× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আবাহনীর ‘হারানো সুবাস’ খুঁজে ফিরছেন সুবাস

রুবেল রেহান

প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:০২ পিএম

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:১০ পিএম

সুবাস সোমকে অনেকেই বলে থাকেন আবাহনীর ‘উইকিপিডিয়া’। প্রবা ফটো

সুবাস সোমকে অনেকেই বলে থাকেন আবাহনীর ‘উইকিপিডিয়া’। প্রবা ফটো

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ফুটবল ক্লাবের নাম এলে সবার আগে আসবে ইংল্যান্ডের শেফিল্ড এফসি। জন্ম ১৮৫৭ সালে। এত পুরোনো হওয়া সত্ত্বেও ক্লাবের নিজস্ব ওয়েবসাইটে সেই জন্ম থেকে এখন পর্যন্ত যাবতীয় রেকর্ড, গুরুত্বপূর্ণ ক্লাবের মুহূর্ত ইত্যাদি বিষয় লিপিবদ্ধ করে রেখেছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে না খেলেও তারা নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করেছে গুরুত্বসহকারে। ওয়েবসাইটের বিস্তৃতি এতটাই যে কেউ নিজের চোখে না দেখলে বলে বোঝানো অনেকটা অসম্ভব। অথচ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্তরের পেশাদার লিগে খেলে এমন ক্লাবগুলোর নেই কোনো নিজস্ব ওয়েবসাইট। রেকর্ড, নথি সংরক্ষণেও নেই তাগিদ। সেখানে আর সবার থেকে কিছুটা হলেও আলাদা ছিল ঢাকা আবাহনী। আরও নির্দিষ্ট করে বললে সুবাস সোম।

যাকে অনেকেই বলে থাকেন আবাহনীর ‘উইকিপিডিয়া’। বাড়িয়ে বলা হতে পারে, তবে এমনটাই সত্যি। অনেকটা আড়ালে থাকা সুবাস নিজেকে দায়িত্বে রেখেছিলেন আবাহনী তথা পুরো বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাস সংরক্ষণে। প্রায় ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে আবাহনীর মাঠের তথ্য লিখে রেখেছিলেন কাগজে। শুধু আবাহনীই নয়, ঘরোয়া ফুটবল লিগেরও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচসহ রেকর্ড ও অন্যান্য বিষয় লিখে রাখতেন সুবাস সোম। যেটা করেনি আর কেউ।

দুর্বৃত্তদের হামলায় তছনছ আবাহনী। সংগৃহীত ছবি

দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৩ বছর পর এসেও এখন পর্যন্ত কোনো ক্লাব, ফেডারেশন অন্তত তাদের রেকর্ড লিপিবদ্ধ করে রাখার প্রয়োজন অনুভব করেনি। দেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ স্তরের ফুটবলে পেশাদার লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা কে, বাংলাদেশের জাতীয় দলের জার্সিতেই বা সবচেয়ে বেশি গোল কে করেছেন, সেটি জানা দুষ্কর। মাঠের ভঙ্গুর দশার মতো, নথি সংগ্রহের দিকে ক্লাবগুলোরও উদাসীনতা। তবে ব্যতিক্রম ছিল আবাহনী, বিশেষ করে সুবাস সোমের মতো লোকেরা। 

আবাহনীর জন্ম ১৯৭২ সালে। ঠিক দুই বছর পর ১৯৭৪ সালে ক্লাব অফিসিয়াল হিসেবে যোগ দেন সুবাস সোম। শুধু তখন থেকেই না, পত্রিকা এবং অন্যদের থেকে শুনে আগের দুই বছরের তথ্যও সংরক্ষণ করেছিলেন তিনি। দেশের বাইরে আবাহনীর ম্যাচ কিংবা টুর্নামেন্ট থাকলে দলের সঙ্গেই থাকতেন সুবাস সোম। জানিয়েছেন দেশের বাইরে আবাহনী গেছে, আর তিনি দলের সঙ্গে নেই এমনটা হয়েছে কেবল দুবারই। তবে দলের সঙ্গে না থাকলেও দায়িত্বটা কাউকে না কাউকে বুঝিয়ে দিতেন। এমনকি দেশে থেকে টিভি, পত্রিকায় তথ্য সংগ্রহ করে নিজের নথিতে লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। 

দেশের অন্য ক্লাবগুলোর চরম উদাসীনতার ভিড়ে একজন সুবাস সোমের এই তথ্য লিপিবদ্ধ করে রাখাটা প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু আমরা তার গুরুত্ব কমই বুঝতে পেরেছি। তার বড় উদাহরণ ৫ আগস্টের পর ক্লাবে দুর্বৃত্তদের হামলা ও ভাঙচুর। তাতে চুরি হয়ে যায় ক্লাবটির সোনালি অতীতের প্রায় সব ট্রফি। এরপর ক্লাব কর্তৃপক্ষ অনেক অনুরোধ আবদার করেও যেগুলো আর ফেরত পায়নি। পত্রপত্রিকায় নিউজ হলেও কেউ ফিরিয়ে দিয়ে যায়নি ক্লাবগুলোর ঐতিহ্যধারণ করা এইসব ট্রফি। সে নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। তবে আড়ালেই থেকে গেছে সুবাস সোম তথা আবাহনীর হারানো নথিগুলো। হামলায় ক্লাব ভাঙচুরের পাশাপাশি যত খাতাপত্র ও কাগজ ছিল তা পুড়িয়ে দিয়েছে নয়তো ছিঁড়ে ফেলেছে। 

