বিপিএল
আবদুল্লাহ আল মাসুম
প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১২:৩৬ পিএম
বিপিএল টি-টোয়েন্টির চার-ছক্কার ঝনঝনানি শেষ হয়েছে। কিন্তু বিশ্রাম নেই জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের। দুই সপ্তাহেরও কম সময় পর শুরু চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। মিনি বিশ্বকাপখ্যাত টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে টাইগারদের প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গেছে। নিজেদের পছন্দের ওয়ানডে ফরম্যাট হওয়ায় সমর্থকদের প্রত্যাশার পারদটাও বেশি। তাই ফরম্যাট আলাদা হলেও বিপিএলে কতটা আলো ছড়ালেন চ্যাম্পিয়নস ট্রফির স্কোয়াডে থাকা ক্রিকেটাররাÑ এখন সেটিই পরখ করে নেওয়া যাক।
বিপিএলের মাঝপথে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির জন্য ১৫ সদস্যের দল ঘোষণা করেছিল বিসিবি। তবে দল ঘোষণার পর থেকে বিপিএলে বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারের পারফরম্যান্স আশানুরূপ হয়নি। তবে এখনও স্কোয়াডে পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে, কারণ আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দল পরিবর্তন করা সম্ভব। ফলে বিপিএলে ফর্মহীন থাকা কোনো ক্রিকেটারের বদলে নতুন কাউকে নেওয়া হবে কি না, সেটি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে টিম ম্যানেজমেন্ট।
বিপিএলে বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি স্কোয়াডের টপঅর্ডার ব্যাটারদের মধ্যে সবচেয়ে আলো ছড়িয়েছেন তানজিদ হাসান তামিম। ঢাকা ক্যাপিটালস হারের বৃত্তে বন্দি হয়ে গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নিলেও ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ছিলেন তিনি। ২৪ বছর বয়সি বাঁহাতি এ ওপেনার জিতেছেন বিপিএলের উদীয়মান ক্রিকেটারের পুরস্কার। ১২ ম্যাচে একটি শতক ও চারটি অর্ধশতকে করেছেন আসরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৮৫ রান। পাশাপাশি এবারের বিপিএলে সর্বাধিক ৩৬ ছক্কা হাঁকানোর কীর্তি গড়েছেন তিনি।
রংপুর রাইডার্সকে গ্লোবাল সুপার লিগের (জিএসএল) শিরোপা জেতাতে বড় অবদান ছিল সৌম্য সরকারের। ফাইনালে সেরার পাশাপাশি টুর্নামেন্টসেরাও হন বাঁহাতি এই ব্যাটার। কিন্তু ইনজুরির কারণে বিপিএলের শুরুতে সাইডবেঞ্চেই কাটাতে হয় তাকে। গ্রুপপর্বের শেষদিকে রংপুরের জার্সিতে ফিরলেও ফর্মে ফিরতে পারেননি। একটি ম্যাচে ৭৪ রানের ইনিংস খেললেও দলকে এলিমিনেটরের বেশি টেনে নিয়ে যেতে পারেননি। সব মিলিয়ে ৪ ম্যাচে করেছেন কেবল ১০৫ রান।
ব্যাট হাতে জাতীয় দলের হয়ে ধারাবাহিকতা না থাকায় চ্যাম্পিয়নস ট্রফির স্কোয়াড থেকে বাদ পড়েন লিটন দাস। তার বদলে ব্যাকআপ ওপেনার হিসেবে নেওয়া হয় ওয়ানডেতে অভিষেক না হওয়া তরুণ পারভেজ হোসেন ইমনকে। বিপিএলের শুরুতে ব্যাট হাতে রান না পাওয়ায় তাকে নিয়ে প্রশ্নও উঠেছিল। তবে প্লে-অফ পর্বে ব্যাট হাতে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে বড় বার্তাই দিয়ে রেখেছেন এই টপঅর্ডার ব্যাটার। চিটাগং কিংস শিরোপা হাতছারা করলেও ফাইনালে ৭৮ রানের হার না মানা ইনিংস খেলেন ইমন। সব মিলিয়ে ১৪ ম্যাচে ২৮.১৭ গড় ও ১৩০ স্ট্রাইক রেটে ৩৩৮ রান করেছেন তিনি।
ফরচুন বরিশাল টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা জিতলেও সবচেয়ে হতাশাজনক পারফরম্যান্স নাজমুল হোসেন শান্তর। নিয়মিতভাবে একাদশেই সুযোগ পাননি তিনি। সব মিলিয়ে লিগ পর্বে ৫ ম্যাচ খেলে মাত্র ৫৬ রান করেন শান্ত। পাননি কোনো ফিফটির দেখাও। জাতীয় দলের অধিনায়কের এমন ছন্দহীনতা চ্যাম্পিয়নস ট্রফির মতো বড় মঞ্চের আগে নির্বাচকদের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে চিন্তার কারণ।
