ক্রীড়া পরিদপ্তর
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৩১ এএম
আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৪ ১১:১৩ এএম
পিবি গ্রাফিক্স
ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ক্রীড়া পরিদপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতি চললেও যেন দেখার কেউ নেই। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কুক্ষিগত করে ফেলে এই প্রতিষ্ঠানটিকে। ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের ঘটনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন এই চক্রের সদস্যরা। ধরা পড়েও বারবারই পার পেয়ে গেছেন তারা। পরিদপ্তরে প্রেষণে আসা অধিকাংশ পরিচালক (যুগ্ম সচিব) নানা চাপের কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও পারতেন না। চক্রটি এতই শক্তিশালী ছিল যে, যারাই ব্যবস্থা নিতে গেছেন তাদের বদলি হতে হয়েছে। আবার কেউ কেউ পরিস্থিতি বুঝে নিজ উদ্যোগেই অন্যত্র বদলি হয়ে সরে গেছেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এলেও দাপট কমেনি এসব সুবিধাবাদী কর্মকর্তার। পরিদপ্তরে অনিয়ম আগের মতোই চলমান রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়ে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন পরিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) আ ন ম তরিকুল ইসলাম। ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাটের প্রমাণ খুঁজে পান তিনি। তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা এবং সচিবের কাছে প্রমাণাদিসহ প্রতিবেদন পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় থেকে জড়িতদের অন্যত্র বদলির নির্দেশনা দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী সহকারী পরিচালক এসআইএম ফেরদৌস আলম, সহকারী পরিচালক (সংগঠন) আলীমুজ্জামান এবং সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. আজিম হোসেনকে পরিদপ্তর থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়। এরপরও থেমে থাকেননি তারা। পরিচালকের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগেন। শেষ পর্যন্ত অতীতের মতো এই পরিচালকের ভাগ্যেও জুটেছে বদলির খড়গ।
তৃণমূল পর্যায়ে ক্রীড়া সম্প্রসারণ ও মানোন্নয়নে ১৯৭৬ সালে ক্রীড়া পরিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার এত বছরেও কাঙ্ক্ষিত সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি সংস্থাটি। বিভিন্ন সময়ে সরকার পরিবর্তন হলেও সব সময় সিন্ডিকেটের হাতেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে ক্রীড়া পরিদপ্তর।
এ বিষয়ে সদ্য বদলি হওয়া ক্রীড়া পরিদপ্তরের পরিচালক আ ন ম তরিকুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ক্রীড়া পরিদপ্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে তার চাকরি জীবনে ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছে। এখানে অনিয়মটাই যেন নিয়মে পরিণত করে ফেলেছে দুর্নীতিবাজদের একটি চক্র। এটি সরকারের একমাত্র দপ্তর যেখানে সরকারি অর্থ উত্তোলনে অফিস প্রধানের অনুমোদন লাগে না। অর্থ বরাদ্দের আগেই বিল উত্তোলন করে দেখানো হয় কাজের বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়েছে। এখানে যুগ যুগ ধরে চলে আসা নানান দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় তাকে অন্যত্র বদলি হতে হয়েছে। এ অবস্থার অবসান না হলে প্রেষণে এসে কোনো কর্মকর্তাই এখানে টিকতে পারবেন না।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বিধিবহির্ভূতভাবে ক্রীড়া পরিদপ্তরে উপপরিচালক (চ. দা.) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এসআইএম ফেরদৌস আলমকে সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) করা হয়। একইভাবে সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মো. আজিম হোসেনকে জেলা ক্রীড়া অফিসার, পটুয়াখালীতে পদায়ন করা হয়। তাদের বিধিবহির্ভূত কোনো কাজে সম্মতি না দেওয়ার কারণে তারা ক্ষুব্ধ হতে পারেন বলে তরিকুল ইসলামের আশঙ্কা।
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, অফিস প্রধানের স্বাক্ষর বা সম্মতি ছাড়াই এসআইএম ফেরদৌস আলম, মো. আলীমুজ্জামান ও মো. আজিম হোসেন ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯টি কোটেশনের মাধ্যমে ২৭ লাখ টাকা উত্তোলন এবং সমুদয় টাকা ব্যয় দেখিয়ে আত্মসাৎ করেন। এ ছাড়া দুটি কোটেশন বাবদ প্রায় ৬ লাখ টাকা লোপাট করে চক্রটি। এ ছাড়া ২টি প্রশিক্ষণ বাবদ ৩টি বিলের মাধ্যমে প্রায় ৪ লাখ এবং একই অর্থবছরে একই প্রশিক্ষণ প্রথমবার কোটেশনের মাধ্যমে, দ্বিতীয়বার টেন্ডারের মাধ্যমে এবং তৃতীয়বার বর্ণিত তিনটি বিলের মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ করা হয়। আর কোটেশনের মধ্যে ‘সঞ্জীবনী প্রশিক্ষণ’ বাবদ ৩ লাখ টাকা, বিচ ফুটবল খেলা দেখার নামে দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা উত্তোলন ও ব্যয় দেখিয়ে আত্মসাৎ এবং ওই অর্থবছরেই দ্বিতীয়বার সঞ্জীবনী প্রশিক্ষণ দেখিয়ে ক্রীড়া পরিদপ্তরের সকল অর্থ ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তা ছাড়া ‘বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২১’ আয়োজনে ব্যয় করা হয় ১০ কোটি টাকা। সেসব ব্যয়ের কোনো ভাউচার নেই। বেশিরভাগ অর্থই আত্মসাৎ করা হয়। এমনকি একটি অনুষ্ঠান উপলক্ষে আগেই আপ্যায়ন বাবদ কয়েক লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়ে তুলে নেয়াও হয়। বিল ভাউচার না দিয়ে বিচ ফুটবল টুর্নামেন্টের নামে অগ্রিম ৪০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী পরিচালক এসআইএম ফেরদৌউস আলম, সহকারী পরিচালক (সংগঠন) আলীমুজ্জামান এবং সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. আজিম হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, তাদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ অমূলক। ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য একটি বর্ষপঞ্জি প্রকাশ করা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বিল ভাউচার অগ্রিম উত্তোলন করা সম্ভব নয়।
নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, ক্রীড়া পরিদপ্তরের বার্ষিক ক্রীড়া কর্মসূচির অংশ হিসেবে (জেলা ক্রীড়া অফিসের ন্যায়) অনুরূপ আরও ৩টি প্রশিক্ষণ (ফুটবল, সাঁতার ও অ্যাথলেটিক্স) নিয়মিত আয়োজন করা হয়। বার্ষিক বরাদ্দ থাকে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। তবে নামে প্রশিক্ষণ চললেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এসব প্রশিক্ষণের অগ্রগতির বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছেও সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হন সংশ্লিষ্ট জেলার অফিসাররা। অনিয়ম বন্ধে তিনটি প্রশিক্ষণের বরাদ্দকৃত সকল অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত এনে জমা রাখা হয়েছে। এরপরও তিনবার (প্রথমবার টেন্ডারে দ্বিতীয়বার কোটেশনে ও তৃতীয়বার অগ্রিম ) পরিচালকের অনুমোদন ছাড়াই সরকারি অর্থ উত্তোলন ও আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তথ্য সূত্র বলছে, ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর এই দপ্তরে যোগদান করেন বদলি হওয়া সাবেক ক্রীড়া পরিচালক তরিকুল ইসলাম। এরপর ওই বছর দুই দফায় ১৪ ও ২০ ডিসেম্বর জেলা ক্রীড়া অফিসারদের অনুকূলে বরাদ্দ প্রদান করা হয়। অথচ এই বরাদ্দ দেওয়ার ৭ মাস আগেই চট্টগ্রামের জেলা ক্রীড়া অফিসার অগ্রিম আপ্যায়ন সম্পন্ন করেন, যা বিস্ময়কর ও নজিরবিহীন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়। আরও উল্লেখ রয়েছে, অর্থবছরের শুরুতেই ঢাকার জেলা ক্রীড়া অফিসার ও প্রভাষকের যৌথ মালিকানাধীন ৩টি প্রতিষ্ঠানের (ভাই ভাই খেলাঘর, বি. টেক্স ও বিজনেস ওয়ার্ল্ড) সাদা (ব্ল্যাঙ্ক) ভাউচার ৬৪ জেলায় জেলা ক্রীড়া অফিস ও সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজে পাঠানো হয়। এই ভাউচারে খেয়ালখুশিমতো টাকার অঙ্ক লিখে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। ক্রীড়া পরিদপ্তরের বহু দুর্নীতি জায়েজ করার কাগজপত্র সরবরাহ হয় এই তিন প্রতিষ্ঠান থেকে।