রাওয়ালপিন্ডি টেস্ট
হেলাল নিরব
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ২০:৪৮ পিএম
আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০১:৪২ এএম
পাকিস্তানের বিপক্ষে আগে কখনও টেস্ট জিততে পারেনি বাংলাদেশ, এবার সেই আক্ষেপ ঘোচানোর পর বিদেশের মাটিতে তর্কাতিত সেরা সাফল্য পেয়েছে টাইগাররা— সংগৃহীত ছবি
তত কিছু ভাবেননি নাজমুল হোসেন শান্ত। অতীতের তেতো রেকর্ড উগড়ে বলেছিলেন ‘বিশেষ কিছু’ আনব। বাংলাদেশের অধিনায়কের সেই বিশেষের বিস্তারিততে ‘পাকিস্তানকে ওদের মাটিতেই হারাব’ চিন্তা আসেনি নিশ্চয়! যদি এসেও থাকে, তবুও কি শান্ত ভেবেছিলেন বিদেশের মাটিতে নতুন বাংলাদেশের দাপুটে শুরু হবে? ভাবেননি হয়তো। না ভাবার কারণও বেশ। পরদেশে সবশেষ একাধিক টেস্টের সিরিজে জয় বছর পনেরো আগের। সাদা পোশাকের ক্রিকেটে গত কয়েক বছরে বেশকিছু সাফল্য এলেও তাই ‘সিরিজ হারানোর’ মতো কিছু করে ফেলবে বাংলাদেশ, তা ছিল ভাবনার বাইরে। পিন্ডিতে পাকিস্তানের পিন্ডি চটকানোর পর শান্তর প্রতিক্রিয়াও তাই এমন ছিল, বিরাট একটা ব্যাপার ঘটিয়েছি।
দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে এই সাফল্যের পরিধি বড়সড়ই বটে! যে পাকিস্তানকে হারাতে দুই যুগের অপেক্ষা ছিল বাংলাদেশের। তাদের মাটিতেই সেই পাকিস্তানকে দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে দুবার হারালেন শান্তরা। বিশেষ কিছুই। ব্যবধানও স্পষ্ট। প্রথম টেস্টে ১০ উইকেটের জয়, পরেরবার ৬ উইকেটে— বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সিরিজে পাকিস্তান ‘বাংলাওয়াশ’। শান মাসুদদের বিপক্ষে এই সিরিজে আগে দুদলের পরিসংখ্যান ছিল এমন— ১৩ ম্যাচ, ১২ হার, এক ড্র। জয়হীন নাজুক খেরোখাতায় ছয়টি সিরিজের সবকটিতে হোয়াইটওয়াশ হয় টাইগাররা। সবেধন নীলমণি ২০১৫ সালে পাওয়া একটি টেস্টে ড্র। এবার যেন ভিন্ন বাংলাদেশ। বিদেশের মাটিতে পেস বিপ্লব, স্পিন তাণ্ডব, ব্যাটিংয়ে দায়িত্বশীলতা এবং সবচেয়ে জরুরি টিম ওয়ার্ক। সব মিলিয়ে পটপরিবর্তনের নতুন বাংলাদেশের নতুন শুরু। লাল বলের ক্রিকেটে বিদেশ জয়ের যাত্রাও কি এখানেই শুরু তবে!
