রুবেল রেহান
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৪ ২১:০১ পিএম
আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৪ ২২:১৬ পিএম
দেশের ফুটবলে একটি সাফল্যের জন্য কত হাহাকার, কত আশা-আকাঙ্ক্ষা আর কত অপেক্ষা! ২০০৩ সালে পুরুষদের সাফে বিজয়ী হয় বাংলাদেশ। এরপর কেটে যায় প্রায় ১৯ বছর। কিন্তু দেশের ফুটবল যেন প্রতিনিয়তই ফিরছিল আরও পেছনে। অবশেষে দেশের মেয়েদের সুবাদে লাল সবুজের পতাকা ওড়ে বিদেশের মাটিতে। ২০২২ সালে মেয়েদের সাফে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। আক্ষেপ ঘোচানো টুর্নামেন্টে ফুটবলপ্রেমীদের নতুন করে স্বপ্ন দেখান সাবিনা খাতুন, মাসুরা পারভীন, কৃষ্ণা রানী সরকার ও আঁখি খাতুনরা।
সাফের ওই আসরে বাংলাদেশ হয় অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। তার চেয়েও বড় বিষয় ছিল টুর্নামেন্টে কেবল একটি গোল হজম করে বাংলাদেশ; সেটিই নেপালের বিপক্ষে ফাইনালে। সেখানে বড় অবদান নিঃসন্দেহে গোলরক্ষক রূপনা চাকমার। তবে তার সামনে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে ঢাল হয়ে ছিলেন ডিফেন্ডার আঁখি খাতুন। রক্ষণভাগে তার নেতৃত্বেই বড় সাফল্য হয় আরও মহিমান্বিত। কিন্তু সেই আঁখিই ক্যাম্প ছেড়ে খেলার টানে পাড়ি জমান সুদূর চীনে। সে সময় বাফুফে ক্যাম্প ছাড়া নিয়ে অনেকেই আঙুল তোলেন আঁখির দিকে। কিন্তু ভেতরের খবর জানা যায় সুইডিশ একটি ক্লাবের প্রস্তাব পেয়েও যেতে না পারায় অভিমান জমা হয় আঁখির মনে। এরপর ২০২৩ সালের শেষের দিকে মায়ের অসুস্থতার কারণে ছাড়েন ক্যাম্প। পরে তো আঁখি চলে যান চীনে।
আঁখির চীনে যাওয়া নিয়ে অনেক কথাই তখন আসে সংবাদমাধ্যমের সামনে। যদিও সত্যিটা হচ্ছে আঁখি চলে গিয়েছিলেন খেলার টানে, ফুটবলের টানে। খেলাটাকে ভালোবাসেন বলেই চীনের একটি ক্লাবে এখনও খেলে যাচ্ছেন নিয়মিত। সর্বোচ্চ স্তরের ফুটবলের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখছেন নিয়মিতই। বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের সাবেক কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটনের পরামর্শ মেনেই চালিয়ে যাচ্ছেন অনুশীলন, মাঠের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত রাখছেন নিজেকে। তার চেয়েও বড় কথাÑ আবার লাল সবুজের জার্সি গায়ে জরিয়ে আরও একবার আঁখি ফিরতে চান মাঠের লড়াইয়ে।
আঁখির মাঠে ফেরার ইচ্ছাটা অবশ্য এখনকার নয়। এই বছরের মাঝামাঝি সময়েই আঁখি অনুভব করেন দেশের ফুটবলকে কতটা ভালোবাসেন তিনি; কতটা নিজের মধ্যে ধারণ করেন। সে কারণেই কি না বাফুফের নারী উইংয়ের প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন ২০২৪ সালের মাস তিন-চার আগে। মোবাইল ফোনে এবং হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো অনুরোধের বার্তাটি অবশ্য এখন পর্যন্ত আমলে নেননি কিরন। তবে শিগগিরই তার কাছ থেকে সবুজ সংকেতের আশায় আছেন বলে সুদূর চীন থেকে প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার এই প্রতিবেদকে জানান আঁখি, প্রথমে ফের সাফ শিরোপা জেতায় বাংলাদেশ দলকে অভিনন্দন জানাই। আমি এই দলের সঙ্গে ছিলাম, যে কারণে আমি খুবই খুশি। কিন্তু এটা এমন নয় যে এখন শিরোপা জেতায় আমি বাফুফে ক্যাম্পে যেতে চাচ্ছি। আসলে এই সাফের কয়েক মাস আগে থেকেই আমি চেয়েছিলাম দলের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হতে। কিন্তু কীভাবে কী করব বুঝতে পারছিলাম না। কিরন ম্যাডামের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু উনি হয়তো ব্যস্ততার কারণে আমার মেসেজ দেখেননি।
এদিকে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে অনেক কিছুই। গেল দুই বছরে দলে এসেছে আমূল পরিবর্তন। কোচ গোলাম রাব্বানী নিজে থেকেই ইস্তফা দিয়েছেন কোচের দায়িত্বে। দলেও এসেছে বেশ কিছু নতুন মুখ। বিশেষ করে ডিফেন্সে আফঈদা খাতুনের মতো খেলোয়াড় এসে আস্থা অর্জন করেছেন। আফঈদার খেলা মনে ধরেছে আঁখিরও। তরুণ এই ডিফেন্ডারের প্রশংসা করেছেন তিনি। সাফে তার দারুণ পারফরম্যান্স দেখেছেন টিভিতে, ‘আমি ওর খেলা দেখেছি, সে দারুণ খেলে। দলে জায়গা পাওয়াটা যে মোটেও সহজ হবে না সেটা মানছেন আঁখি। তবে কোচের কাছে ট্রায়াল দিয়ে এবং পারফরম্যান্স মূল্যায়িত হলেই একটি সুযোগের অপেক্ষায় আঁখি, অনেকেই মনে করে আমি কেবল সংসার নিয়ে আছি। আসলে ব্যাপারটা মোটেও তেমন না। আমি এখানে ট্রেনিং করছি। ক্লাবের হয়ে বেশ কয়েকটি ম্যাচও খেলেছি। জাতীয় দলের হয়ে মাঠে ফেরার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। সুযোগ পেলে শতভাগ নিংড়ে দেব নিজেকে।’এদিকে ক্যাম্পে থাকতে হলে কিংবা বাফুফের যে নিয়মকানুন আছে সেসবও পুরোপুরি মানার জন্য এখন প্রস্তুত ২১ বছর বয়সি এই ডিফেন্ডার।
দারুণ এক সম্ভাবনাময়ী খেলোয়াড় ছিলেন আঁখি। বাংলাদেশ দলে তিনি থাকাকালীন অন্যতম সেরা খেলায়াড়ই ছিলেন। কোচের আস্থা, বাংলাদেশের রক্ষণের আস্থার প্রতীক ছিলেন আঁখি, এটা এক বাক্যে মানবেন অনেকেই। যেমনটা এখনও মানেন কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটন। আঁখির বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘ওর (আঁখি) বয়স মাত্র ২০-২১, আমি মনে করি ও যদি ফিট থাকে তবে ওর কাছ থেকে বাংলাদেশের এখনও অনেক কিছু নেওয়ার আছে।’
এই কথার সঙ্গে একমত না হওয়ার সুযোগ কতটা সেটিই বড় প্রশ্ন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই সর্বোচ্চস্তরের ফুটবলে এই বয়সে অভিষেক হয় অনেক খেলোয়াড়ের। সেখানে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আঁখিকে নিয়ে নব-নির্বাচিত বাফুফে কমিটি কী ভাববে সেটিই দেখার অপেক্ষা।