আবাহনীতে হামলার পর ক্লাবের সাবেক তারকারা আসেন ক্লাব প্রাঙ্গনে। ট্রফি ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি করে তারা। সংগৃহীত ছবি

সম্প্রতি সুবাস সোমের সঙ্গে কথা বলতে যাই ক্লাবে তার নিজের অফিস রুমে। তিনি জানান, ‘এটা খুবই দুঃখজনক। ওরা ক্লাবের ট্রফি চুরি করেছে, এরপর কাগজপত্রগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে। এখানে আবাহনীর কত শত অর্জনের রেকর্ড যে লিপিবদ্ধ ছিল, তার কোনো হিসাব নেই। যেগুলো এখন চাইলেও আর মনে করতে পারব না। কিন্তু সবই লেখা ছিল।’ 

তথ্যগুলো খুব যত্ন করেই লিখে রাখতেন সুবাস সোম। আলাদা বাক্সে আবাহনীর এক একটা টুর্নামেন্ট ও শিল্ডের তথ্য গুছিয়ে লিখে রাখতেন। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেল কয়েকটা বাক্স পড়ে আছে, তবে সেসব এখন ফাঁকা। 

জানা যায়, সুবাস সোমের এই তথ্য ভাণ্ডার থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতেন দেশের ক্রীড়া সাংবাদিকরা। অনেকেই তথ্যের জন্য তাকে ফোন দিতেন। সেই তালিকায় থাকাদের মধ্যে আছেন প্রয়াত কিংবদন্তি ক্রীড়া সাংবাদিক অঘোর মন্ডলও। প্রমাণ পাওয়া যায় বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক ও লেখক নাজমুল হক তপনের কথাতেও, ‘ঘরোয়া ফুটবলের কোনো তথ্যের প্রয়োজন, যেটা আর কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না, ইন্টারনেট ঘেঁটেও লাভ হচ্ছে না, তখন আমাদের শেষ ভরসা ছিলেন সুবাসদা।’

কিন্তু সুবাসের তথ্যের ভাণ্ডারেও আঘাত হেনেছে দুর্বৃত্তরা। অথচ এতটা খারাপ অবস্থা নাকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা, তথা ১৯৭৫-পরবর্তী সময়েও হয়নি। সেই সময়েও ক্লাবের সঙ্গেই ছিলেন সুবাস সোম। পরিস্থিতি কতটা খারাপ ছিল সেটি জানিয়েছেন এভাবে, ‘আমরা ভোরেই খবর পাই। তখন আমি ক্লাবে আসি। এখানেও পরিস্থিতি ভালো ছিল না। তখন আমিসহ কয়েকজন মিলে ক্লাবের কিছু জিনিসপত্র, টেলিভিশন, ক্রোকারিজ এবং কিছু ট্রফি আশপাশের বাড়িতে রাখি। কিন্তু ৫ আগস্টের পর যা হলো সেটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’ মেনে নেওয়ার মতো না হলেও ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আবাহনীসহ বেশ কয়েকটি ক্লাবে ঘটেছে এমন কিছু ঘটনা।

এই ঘটনা কতটা ব্যথিত করে সুবাস সোমকে সেটি না বললেও চলে। কথা বলতে গিয়ে বেশ কয়েকবারই তিনি হতাশা প্রকাশ করেছেন। কেননা আবাহনীর জেনারেল ম্যানেজার পদে থাকা সুবাসের কাছে এটি কেবল একটি চাকরিই নয়, বরং আবাহনীকে নিজের মধ্যে ধারণ করেন বলেই সেই ২২-২৩ বছরে ক্লাবে আসা তরুণ ছেলেটি আবাহনীতেই বুড়ো হয়েছেন। বর্তমানে সত্তরোর্ধ্ব সুবাস একাধিকবার ভালো চাকরির সুযোগ পেয়েও ক্লাব ছাড়েননি। জানিয়েছেন সেই সময়ে এবি ব্যাংকে চাকরি হলেও শেষ অবধি ছাড়েননি ক্লাব। অনেক সময় ক্লাবের কর্তাদের অনুরোধেও থেকে গেছেন। দিনশেষে আবাহনীকে নিজের মধ্যে লালন করেন, সেই দায়বোধ থেকেই সুবাস সোম এখনও পড়ে আছেন ধানমন্ডি পাড়ার এই ক্লাবটিতে। 

বর্তমানে নতুন করে শুরুর চেষ্টা করছেন। আবার বয়সের ভারে মন সায় দিলেও শরীর মানছে না অনেক কিছুই। তবুও বারবার তাড়না খোঁজেন নিজের কাজে। সুবাস সোমের মতো মানুষেরা স্বপ্ন দেখেছেন দেশের ফুটবল নিয়ে। ভালোবাসার দায়বদ্ধতা থেকেই ‘হারানো সুবাস’ এখনও খুঁজে ফিরছেন সুবাস সোম।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা