নাজমুল হক তপন
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৫ ১৭:৫১ পিএম
‘এসো দেশ বদলাই, পৃথিবী বদলাই’- এই থিম সং নিয়ে যাত্রা করে এবারের বিপিএল। আগের দশ আসর থেকে এবারের বিপিএলকে নতুনের রঙ ছড়ানোর কথা বলা হয় বেশ জোরেশোরেই। এই লক্ষ্যে মাসকট উন্মোচন এবং তিনটি ভেন্যুতে মিউজিক ফেস্টের আয়োজনও করে বিসিবি। যতই নতুনের স্লোগান দেওয়া হোক না কেন, আগের আসরগুলোর ভুল, অব্যবস্থাপনা আর বিতর্ক থেকে বের হতে পারেনি চলতি একাদশতম আয়োজনও।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, টিকিট বিক্রিতে বিশৃঙ্খলা নিয়েই শুরু হয় চলতি আসর। এরপর একে একে যোগ হয়, চার-ছক্কা বাড়ানোর জন্য মাঠের দৈর্ঘ্য কমিয়ে ফেলা, বাইশ গজ বৃত্তে ক্রিকেটারদের মেজাজ হারানো। বিতর্ক চরমে ওঠে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক না পাওয়া ইস্যুতে। পাওনা টাকার দাবিতে প্র্যাকটিস বয়কট করেন দুর্বার রাজশাহীর ক্রিকেটাররা। মাঝপথেই নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় রাজশাহীর নিয়মিত অধিনায়ক এনামুল হক বিজয়কে। এ ছাড়া তারকা ক্রিকেটারদের অনুপস্থিতিতে এবারের বিপিএলের জৌলুস ও আকর্ষণÑ দুই-ই তলানিতে।

চলতি আসরের উদ্বোধনী দিনে মিরপুর স্টেডিয়ামের প্রধান গেট ভেঙে মাঠে প্রবেশ করেন দর্শক। সকাল থেকেই টিকিটের জন্য আগে থেকে নির্ধারিত মিরপুর সুইমিং কমপ্লেক্সের পাশের বুথে অপেক্ষা করছিলেন দর্শকরা। অনলাইনের পাশাপাশি সেই বুথেও টিকিট কাটার ব্যবস্থা করেছিল বিসিবি। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কিছু দর্শক কাউন্টার ঘিরে রাখা বাঁশের বেড়া ধাক্কাতে থাকে। এ সময় বুথে চালানো হয় ভাঙচুর। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ দর্শক সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।
চার-ছক্কা বাাড়নোর জন্য ব্যাটিংবান্ধব উইকেট করা হয়েছে এবারের বিপিএলে। এটাকে ইতিবাচক দেখছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। কিন্তু মাঠের দৈর্ঘ্য কেন কমানো হয়েছে, এটার কোনো সদুত্তর মিলছে না। কেননা ছোট মাঠে ছক্কা মারার অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কী কাজে আসবেÑ প্রশ্ন সেটাই। সচরাচর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাঠের দৈর্ঘ্য থাকে ৬৫-৭৫ গজ। এই আসরে মিরপুর ও সিলেট স্টেডিয়ামে মাঠের দৈর্ঘ্য ৫৫-৬০ গজ। বাউন্ডারি লাইন নিয়ে সমালোচনা করেছেন দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবাল, ‘যেভাবে মাঠ প্রস্তুত করা হয়েছে, তা খুব ভালো। তবে আমি দেখতে চাই আরও বড় সীমানা। জায়গা যখন আছে, তাহলে ৫৮-৬০ গজের বাউন্ডারিতে আমরা কেন খেলছি, জানি না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৬৫-৭০ গজের বাউন্ডারি দেখা যায়।’

