আরিফুর রাজু
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৪ ১৮:২৮ পিএম
আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৪ ১৮:৪৪ পিএম
কানপুরেই ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট খেলে ফেলেছেন সাকিব। ছবি: আ. ই. আলীম
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস যথেষ্টই সমৃদ্ধ। পেরিয়ে গেছে চার দশকেরও বেশি সময়। ১৯৭৭ সালে ওয়ানডে এবং ২০০০ সালে প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। এরপর স্বল্প ফরম্যাটের ক্রিকেটের আমদানি। ২০০৬ সালে কুড়ি কুড়িতে নাম লেখায় লাল-সবুজের দল। ধার-ভার এবং ঐতিহ্যে ক্রিকেট এদেশের প্রথিতযশ পর্যায়ে। দেশীয় ক্রিকেটকে প্রায় শূন্য থেকে শক্ত ভিতে দাঁড় করাতে যাদের অবদান অকল্পনীয়, বাংলাদেশ ক্রিকেট তাদের কী দিয়েছে, বিদায়লগ্ন কেমন কেটেছে এসব গুণী ক্রিকেটারের, এর যেন কোনো উত্তর হয় না।
৫৬ হাজার বর্গমাইলের দেশে ক্রিকেট প্রার্থনার পর্যায়ে না গেলেও খাওয়া, ঘুম, জীবনযাপন, এমনকি স্বপ্নÑ সবকিছুই যেন ক্রিকটকেন্দ্রিক। যাদের কারণেই এতসব, সেই শামীম কবির, সফিকুল হক হীরা, গাজী আশরাফ হোসেন লিপু, আকরাম খান এবং পঞ্চপাণ্ডবদের অন্যতম মাশরাফি বিন মর্তুজা, তামিম ইকবালদের মতোই ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট খেলা সাকিব আল হাসানও কোনো সুস্থ ‘বিদায়ি সংস্কৃতি’র মধ্য দিয়ে যেতে পারেননি।
দেশীয় ক্রিকেটের পোস্টারবয় সাকিবের ‘টেস্ট বিদায়’ নিয়ে চলছে জোর আলোচনা-সমালোচনা। ভারতে আচমকা টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা দেন বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার। ৩৭ বর্ষী তারকা ইচ্ছাপোষণ করেছিলেন, বিদায়টা যেন দেশের মাটিতেই হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঢাকা টেস্ট খেলে চিরচেনা মাঠ ও প্রিয় ভক্তদের সামনে ক্যারিয়ারের ইতি টানতে চেয়েছিলেন সাকিব। এজন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাছে আবেদনও করেছিলেন। তার সে আবেদন নাকচ করে দেয় দেশীয় ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রকারী সংস্থাÑ বিসিবি। বোর্ড প্রেসিডেন্ট ফারুক আহমেদ সাফ জানিয়ে দেন, নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রের, এ ক্ষেত্রে বিসিবির কোনো এখতিয়ার নেই। একই সুর ছিল বাংলাদেশ সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ারও।

বিসিবির প্রেসিডেন্ট কিংবা ক্রীড়া উপদেষ্টাই নন, সাকিবের দীর্ঘদিনের
কোচ ও বর্তমান বিসিবি পরিচালক নাজমুল আবেদীনও সাকিবের বিদায় নিয়ে কথা বলেন। ঘরের মাঠে
তার শেষ টেস্ট খেলার সম্ভাবনা কম বলে মন্তব্য করেন তিনি। সাকিবের আরেক কোচ মোহাম্মদ
সালাউদ্দিনের বক্তব্যও প্রায় এ রকমই। অর্থাৎ ১৮ বছর দেশের ক্রিকেটকে সার্ভিস দেওয়া
সাকিব বিদায় সংবর্ধনা পাচ্ছেন না। ইচ্ছা অনুযায়ী শেষ টেস্টটাও খেলতে পারবেন না।
সাকিবের বিদায়ি সংবর্ধনা ‘রাজকীয়’ হবেÑ হয়তো এমনটা ভেবেছিলেন অনেকেই। দেড় যুগে সাকিব বাংলাদেশ ক্রিকেটকে কী দিয়েছেন, এটা বলার চেয়েও নিরাপদ উত্তর - তিনি কী দেননি। তবুও তাকে দেখতে হচ্ছে মুদ্রার উল্টো পিঠ। শুধুই যে সাকিবের বেলাতে এমনটা হচ্ছে তা কিন্তু নয়। আগের অধিনায়কÑ তারকাদেরও হয়েছে একই পরিণতি।

