নাজমুল হক তপন
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২০:৪৩ পিএম
আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২১:০৪ পিএম
বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক অঘোর মন্ডল আর নেই। ছবি : সংগৃহীত
‘এক্সট্রা’ শব্দটা খুবই মানানসই অঘোর মন্ডলের ব্যক্তিজীবনে। কাজকেই
বেছে নিয়েছিলেন জীবনের ব্রত হিসেবে। কাজ না বলে বলা উচিত অতিরিক্ত কাজ। এমন কোনো বিষয়
নেই যা নিয়ে লেখেননি। পত্রিকা, টিভি, পোর্টাল, সবখানেই তার সরব উপস্থিতি। ক্যারিয়ার
ক্রীড়া সাংবাদিকতার, অথচ রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি নিয়ে দেশের সব শীর্ষ পোর্টালে
লিখেছেন নিয়মিত, টকশো সঞ্চালনা করেছেন চ্যানেলে, দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ মতামত। তার প্রকাশিত
দুটি আলোচিত বইÑ ‘এক্সট্রা টাইম’ ও ‘এক্সট্রা কাভার’। অথচ জীবনের এক্সট্রা টাইমকে কি
অবলীলায় অস্বীকার করে মাত্র ৫৮ বছর বয়সেই অনন্তলোকের সান্নিধ্যে চলে গেলেন কাজ পাগল
মানুষটি।
আলাদভাবে আলোচনার দাবি রাখে অঘোর দা’র পাঠ অভ্যাস। আড়াই দশকেরও বেশি
সময় আগে। বলা বাহুল্য আমার ক্রীড়া সাংবাদিকতা ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে। দৈনিক আজকের
কাগজ পত্রিকায় আমার কোনো একটা লেখা ছাপা হওয়া মানেই অবধারিতভাবে অঘোর দা’র ফোন। কোথায়
কোথায় লেখার ঘাটতি আছে, সোজা সাপটা বলে দিতেন। বলতে লজ্জা নেই, এমন চাঁছাছোলা মন্তব্যে
একটু আশাহতও হতাম। পরে অনুধাবন করেছি, আমার মতো নবীন রিপোর্টারদের কত বড় উপকারটাই না
করেছেন অঘোর দা। ছোট্ট একটা দৃষ্টান্ত দিই। হ্যানসি ক্রনিয়ের ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারি
নিয়ে গোটা ক্রিকেট দুনিয়া তোলপাড়। আমার লেখার শিরোনাম, ‘ক্রিকেটের পথচলাকে কঠিন করে
দিলেন ক্রনিয়ে’। এই লেখাটার জন্য অনেকের প্রশংসাও পেলাম। এরপর যথারীতি অঘোর দা’র ফোন,
তপন আপনার লেখার শিরোনামটা খুবই ভালো হয়েছে। তবে অতিরিক্ত বিশেষণ আর ভারী শব্দের ব্যবহারের
কারণে লেখাটা প্রাণবন্ত হয়নি।
অঘোর দা খুব হাঁটতেন। ভোরবেলায় হাঁটতে বেরিয়েই দেয়ালে সাঁটানো দৈনিক
পত্রিকা পড়া ছিল তার নিয়মিত অভ্যাস। দাদার হাঁটার সঙ্গী হয়েছি অসংখ্যবার। কখনোবা জিগাতলা
পেরিয়ে নবাবগঞ্জ, লালবাগের দিকে, কখনও গুলিস্তান পেরিয়ে সিক্কাটুলি লেনে। মাটন আর
তন্দুর রুটি পছন্দ করতেন। তার সঙ্গে হাঁটা মানেই, এই রোডে কার বাড়ি, অমুক জায়গাটায়
এটা, তমুক জায়গাটায় ওটা। মাঝে মাঝে টিপ্পনি কেটে বলতাম, ঢাকায় কিন্তু আপনি খুব বেশি
পুরোনো নন! হাঁটা নিয়ে দাদার একটা সংবাদ শিরোনাম কোনোদিনই ভুলব না। পাকিস্তানের কিংবদন্তি
ব্যাটার ইনজামাম উল হক রানিং বিটুইন উইকেটে ছিলেন ভীষণ শ্লথ। বলা হতো, ইনজামাম দৌড়ান
না, হাঁটেন। এ সংক্রান্ত একটা লেখা লিখলেন অঘোর দা। শিরোনামÑ ইনজামাম হেঁটে হেঁটে যেখানে
পৌঁছাতে পারেন অনেকে দৌড়েও সেখানে পৌঁছাতে পারেন না।
অঘোর দাকে মাঝে মধ্যেই খুনসুটি করে বলতাম, আপনার কচি কাঁচার মেলা
কিংবা ইস্কাটন সবুজ সংঘের কী অবস্থা? এখানে বলে রাখা ভালো, অঘোর দা তখন ভোরের কাগজের
ক্রীড়া সম্পাদক। উদীয়মান তরুণদের নিয়ে পাতা বের করার চ্যালেঞ্জে নামতেন দাদা। এরপর
তার শিষ্যরা অভিজ্ঞতা অর্জনের পর চলে যেত অন্য প্রতিষ্ঠানে। এই কচি কাঁচার মেলার সঙ্গে
ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলাম আমিও। যেহেতু আমি প্রচুর আড্ডা দিই, তাই ক্রীড়াপ্রেমী অনেক
ছোট ভাইয়ের সঙ্গেই আমার গড়ে ওঠে বিশেষ সখ্য। দাদার কাছে পাঠিয়ে দিতাম। এরপর অল্প
কিছু দিনের মধ্যেই স্পোর্টস রিপোর্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যেত তারা। আমি দাদার কাছে
কাউকে পাঠানো মানেই তার চাকরি। আমার লেখা নিয়ে যে মানুষটা এত ব্যবচ্ছেদ করে, সেই মানুষটির
কাছে আমার চয়েজই শেষ কথা। অঘোর দার ভাষায়, তপন আপনি পাঠিয়েছেন, আমার পরখ করার কিছু
নেই।
এত কম সময়ে এত কিছু করেছেন যে জীবনকে বেশি দূর টেনে নেওয়াটাকে বোধকরি
অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন অঘোর মন্ডল। জীবনের এক্সট্রা টাইমকে উড়িয়ে দিয়েছেন তুড়ি মেরে।
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা বিশেষত ক্রীড়া সাংবাদিকতা যতদিন থাকবে ততদিন তারুণ্যের অহঙ্কার
হয়ে থাকবেন অঘোর মন্ডল।