এবারের আসরের শুরু থেকেই পারিশ্রমিক ইস্যু নিয়ে কথা ওঠে বিস্তর। নিয়ম অনুযায়ী, খেলা শুরুর আগেই পাওনার ৫০ শতাংশ পাওয়ার কথা ক্রিকেটারদের।এই নিয়ম আছে কেবল কাগজে-কলমেই। এবার বেশিরভাগ ফ্র্যাঞ্চাইজিই তাদের প্লেয়ারদের কোনো টাকাই পরিশোধ করেনি। টাকা না পেয়েই প্লেয়াররা বিপিএল খেলছেন বলে প্রকাশিত হয়েছে এমন রিপোর্টও। এই পারিশ্রমিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের শঙ্কার মুখে পড়ে টুর্নামেন্ট। পাওনার দাবিতে অনুশীলন বয়কট করে দুর্বার রাজশাহীর ক্রিকেটাররা।
গত ১৫ জানুয়ারি চলতি বিপিএলের চট্টগ্রাম পর্বে সকাল ১০টায় এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে অনুশীলন করার কথা ছিল দুর্বার রাজশাহীর। কিন্তু সকাল পৌনে ১১টায় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অনুশীলন বাতিল করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে উঠে আসে, পারিশ্রমিক বকেয়া থাকায় অনুশীলন বয়কট করেছেন দলটির ক্রিকেটাররা। এ অবস্থায় দলটি মাঠে নামবে কি না তা নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। তবে ২৫ শতাংশ নগদ আর ২৫ শতাংশ চেক দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত রাখে ফ্র্যাঞ্চাইজিটির ম্যানেজমেন্ট। বলা বাহুল্য, টাকা পেয়ে মাঠে নেমেই জয় তুলে নেয় হারের বৃত্তে বন্দি থাকা দলটি।
এবারের বিপিএলে বিতর্ক আর তামিম ইকবাল যেন হয়ে উঠেছেন সমার্থক। গত ৯ জানুয়ারি রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে হারের পর অ্যালেক্স হেলসের দিকে তেড়ে গিয়েছিলেন ফরচুন বরিশাল অধিনায়ক তামিম। পরের সপ্তাহে ঢাকা ক্যাপিটালসের বিপক্ষে ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সময় ফিল্ডার সাব্বির রহমানের ওপর ক্ষুব্ধ তামিম ব্যবহার করেন অশালীন ভাষা। সর্বশেষ চিটাগং কিংসের বিপক্ষে ম্যাচেও মেজাজ হারাতে দেখা যায় তামিমকে। সতীর্থ ডেভিড মালানের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউট হয়ে মাঠ ছাড়ার সময় মেজাজ হারান দেশসেরা এই ওপেনার। মালানকে লক্ষ্য করে রাগতস্বরে কিছু একটা বলেন তামিম।

সেঞ্চুরি করার পরদিনই নেতৃত্ব হারিয়েছেন দুর্বার রাজশাহীর এনামুল হক বিজয়। তার পরিবর্তে তাসকিন আহমেদের কাঁধে নেতৃত্বের ভার তুলে দিয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজিটির কর্ণধাররা। গত সোমবার ফ্র্যাঞ্চাইজিটি এক বিবৃতিতে জানায়, বিজয় যেন নেতৃত্বের ভারমুক্ত হয়ে ব্যাট হাতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, সেজন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া আরও কিছু ইস্যুতে এবারের বিপিএল নিয়ে কথা উঠছে। এককথায়, এই আসরে মানসম্মত বিদেশি ক্রিকেটার নেই। বলা হচ্ছে, জাতীয় দল থেকে বাদ পড়া ও অফ-ফর্মে থাকা বিদেশি ক্রিকেটারদের পুনর্বাসন প্রকল্প এবার টুর্নামেন্ট। বিতর্কমুক্ত থাকেনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও। বিপিএলের কনসার্টে গান গাওয়ার জন্য পাকিস্তানি শিল্পী রাহাত ফতেহ আলি বিসিবির কাছ থেকে নিয়েছেন ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। গত বছর বিপিএলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে ফরচুন বরিশাল পেয়েছিল মোটে ২ কোটি টাকা। এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। অনেকে বলেন, বিপিএলকে মানসম্মত করতে না পারলেও কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিদেশি শিল্পী আনতে পারেন আয়োজকরা।