রুবেল রেহান
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:০৮ এএম
আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:১৭ এএম
স্বর্ণপদক জেতার পর উম্যাচিং মারমা। গত বৃহস্পতিবার টঙ্গীর আর্চারি ক্যাম্প মাঠে। ছবি তুলেছেন — আ.ই. আলীম
আঠারো পেরোনোর আগেই ২০২৩ সালে জাতীয় দলের দরজা খুলে যায় আর্চার উম্যাচিং মারমার সামনে। উচ্ছ্বাসের রেণু আকাশে উড়তে না উড়তেই মুদ্রার অপর পিঠও দেখে ফেলেন বান্দরবানের থানচি থেকে উঠে আসা এই আর্চার। পারফরম্যান্সের কারণে বাদ পড়েন এক বছরের মধ্যেই। এরপর কেটে যায় আরও এক বছর; নিজেকে হারিয়ে খুঁজতে থাকেন তিনি। একদিন সত্যিই নিজেকে খুঁজে পান ২০২৫-এর জানুয়ারিতে। গত বৃহস্পতিবার ‘নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে’ তারুণ্যের উৎসবে স্বর্ণপদক জেতেন বিকেএসপির উম্যাচিং। লক্ষ্যটা পরিষ্কার, ফের জাতীয় দলে ফিরতে চান; তবে সাফল্যের সিঁড়িতে এবার উঠতে চান ধাপে ধাপে।
উম্যাচিংয়ের জন্য আর্চারির পথটা অতটা সহজ ছিল না। ২০১৬ সালে বান্দরবানে নতুন খেলোয়াড়ের সন্ধ্যানে ক্যাম্প করে বিকেএসপি। সেখানে ছিলেন আর্চারি কোচ নূরে আলম ও রিনা চাকমা। প্রথম দেখাতেই তাদের নজরে পড়েন উম্যাচিং। এরপর তাকে এক মাসের ক্যাম্পে ডাকে বিকেএসপি। আর্চারির হাতেখড়ি সেখানেই। ক্যাম্প থেকে ফিরে উম্যাচিংকে অপেক্ষা করতে হয় আরও চার মাস। ওই সময়ে এক দিনের একটা ট্রায়ালে ডাক পান উম্যাচিং। সেখান থেকেই পান বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ।

সেই গল্পটা নিজেই শুনিয়েছেন উম্যাচিং, ‘বিকেএসপিতে আসছি ২০১৬ সালে। বিকেএসপি থেকে বান্দরবানে একটা বাছাইয়ে আসছিলেন আলম স্যার (আর্চারি কোচ নূরে আলম) ও রিনা ম্যাম (রিনা চাকমা)। তো ওনারা আমাকে দেখে বাছাইয়ে নেন। এরপর আমি সিলেক্ট হই। এর আগে আর্চারি সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না, এটা কীভাবে খেলে বা এই খেলার ভবিষ্যৎ কী। পরে আমাকে এক মাসের জন্য ক্যাম্পে ডাকল। এর চার মাস পর আমাকে এক দিনের একটা ট্রায়ালে ডাকে। বলা হয়েছিল, সেখানে টিকলে বিকেএসপিতে ভর্তি হতে পারব; ভাগ্যক্রমে আমি টিকে যাই। এরপর তো ভর্তি হই। এভাবেই খেলাটাতে আসা।’

লাজুকপ্রকৃতির উম্যাচিং কথাতেও বেশ বিনয়ী। বারবার কৃতজ্ঞতার সুরে স্মরণ করেছেন কোচ নূরে আলম ও কোরিয়ান কোচ লি ইয়ং হো-কে। কেননা বিকেএসপিতে আসার আগে যে খেলাট সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না উম্যাচিংয়ের; সেই খেলা থেকেই তিনি জায়গা পান জাতীয় দলে। এরপর জিতেছেন পদকও।
তাছাড়া জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ে একটা সময় নিজের আত্মবিশ্বাসই হারিয়ে ফেলেছিলেন যে উম্যাচিং- তিনি এখন আবার স্বপ্ন দেখেন দেশের জন্য কিছু করার। যে কারণে কোচদের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা তার, ‘আমি মাঝখানে হঠাৎ ডাউন হয়ে গিয়েছিলাম। কনফিডেন্স কমে গিয়েছিল। তখন ভাবছিলাম চেষ্টাটা করে যেতে হবে। আলম স্যার আমাদের নিয়ে অনেক পরিশ্রম করেন। বিশেষভাবে কোচিং করান। তাছাড়া আমাদের কোরিয়ান কোচ লি ইয়ং হো স্যার আছেন। আর আমাদের রিনা ম্যাম, সজিব স্যার, সারোয়ার স্যার ও হিরা ম্যাডামরা আমাদের জন্য অনেক চেষ্টা করেন, ভালো খেলোয়াড় বানানোর জন্য কষ্ট করেন অনেক।’

তবে উম্যাচিং এটাও এখন জানেন যে, কোচদের চেষ্টার বাইরে নিজেকেও পরিশ্রম করতে হবে। যে কারণে শিডিউলের বাইরেও নিজেকে অনুশীলনে রাখেন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়া উম্যাচিং। আর তাই স্বর্ণপদক জিতেই আকাশে উড়তে চাইছেন না তিনি।
পারফরম্যান্সকে আরও উন্নত করে নিজেকে শানিয়ে ফিরতে চান জাতীয় দলে, ‘জাতীয় দলে ফেরার জন্য আমার আত্মবিশ্বাস আছে। আজকে (বৃহস্পতিবার) যে পারফর্ম করেছি, সেটা হয়তো খুব ভালো না। তবে যেটা হয়েছে, বলব ভালোই হয়েছে, কিন্তু আমি মনে করি জাতীয় দলে ফেরার জন্য আরও ভালো করতে হবে।’

বৃহস্পতিবার পুলিশের ইতি খাতুনকে হারিয়ে স্বর্ণপদক জেতেন উম্যাচিং। তবে নকআউট রাউন্ডে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সামনে পড়েন তিনি। সেটি কীভাবে জয় করেছেন তার মুখ থেকেই শোনা যাক, ‘ম্যাচের সময় আলম স্যার (বিকেএসপির প্রধান কোচ নূরে আলম) পেছনে ছিলেন, তখন মনে মনে ভাবছিলাম আজ যদি হেরে যাই, তবে স্যার কষ্ট পাবেন। আমি চাইনি স্যার কষ্ট পাক। স্যারকে খুশি করতে চেয়েছি, আর সেটা মনে করেই তীর ছুড়েছি। তারপর তো পদক জিতলাম; স্যারেরাও খুশি হয়েছেন। অনেকদিন পর স্যারদের মুখে হাসি দেখেছি।’