পঞ্চপাণ্ডবের অন্যতম মাশরাফির শেষ দিকটা হয়ে ওঠে অসহনীয়। দেশের ইতিহাসে
সফলতম অধিনায়ক হওয়ার পরও পাননি বিদায়ি সংবর্ধনা। একটা পর্যায়ে বলেও বসেন, এসব নিয়ে
আর কথা বলতে চান না, ভাবনাতেও আনতে চান না।
২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল কলম্বোর প্রেমাদাসায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচে টস করার পর মাশরাফি যখন বিদায় ঘোষণা দেন, অবাক হয়ে যান সতীর্থ থেকে শুরু করে দেশের লাখো-কোটি ভক্ত। মূলত ম্যানেজমেন্ট ও কোচের সঙ্গে বড়সড় দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল তার। এরপর রাজনীতিতে নাম লেখানো, আওয়ামী লীগের হয়ে দুইবার নড়াইল-২ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হওয়াÑ এসবই শেষ সময়টা ভুগিয়েছে মাশরাফিকে। বিদায় সংবর্ধনা তো দূরের কথা, বোর্ড থেকে এ নিয়ে টুঁ শব্দ পর্যন্ত করতে দেখা যায়নি। অথচ এই মাশরাফির কারণেই ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিতে ওঠে বাংলাদেশ।

একই ঘটনা ঘরে ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফিজয়ী নায়ক আকরাম খানের বেলাতেও।
ক্যারিয়ারের শেষের দিকে তাকে দল থেকে একপ্রকার ছুঁড়ে ফেলে দেয় বিসিবি। তার জায়গায় ১৯৯৮
সালে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বে এসিসি ট্রফি খেলতে যায় বাংলাদেশ। ১৯৯৪ সালে সার্ক
টুর্নামেন্টে চমক, ৯৬ সালে এসিসি ট্রফি জয়। পরে ৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি। এসব অর্জনের
হিরোকে বানিয়ে দেওয়া হয় জিরো।
অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি পাওয়া আমিনুল ইসলামের দুঃখও কম নয়। তিনি বাংলাদেশের অধিনায়ক থাকাকালীন টেস্ট মর্যাদা পায় বাংলাদেশ। নিয়তির নির্মম খেলা, তাকে সরিয়েই সেই টেস্টে নেতৃত্বের ভার দেওয়া হয় নাঈমুর রহমান দুর্জয়কে। আমিনুল সে বেদনা এখনও বয়ে বেড়ান। অভিযোগ তুলেছিলেন, বিসিবির তৎকালীন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও। তার অধিকার হরণ করা হয়েছে, এমন কথা বলেছেন মিডিয়ায়। ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে অম্লমধুর সম্পর্কের মধ্য দিয়ে শেষ হয় তার ক্যারিয়ার। একসময় দেশ ছাড়েন। যে দুর্জয়কে দেশের প্রথম টেস্টের অধিনায়ক বানানো হয়েছিল, তিনিও একই দুঃখের সারথি। রাজনৈতিক কিংবা অন্য যেকোনো কারণেই হোক তাকে হুট করে ছাঁটাই এবং বাদ দেওয়া হয়।

বিসিবির বর্তমান সভাপতি ফারুক আহমেদেরও শেষ সময়টা ছিল ভুলে যাওয়ার মতোই। ১৯৮৪ সালে আইসিসি ট্রফির পর অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিতে হয় তাকে। আর তার অধিনায়কত্ব পাওয়াটাও ছিল চমক জাগানিয়া। কথা চাউর হয়েছিল, তৎকালীন কোচ মহিন্দর অমরনাথের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিল, এমন কারণেই মিনহাজুল আবেদীন নান্নুকে সরিয়ে তাকে অধিনায়কের আসনে বসানো হয়। আইসিসি ট্রফিতে হারের পর দলের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে ছাঁটাই করা হয় ফারুককে। আর প্রথম ওয়ানডে দলের অধিনায়ক এবং জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপুও একই পথের পথিক। নিজেই জানিয়েছিলেন, ক্যারিয়ারের শেষ দিকটা উপভোগ করতে পারেননি। সেটা অফফর্মের জন্য হোক আর বোর্ডের সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরে।

প্রসঙ্গ যখন বাংলাদেশের ক্রিকেটের বিদায়ি সংস্কৃতি, তালিকাটা দীর্ঘ
থেকে দীর্ঘতর। মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, খালেদ মাহমুদ, খালেদ মাসুদ পাইলট, হাবিবুল বাশার,
মোহাম্মদ আশরাফুলÑ হালের তামিম ইকবাল। দেশীয় ক্রিকেটের যত রথি-মহারথিই হোন না কেন,
সবারই গল্পের শেষটা এক শব্দেÑ হতাশার। নিজের মতো করে বিদায় নিতে পারেননি তামিম। এর
আগে অদ্ভুতুড়ে বিদায়ের মিছিলে যোগ দেন নান্নু , বুলবুল আকরামরা। দেশের জন্য প্রাণপাত
করেও বাংলাদেশ ক্রিকেট ম্যানজেমেন্টের কাছ থেকে ন্যূনতম সম্মানও জোটেনি আশরাফুল, হাবিবুল
ও পাইলটদের। আমাদের ক্রিকটে বীরেরা হঠাৎই আড়ালে চলে যাবেনÑ এটাই যেন নিয়তি নির্দিষ্ট।