২৪ বছরের টেস্ট ইতিহাসে বিদেশবিভুঁইয়ে তিনটি সিরিজ জিততে পেরেছে বাংলাদেশ। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে, ২০২১ সালে জিম্বাবুয়েকে একবার এবং এবার ‘বাংলাধোলাই’ পাকিস্তান। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজটি ছিল এক টেস্টের আর ২০০৯ সালে ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জয়টিকেও ঢাকঢোল পিটিয়ে বলার সুযোগ নেই। সে সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোর্ডে সমস্যা চলার কারণে টেস্ট থেকে নাম কেটে নিয়েছিল তখনকার মূল বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়। এককথায় সেবারের সিরিজ জয়ের সঙ্গে এবার তফাৎ অনেক। পাকিস্তান তাদের পূর্ণ শক্তি নিয়ে খেলেছিল। কিন্তু দুই টেস্টের দশ দিনে মাত্র এক দিন রাজত্ব করতে পেরেছিল তারা। বাকি নয় দিনের সাত দিনই বাংলাদেশের দখলে। দুই দিন ভেস্তে গিয়েছিল বৃষ্টির পেটে। মোদ্দাকথা, পাকিস্তানের মাটিতে দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখিয়েছে শান্ত ব্রিগেড। পিন্ডিতে তা কখনও ব্যাটিংয়ে, ফিল্ডিংয়ে, কখনও বোলিংয়ে বা প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে।
বাংলাদেশ সবশেষ সুখের রচনাটা লিখেছে ইতিহাস গড়েই। এত দিন তিনটি দেশের বিপক্ষে টেস্টে জিততে পারেনি বাংলাদেশ। পাকিস্তানের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডিতে সেই ইতিহাসের পর শান্তরা আরেকটি ইতিহাসও গড়েছে। সিরিজ জিতে। এখনও ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টে জেতা হয়নি বাংলাদেশের। চলতি মাসেই ভারতের বিপক্ষে টেস্ট খেলবেন শান্তরা। ১৯ সেপ্টেম্বর চেন্নাইয়ে শুরু হবে দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্ট। ২৭ সেপ্টেম্বর কানপুরে দ্বিতীয় টেস্ট। বিদেশে টেস্টের নতুন অভ্যুত্থানে টাইগাররা কি ভারতবধ করতে পারবে? শান্ত শুনিয়েছেন আশার বাণী, ‘পরের সিরিজ (ভারতের বিপক্ষে) আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। (পাকিস্তানের বিপক্ষে) এই জয় আমাদের অনেক আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। মুশফিকুর রহিম ও সাকিব আল হাসানের অনেক অভিজ্ঞতা আছে, তারা দুজনই ভারতে খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে। ভবিষ্যতেও টেস্ট জয়ের এই সংস্কৃতি অব্যাহত রাখার চেষ্টা করব।’
বাংলাদেশের টেস্ট ঝুলিতে সুখস্মৃতির বেশ ঘাটতি। টাইগাররা লাল-বলের ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত ৭৪টি আন্তর্জাতিক টেস্ট সিরিজ খেলেছেন। জয় মোটে নয়টিতে। ড্র ১০টি। বাকিগুলো হার। বিদেশবিভুঁইয়ে টেস্ট সিরিজের পরিসংখ্যানে জয়ের হার আরও নাজুক। এখন অবধি দেশের বাইরে ৩৩টি সিরিজ খেলা বাংলাদেশ জিতেছে কেবল তিনটিতে। আরও তিনটি সিরিজ হয়েছে ড্র। বাকিগুলোতে হার, তাও সবকটিতেই পেতে হয়েছিল হোয়াইটওয়াশের লজ্জা। সাদা পোশাকের ক্রিকেট এখন অবধি ১৪৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ জিতেছে মোটে ২১টি। ১৮টি টেস্ট ড্রয়ের বিপরীতে আছে ১০৫টি টেস্ট হারের স্বাদ। তবে শান্তর অধীনের বাংলাদেশ নতুনরূপে সেজেছে। দল হিসেবে খেলা টাইগাররা শেষ কয়েক বছরে দারুণ কিছু সাফল্যও পেয়েছে। মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্ট জয়, সিলেটে কিউই বধের পর পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ। এবার না পাওয়া ঘুচিয়ে আরও কিছু প্রথমের পালক জুড়তে মরিয়া শান্ত ব্রিগেড।
পাকিস্তানকে সিরিজে হারানোর পর সিরিজের সেরা মেহেদী হাসান মিরাজ লিখেছিলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে দুঃসময় পার করে আসা বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়াবে। পাকিস্তানের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে নতুন গল্পের সূচনা...’ দুঃসময় কাটিয়ে ‘সাদা পোশাকে অভ্যুত্থানের’ সুখের গল্প মিরাজ-শান্তরা কতদূর টেনে নিতে পারেন, সেটা দেখার।