বাটলার থাকলে গণ অবসরের হুমকি সাফজী মেয়েদের
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৫ ১৯:১১ পিএম
আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৫ ২০:৪৭ পিএম
ক’দিন ধরেই উত্তপ্ত পরিস্থিতি দেশের নারী ফুটবলে। প্রধান কোচ পিটার জেমস বাটলারের অধীনে অনুশীলন না করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনায় ছিলেন সাবিনা খাতুনরা। অবশেষে সব অভিযোগের লিখিত পত্রসহ হাজির সংবাদ সম্মেলনে। ইংলিশ কোচের বিরুদ্ধে বডি শেইমিং, মানসিক নির্যাতন উৎপীড়নের মতো গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন সাফজয়ী নারীরা। সেই সঙ্গে স্রেফ জানিয়ে দিয়েছেন বাটলার থাকলে গণ অবসরে যাবেন তারা।
আজ বৃহস্পতিবার বাফুফে ভবনে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব ঘোষণা দেন সাবিনা খাতুন, মনিকা চাকমা, সানজিদা ইসলামসহ ১৭ ফুটবলার। ‘নারী জাতীয় ফুটবল দলের হেড কোচ পিটার বাটলার ইস্যু নিয়ে আমাদের অবস্থান, প্রশ্ন এবং যত অভিযোগ’ শিরোনামের এই বক্তব্যে একযোগে পদত্যাগের ঘোষণা দেন সাবিনারা। লিখিত বক্তব্যে সাক্ষর করেন সাবিনা, মনিকা, শামসুন্নাহার, সানজিদা, ঋতুপর্ণা, মাসুরাসহ ১৭ সিনিয়র ফুটবলার।
বাটলারের বিরুদ্ধে মেয়েদের বিদ্রোহের খবর নতুন নয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ দলের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ অভিযানের সময়ই এ নিয়ে আলোড়ন উঠেছিল। তবে কোচকে নিয়ে মেয়েদের বিদ্রোহ চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে দুদিন আগে। গত সোমবার বাটলার ঢাকায় ফিরে মঙ্গলবার টিম মিটিং ডাকলে মেয়েরা তাতে অংশ নেননি। এছাড়াও ইংলিশ কোচের বিরুদ্ধে অভিযোগটা মেয়েরা করে আসছিলেন আরও আগে থেকেই। এদিন সংবাদ সম্মেলনে দলের সিনিয়র একজন খেলোয়াড় বলেন, ‘এটা ওনারা (বাফুফে কর্তারা) আগে থেকেই জানতেন। তারা সেই সময় কোনো স্টেপ নেয় নাই। তারা যখন নতুন চুক্তি করে তখন একবারও ভাবে নাই, এই মেয়েগুলা কেন কথাগুলো বলতেছে, তাদের কথা শোনা দরকার।’

সংবাদ সম্মেলনে পাশ থেকে অন্য সাবিনা বলেন, ‘কোচের সঙ্গে আমাদের সমস্যা প্রায় ৫-৬ মাস ধরে চলতেছে। এটা কিরণ আপা, সাবেক সভাপতি স্যার (কাজী মো. সালাহউদ্দিন) এবং ইমরান ভাইও (ইমরান হোসেন তুষার) জানতেন। আমাদের পক্ষ থেকে ওনাদের জানানো হয়েছে অনেকবার। স্যার বলেছিলেন যাওয়ার আগে কোচ চেঞ্জ করবেন। এখানে যারা স্টাফ আছেন… সহকারী কোচ, তারা সবকিছু জানেন; কিন্তু এখন তারা কেন মুখ খুলতেছেন না তা জানি না, এটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু আমাদের মনে হয়েছে আমাদের খেলাটা ধরে রাখতে হয় এটা জানানো দরকার।’ তবে কোচের বিষয় নিয়ে বর্তমান সভাপতি তাবিথ আওয়ালের সঙ্গে বসতে চান বলেছেন মেয়েরা। সানজিদা বলেন, ‘অবশ্যই বসতে চাই।’
সমস্যা আসলে কী কী বিষয়ে জানতে চাইলে অধিনায়ক সাবিনা বলেন, ‘এখানে একটা জিনিসই বলার, নিজেদের আর কিছু প্রমাণের নেই। ব্যাপারটা আত্মসম্মানের; (এসময় কান্নায় ভেঙে পড়েন সাবিনা)। কারণ দিনশেষে মেয়েরা দেশের জন্য খেলে।কিন্তু দেশের মানুষ মেয়েদের যেভাবে কটুক্তি করতেছে এটা মেয়েদের জন্য নেয়াটা অসম্ভব।’ তখন ডিফেন্ডার মাসুরা পারভীন জানান, ‘আমাদের আর কোনো কিছু বলার নেই কারও কাছে, আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে যে এই কোচের অধীনে আমরা অনুশীলন করব না।’
কোচকে নিয়ে নির্দিষ্ট কি অভিযোগ জানতে চাওয়া হলে সাংবাদিকদের মিডফিল্ডার সানজিদা বলেন, ‘মাঠে আমরা মানসিকভাবে চাপে থাকি। আসলে আমরা অনেক সকালে ঘুম থেকে উঠি, যত সকালে আপনারাও উঠেন না। তো অনেক সময় ক্যাজুয়ালি থাকি, এটা নিয়ে উনি যা বলে তাতে আপসেট হয়ে যাই। অনুশীলনে তখন আর মন বসাতে পারি না। এমনকি গেম চলাকালীনও আমাদের সঙ্গে এটা হয়েছে। আপনারা ভালো জানেন যে নেপালে আমাদের সঙ্গে কি হয়েছে।’

