষ্টি থামলেও তখনও ছিল বাতাসের বেগ। তাতে আরেকবার উড়ে গেল দুই দলের ডাগআউট। অগত্যা চেয়ার নিয়ে সাইডলাইনেই বসে গেলেন দুই দলের কোচ-কর্মকর্তারা। পৃথিবীর কোথায় এর আগে ডাগআউট উড়ে গিয়েছে কি না, সেটি অবশ্য জানা যায়নি। খুঁজে পাওয়া যাবে না হয়তো অনেক কিছুই। যেমন ড্রেসিংরুম থেকে মূল মাঠে খেলোয়াড়দের প্রবেশের জন্য পানির ওপর আলাদা করে নির্মিত হলো কাঠের ‘সাকো’! দেশের ফুটবলের করুণ দশা এই মাঠ আর ম্যাচ দিয়ে দেখিয়ে দিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)।
ম্যাচ শেষে কমিশনারের সিদ্ধান্ত নিয়ে আবাহনীর ম্যানেজার সত্যজিত দাস রুপু বলেছেন, ‘সিদ্ধান্ত দিয়েছেন রেফারি। একটা ম্যাচ যখন পরিচালিত হয়, তখন সেটার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেওয়ার মালিক রেফারি। টিম সিদ্ধান্ত দিতে পারে না… আমরা খেলার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। যদি আলো নিয়ে সমস্যা থাকে, সেটা অন্য বিষয়, কিন্তু এখানে কি আলো ছিল না? সেটা আপনাকে বিবেচনায় নিতে হবে। এরপর বাফুফের সদস্যপদে থাকা রুপু বলেছেন, তারা বাইলজে বিশ্বাসী। সেটি তারা অনুসরণ করবেন। তবে আলো নিয়ে বলেছেন, এই আলোতে খেলা চালিয়ে যাওয়া যেত। এ ছাড়া কিংস ১০ জনের দল ছিল বলে নিজেদের এগিয়ে রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু সেটির ফায়দা তারা নিতে পারলেন না বলেই আফসোস ঝরল রুপুর কণ্ঠে।
ম্যাচ কমিশনার তৈয়ব হাসান বলেছেন, ‘এখানে লিগ কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে, আলো স্বল্পতার ব্যাপারে জুরিডিকশন রেফারি, এই ক্ষমতা তার। সে যখন মনে করবে, তার। আমরা রেফারিকে বলিনি, আপনি এখন শুরু করবেন, এখন শেষ করবে। যেকোনো সময় খেলা বন্ধ করতে পারবেন রেফারি। খেলা তো তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা যাবে না। রেফারিকে এটা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ কিংসের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর বিএ জোবায়ের নিপু বলেছেন, ‘রেফারির সিদ্ধান্ত দুই দলই মেনে নিয়েছে। তারা হয়তো আমাদের ১০ জনের দলকেই সামনে আনবে। কিন্তু এটা সবাই জানে ১০ জনের দল আরও বেশি শক্তি নিয়ে খেলে। তা ছাড়া রেফারি খেলা চালিয়ে নিলে আমরা রাজি ছিলাম।’