শান্তর অধারাবাহিকতা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ালেও এবারের বিপিএলটা নিজের করে নিয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। খুলনা টাইগার্সকে প্লে-অফে নেওয়ার পথে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। অলরাউন্ডার পারফরম্যান্সে মিরাজ হয়েছেন টুর্নামেন্টসেরা। ডানহাতি এই অলরাউন্ডার ১৪ ম্যাচে দুটি হাফ সেঞ্চুরিসহ ২৭.৩০ গড়ে দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৫৫ রান করার পাশাপাশি উইকেট নিয়েছেন ১৩টি। অক্রিকেটীয় কারণে সাকিব আল হাসান চ্যাম্পিয়নস ট্রফির স্কোয়াডে না থাকায় মিরাজের অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের দিকে তাকিয়ে থাকবে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের মিডল অর্ডারে দুই ভরসা মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও মুশফিকুর রহিম। বরিশালের হয়ে ৮ ইনিংসে ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়ে রিয়াদ ২০৬ রান করেছেন ৩৪.৩৩ গড়ে, তার দুটি অর্ধশতক ছিল এবং ১৪৩.০৫ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করেছেন। বিশেষ করে, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীর বিপক্ষে তার তিনটি দুর্দান্ত ইনিংস রয়েছে। তবে আরেক অভিজ্ঞ মুশফিকের পারফরম্যান্স ছিল মোটাদাগে হতাশাজনক। ব্যাট হাতে কোনো ফিফটির দেখা পাননি মিস্টার ডিপেনডেবল। ৯ ইনিংসে ২৬.২৮ গড় ও ১২৭.৭৭ স্ট্রাইক রেটে করেছেন ১৮৪ রান।
জাকের আলি ১২ ম্যাচে ২৪১ রান করেছেন, তার সর্বোচ্চ রান ছিল ৪৭*। ২৪.১০ গড়ে এবং ১২৭.৫১ স্ট্রাইক রেটে ব্যাটিং করেছেন তিনি। বিপিএলে সেরা ফর্মে না থাকলেও বাংলাদেশ স্লগ ওভারে তার ব্যাটের দিকেই তাকিয়ে থাকবে দল। তাওহিদ হৃদয় ১৪ ম্যাচে ২৬.০০ গড়ে ৩৩০ রান করেছেন, স্ট্রাইক রেট ১২৪.৪৪।
এবারের বিপিএলে স্পিনারদের পারফরম্যান্স ছিল খুব সাদামাটা। রিশাদ হোসেন ১১ ম্যাচে ৭ উইকেট নিলেও ৮.৪২ ইকোনমি রেটে ছিলেন বেশ ব্যয়বহুল। অবশ্য ব্যাট হাতেও কিছুটা অবদান ছিল তার। ফাইনালে তার দুই ছক্কাতেই শিরোপা জেতে বরিশাল। নাসুম আহমেদ ১২ ম্যাচে ১৩ উইকেট পেলেও পুরো টুর্নামেন্টে ততটা কার্যকর ছিলেন না। নকআউটে খুলনার হয়ে বাজিমাত করলেও ভিন্ন কন্ডিশনে চ্যালেঞ্জ থাকবে তার ওপর।
এবারের বিপিএলে তাসকিন আহমেদ দুর্দান্ত ছন্দে ছিলেনÑ ১২ ম্যাচে ২৫ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হন। এই স্পিডস্টার ৬.৪৯ ইকোনমি ও ১১.১ স্ট্রাইক রেটে এনে দিয়েছেন নিয়মিত ব্রেকথ্রু। মুস্তাফিজুর রহমান ১৩ উইকেট পেলেও ৭.৩৫ ইকোনমি রেটে বোলিং করেছেন। তবে ডেথ ওভারে খুব একটা কার্যকর ছিলেন না কাটার মাস্টার। তানজিম হাসান সাকিব ৯ ম্যাচে ১৬ উইকেট নিয়ে নজর কেড়েছেন, যদিও ছিলেন বেশ ব্যয়বহুল। তার ইকোনমি ৮.১৯। স্পিডস্টার নাহিদ রানা প্রথম কয়েক ম্যাচে ভালো করলেও শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননিÑ ৮.৪৩ ইকোনমিতে ১২ ম্যাচে নিয়েছেন ১০ উইকেট। তাই বলাই যায়, এবার রান উৎসবের বিপিএলে যথেষ্টই উপযোগী ছিলেন টাইগার পেসাররা।
বিপিএলের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও দুর্বলতা স্পষ্ট। ওপেনিংয়ে তানজিদ হাসান তামিম ও সৌম্য সরকার আস্থার জায়গায় রেখেছেন নিজেদের। আশা জাগাচ্ছে পেস আক্রমণে তাসকিনের ফর্ম। তবে ডেথ ওভারে মুস্তাফিজ নিজেকে প্রমাণ করতে পারেন কি নাÑ সেটাই প্রশ্ন। ব্যাটিংয়ে মিরাজের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স ও কয়েক ব্যাটারের ভালো ইনিংস থাকলেও মিডল অর্ডার ব্যাটারদের ধারাবাহিকতার অভাব প্রকট। স্পিন বিভাগ নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকছেই। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আগে পেস আক্রমণই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি, তবে ব্যাটিংয়ে স্থিতিশীলতা ও স্পিন আক্রমণ যদি জ্বলে উঠতে পারে, তবে সুফল মিলতে পারে।