রুবেল রেহান, শিলং থেকে
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৫ ১৭:৫১ পিএম
মাঠে একের পর এক সুযোগ সৃষ্টি করেছেন হামজা চৌধুরী। বাইরেও ছিলেন চর্চায়। গতকাল জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে আলোচনায় ছিলেন বাংলাদেশি তারকা মিডফিল্ডার। ছবি- আ.ই. আলীম
খেলা শুরু হতে তখনও বাকি এক ঘণ্টার মতো। শিলংয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের সামনের দিকটায় হাজারো মানুষের ভিড়। কেউ টিকিট কিনছেন, কেউ-বা কিনছেন ভারতীয় দলের জার্সি। ক্ষণে ক্ষণে আশপাশের এলাকায় উচ্চারিত হচ্ছিল সুনীল ছেত্রীকে নিয়ে স্লোগান। মুহূর্তেই দৃশ্যপট গেল বদলে। মাঠে প্রবেশের মূল গেট দিয়ে ঢুকছে হামজা চৌধুরীর পরিবার। বাংলাদেশ থেকে আসা সাংবাদিকদের মধ্যে তুমুল আগ্রহ। দৌড়ে গেলেন অনেকেই। প্রশ্নবাণে তখন জর্জরিত হামজার বাবা-মা, স্ত্রী। অনুভূতি জিজ্ঞেস করা থেকে শুরু করে প্রশ্নের যেন বিরাম নেই। সব প্রশ্নের উত্তর গুনে গুনে দিতে পারলেন না হামজার বাবা মোরশেদ দেওয়ান চৌধুরী। তবে সবার উদ্দেশে এটুকুই বললেন, এই দিনটার অপেক্ষাতেই ছিলাম। বুঝতে বাকি থাকল না, হামজার অভিষেকের কথাই বলেছেন।
ততক্ষণে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচের প্লেয়ার লিস্টে উঠে
গেছে হামজা চৌধুরীর নাম। প্রথম একাদশেই খেলছেন হামজা। মিডফিল্ড পজিশনে খেলবেন তিনি।
নিজের চাওয়ামতো ৮ নম্বর জার্সিই পেয়েছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা এই তারকা। মঙ্গলবার খেলা
শুরু হয়েছে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়। ঘরের মাঠে খেলছে ভারত। কিন্তু সবটুকু আলো কেড়ে নিয়েছেন
হামজা। রাতটি যে ৮ নম্বরের।
ম্যাচের আগে গা গরমে যখন মাঠে ব্যস্ত, ঠিক তখনই
চোখেমুখে দারুণ উচ্ছ্বাস নিয়ে প্রবেশ করছে হামজার পরিবার। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে
হামজার বাবা-মা সাংবাদিকদের আবদার পূরণ করেছেন। বলেছেন, ‘এই ম্যাচে হামজা গোল করবে
কি না জানি না, আশা করি ও গোল পাবে; তবে বাংলাদেশ জিতলেই খুশি। এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার
নেই।’ হামজার মা পাশ থেকে বললেন, ‘হামজার ম্যাচ দেখতে এসেছি। আমরা খুবই খুশি। বাংলাদেশ
দলে ওর অভিষেক দেখার মুহূর্তটা স্মরণীয় হবে আমার জন্য।’ সাংবাদিকদের পেছনে ঠেলে স্টেডিয়ামে
পৌঁছানোর আগে নিরাপত্তারক্ষী কর্মীদের সামনে অবশ্য এমন কিছুর জন্য প্রস্তুত ছিল না
হামজার পরিবার; তাদেরকে চিনতে না পারায় গেটে অপেক্ষা করতে হলো বেশ কিছুক্ষণ। পরিচয়
দেওয়ার পরও তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো আরও কিছুক্ষণ। পরে অবশ্য তারা শান্তিপূর্ণভাবেই
মাঠে ঢুকেছেন।
মাঠে ঢুকে ভিআইপি গ্যালারিতে বসে হামজার পরিবার।
ঠিক তার সামনেই ম্যাচের আগমুহূর্তের গা গরমে ব্যস্ত বাংলাদেশ দল। মাঠের এই দিকটায় অল্প
কিছু বাংলাদেশি দর্শকও ছিলেন। এখানকার বাংলাদেশি হবেন তারা। বারবার গ্যালারি থেকে হামজা
হামজা ধ্বনি ভেসে আসছিল। যদিও হামজার পুরো মনোযোগ তখন ম্যাচে। তার আগে ছেত্রী ধ্বনিতে
মুখর থাকলেও হামজা প্রবেশের পর কিছুটা বদলে যায়। ভারতের দর্শকেরা প্রিমিয়ার লিগের তারকাকে
সামনে থেকে দেখে হয়তো কিছুটা উদ্বেলিতই ছিলেন।
সিলেটের স্নানঘাটের পর ঢাকা, এরপর হামজা মাতিয়েছেন
মেঘালয়ের শিলং শহরকেও। তার উত্তাপ কিছুটা পাওয়া গেল ম্যাচের একাদশ ঘোষণার সময়ও। তপু
বর্মণ, মোহাম্মদ হৃদয়, শেখ মোরছালিনের পর নাম ঘোষণা করা হয় হামজার। আর সঙ্গে সঙ্গেই
যেন কেঁপে উঠল পুরো জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়াম। বাংলাদেশই নয়, ভারতের সমর্থকরাও তুমুল
করতালি-চিৎকার করে হামজাকে স্বাগত জানালেন।
এএফসি বাছাইপর্বের এই ম্যাচটিকে আগে থেকেই বলা হচ্ছিল
হামজা বনাম ছেত্রীর ম্যাচ। ভারতীয় কিংবদন্তিকে দেখার জন্য মানুষের যে আগ্রহ মাঠে এবং
মাঠের বাইরে দেখা গেছে তা ছিল দারুণ। তার পরিহিত ১০ নম্বর জার্সি বিক্রির ধুম লেগেছিল
এখানে। শিলং শহরের মানুষ এমনিতেই ক্রিকেটের চেয়ে ফুটবলের প্রতি অনেকটাই বেশি। শিলংয়ের
এই মাঠে প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যদিও কদিন আগে
ভারত এখানে একটি ফিফা ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলেছে, তা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ম্যাচের ভাইব
এটাই প্রথম। যে কারণে এই ম্যাচ দেখার জন্য মানুষের আগ্রহ তুমুল। এমনকি অনেককে দেখা
গেছে টিকিট না পেয়ে ফিরে যেতে।
শিলংয়ের মানুষের আন্তর্জাতিক ম্যাচ সামনে থেকে দেখার
আনন্দ নিশ্চয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের কিংবদন্তির ফেরায়। প্রিমিয়ার লিগ তারকা হামজার
জন্যও নয় কি?