নেপালে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সময় পাকিস্তান ম্যাচের অভিজ্ঞতা মাসুরা বর্ণনা করেন এভাবে, ‘পাকিস্তানের বিপক্ষে যখন ম্যাচ প্রায় হেরে যাচ্ছিলাম, তখন ডাগআউটে বসে উনি (বাটলার) বলতেছিলেন যে হারতেছে তাতে সমস্যা নেই, মেয়েরা তো ভালো খেলছে।’ পরে ভারত ম্যাচের আগে কোচের বিরুদ্ধে টিম মিটিং বাতিল করার অভিযোগও তোলেন অভিজ্ঞ এই ডিফেন্ডার, ‘যেহেতু পাকিস্তানের বিপক্ষে আমরা ড্র করি, পরে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। হারলে গ্রুপ থেকে বাদ পড়ে যাবো। ওখানে আমাকে খেলাবে না বলে… কোহাতিও ভালো খেলোয়াড়, তবে অভিজ্ঞতার একটা ব্যাপার আছে। ওখানে তাকে সহকারী কোচেরা বলেছিলেন যে মারিয়া মাসুরাকে খেলান। এটা বলার জন্য উনি টিম মিটিং বন্ধ করে দেন। ওখানে নওমি ভাই ছিলেন (মিডিয়া ম্যানেজার)। কিন্তু সে যে মিটিং করাল না এমন একটা ভাইটাল ম্যাচের আগেড়, সেখানে সে কোনো মিটিং করল না, টিম ঘোষণা নেই, ম্যাচের দিন প্রাকটিস নাই। তখন সে আমাদের হুমকি দিল, সেনিয়র খেলোয়াড় নামিয়ে বলল তোমরা পারলে জিতে দেখাও। তখন অন্যান্য স্টাফরা আমাদের শান্ত থাকার কথা বলেন। আমরা চুপ ছিলাম। কাউকে আমরা কিছু জানতে দেইনি। আমরা খেলার সঙ্গেই থাকতে চেয়েছিলাম, কিন্তু…।’
এরপর দলের অভিজ্ঞ উইঙ্গার সানজিদা বলেন, ‘আমরা এখন সমাধান চাই। ফেডারেশন যা বলবে আমরা তা মেনে নেবো। তবে এই কোচের অধীনে নয়। এটা ছাড়া ওনার যে সিদ্ধান্ত দেবে সেটাই মেনে নেবো।’ কোচ অনৈতিক কিছু করে কি না জানতে চাইলে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা একে একে ব্যক্ত করেন সাবিনা ঋতুপর্ণা চাকমারা। প্রথমে সাবিনা জানান, ‘এখানে অনৈতিক কিছু বলব না। তবে উনি রুপনাকে (গোলরক্ষক রুপনা চাকমা) বডিশেইম করেন। ওর হাইট নিয়ে কটুক্তি করে। সব সময় ইনসাল্ট করে।’ কোচ মানসিক চাপে রাখত বলেন অভিযোগ ঋতুর, ‘আমরা অ্যাডাল্ট, আমাদের একটা ব্যক্তিগত জীবন আছে। রেস্ট ডে-তে কফি খেতে যেতে পারি, বন্ধুদের সঙ্গে যেতে পারি, তো বাফুফেতে কিছু কর্মকর্তা আছে যারা কোচকে কানপরা দেয়, কে কোথায় এসব নিয়ে। তো কোচ আবার মাঠে গিয়ে আমাদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলেন। এমনকি সে আমাকে বলে আমার নাকি মনোযোগ নাই, অন্য বিষয়ে আমার মনোযোগ। সাফে যাওয়ার আগে চাপে ছিলাম।’

সবশেষে সাবিনা এটা বলে শেষ করেন, ‘উনি (বাটলার) অনেক হাইপ্রোফাইল কোচ, সন্দেহ নেই। আমি বিগত কোচদের নিয়ে কিছু বলব না, তাদের নিয়ে অনেক নিউজ হয়েছে। তবে আমি মনে করি আমাদের সফলতার সবচেয়ে বড় ভূমিকা ফেডারেশনের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের নিয়ে যা লেখা হচ্ছে সেটা কাম্য নয়। আমরা ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে বসতে চাই। একটা বিষয় নিয়ে চাই না অনেকবার কথা হোক। আপনারা অনেক সময় খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চান, কিন্তু পান না। তো এই জিনিসগুলো না হোক। আমরা চাই সুষ্ঠু সমাধান। দুইবার সাফ এসেছে এটা তো খুব ফানি কিছু না। দেশবাসীর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ, তারা আমাদের যেভাবে সাপোর্ট দেয় তার জন্য ধন্যবাদ। উনি (বাটলার) থাকলে আমরা কোচকে সম্মান জানিয়ে, নিজেদের সম্মান নিয়ে আমরা বিদায় নেবো।’